চার বছরেও শেষ হয়নি বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ প্রকল্পের কাজ

আলকামা সিকদার, মধুপুর (টাঙ্গাইল)

চার বছরেও শেষ হয়নি বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ প্রকল্পের কাজ

টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের অধীন কমিউনিটিভিত্তিক ১০ বাড়ি পানি সরবরাহের পাম্প, গভীর নলকূপ স্থাপন ও পাইপলাইন বসানোর কাজে অনিয়ম ও দুর্নীতির বিভিন্ন অভিযোগ পাওয়া গেছে। গত চার বছরেও কাজ শেষ না করে ঠিকাদারকে বিল দেওয়া হয়েছে । এ কারণে ঠিকাদার এখন লাপাত্তা।

২০২১-২২ অর্থবছরে মধুপুর উপজেলার ৯টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার ১০ বাড়ি বিস্তৃত কমিউনিটিভিত্তিক ১৮টি সাবমার্সিবল পাম্প ও গভীর নলকূপ বসানোর প্রকল্পে এক কোটি ৪৮ লাখ ২৬ হাজার ৩৩৯ টাকা ৯০ পয়সা বরাদ্দ দেওয়া হয়।

বিজ্ঞাপন

মধুপুর ও ধনবাড়ী উপজেলার ১৮টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার ১০ বাড়িতে পানি সরবরাহের এ প্রকল্পের বছরের পর বছর ধরে অকেজো হয়ে পড়ে আছে ১৮টি বোরিং করা গভীর নলকূপের পাইপ। কোনো কোনো জায়গায় পাইপে সাবমার্সিবল মোটর লাগালেও তা নষ্ট হয়ে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে আছে। আর পানির ট্যাংক বসানো ও বাড়ি বাড়ি পাইপ লাগানোর তো কোনো খবরই নেই।

সম্প্রতি উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে এমন ১৮টি প্রকল্পের কাজ সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়ে দেখা গেছে, এই দপ্তর যেন দুর্নীতির আখড়া। কাজ শেষ করার আগেই বিল উত্তোলন করে ঠিকাদার পালিয়ে যাওয়ায় প্রকল্পটি এখন মুখথুবড়ে পড়ে আছে। এতে সরকারের প্রায় দেড় কোটি টাকা গচ্চা যেতে বসেছে।

উপজেলার আউশনারা, মহিষমারা, কুড়ালিয়া, আলোকদিয়াসহ কয়েকটি ইউনিয়নে সম্প্রতি সরেজমিন দেখা যায়, উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর থেকে বিভিন্ন গ্রামে কমিউনিটিভিত্তিক ১০ বাড়িতে পানি সরবরাহের জন্য বসানো সাবমার্সিবল মোটর, পানির ট্যাংক এবং ট্যাংক বসানোর জন্য পিলার নির্মাণ, ১০ বাড়িতে পাইপলাইন টানা, কল বসানো, কল ও পাম্প স্থাপনের জায়গা পাকাকরণের মাধ্যমে ব্যবহারের যোগ্য করে দেওয়ার কথা। কিন্তু দেখা যায়, ৯টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার পুরো প্রকল্পের মধ্যে ১৮টি পাইপ বোরিং ও পাঁচটি পিলার নির্মাণ করা হয়েছে, যার বিপরীতে ৬০ শতাংশ বিল প্রদান করেছে এই অফিস। অপরদিকে ধনবাড়ী উপজেলার ধোপাখালী ইউনিয়নের ভাইঘাট বাজার ও সূত্রধরপাড়া এলাকায় দেখা গেছে, নির্ধারিত ১০টি পরিবারের পরিবর্তে সীমিত কয়েকটি পরিবার পানি ব্যবহার করতে পারছে। একই ভাবে যদুনাথপুর ইউনিয়নের প্রকল্পেও ১০টি পরিবারের বদলে একটি মসজিদ ও একটি মাজারে সংযোগ দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া শোলাকুড়ি বাজারের পাশে সোলায়মানের বাড়ি এবং আলোকদিয়া ইউনিয়নের শাহজাদা হোসেন খান মানিকের বাড়িতে নতুন করে পানির ট্যাংক বসানো ও পাইপলাইন স্থাপনের কাজ করতে দেখা গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পটি ২০২১-২২ অর্থবছরে চালু করে ছয় মাসের মধ্যে সম্পূর্ণ কাজ শেষ করার কথা। কিন্তু প্রায় চার বছর পার হতে চললেও এখনো প্রকল্পটি আলোর মুখ দেখেনি।

ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অফিসে ঘুরে শুধুমাত্র আশ্বাস ছাড়া কোনো প্রতিকার পাচ্ছেন না তারা।

উপজেলার মহিষমারা ইউনিয়নের নেদুর বাজার এলাকার জোসনা বেগম, জহুরা বেগম, নাছিমা বেগম জানান, প্রায় চার বছর আগে এলাকার মেম্বার ও চেয়ারম্যান তাদের কাছ থেকে এনআইডি কার্ডের ফটোকপি আর ১০ বাড়ি থেকে নগদ ১০ হাজার টাকা নিয়ে যান। সরকার বিনামূল্যে মোটর ও পানি ট্যাংক দেবে। কিন্তু প্রায় চার বছর আগে বসানো পাইপ ছাড়া আমরা আর কিছুই পাইনি।

কুড়ালিয়া ইউনিয়নের টিকরী গ্রামের আরিফ হোসেন জানান, আমাদের কাছ থেকে প্রায় চার বছর আগে চেয়ারম্যান ১০ হাজার টাকা নেন ১০ বাড়িতে নিরাপদ পানি সরবরাহের পাম্প দেবেন বলে। কিন্তু প্রায় চার বছর পার হতে চললেও এখন পর্যন্ত কোনো ট্যাংক চোখে দেখলাম না।

দড়িহাতীল গ্রামের সোহল মেম্বার জানান, এ প্রকল্পের মোটর ও ট্যাংক আমার বাবা মেম্বার থাকা অবস্থায় এনেছিলেন। আমি সাবমার্সিবল মোটর ও ট্যাংক পেয়েছি, তবে এখনো সংযোগ করে দেয়নি। অফিসে যোগাযোগ করলে তারা বলে ঠিকাদার পালিয়েছে।

বিভিন্ন ইউনিয়নে যে কাজ করা হয়েছে, তাতে মোট কাজের ৩০ ভাগ এখনো শেষ হয়নি। অথচ অফিসের দেওয়া তথ্যানুযায়ী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জামালপুরের খন্দকার এন্টারপ্রাইজকে ৬০ ভাগ বিল বাবদ ৮৯ লাখ ৫৮ হাজার ১২৯টাকা ৭৮ পয়সা প্রদান করা হয়েছে।

এ বিষয়ে খন্দকার এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী আরিফ খন্দকারের সঙ্গে মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

মধুপুর উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল কার্যালয়ের উপসহকারী প্রকৌশলী আল আমিন জানান, ধনবাড়ীর অধিকাংশ এবং মধুপুরের কয়েকটি পয়েন্টের কাজের ভিত্তিতে ঠিকাদারকে প্রায় ৬০ শতাংশ বিল দেওয়া হয়েছে। তিনি আরো বলেন, সে সময় রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে অনেক বিষয় তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল।

সহকারী প্রকৌশলী ইমরান হোসেন জানান, ঠিকাদারকে দ্রুত কাজ শেষ করার জন্য একাধিকবার চিঠি দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে অবহিত করা হয়েছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন