টাকার অভাবে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে চা বিক্রেতার মেয়ের মেডিকেলে পড়া

উপজেলা প্রতিনিধি, তানোর (রাজশাহী)

টাকার অভাবে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে চা বিক্রেতার মেয়ের মেডিকেলে পড়া

রাজশাহীর তানোর উপজেলার কৃষ্ণপুর গ্রামের ছোট একটি চায়ের দোকান। সেই দোকানের আয় দিয়েই কোনো রকমে চলে চার সদস্যের সংসার। প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা আয় করা সেই চা বিক্রেতা বাবার মেয়ে এবার সরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন। কিন্তু ভর্তি হওয়ার পরও অর্থসংকটে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে তার চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন।

মোসা. মাহমুদা খাতুন তানোর উপজেলার পাঁচন্দর ইউনিয়নের কৃষ্ণপুর গ্রামের বাসিন্দা। তিনি সম্প্রতি অনুষ্ঠিত মেডিকেল কলেজ ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে জামালপুর সরকারি মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়েছেন। ইতোমধ্যে ক্লাসও শুরু হয়েছে। তবে প্রয়োজনীয় বই, শিক্ষা উপকরণ ও হোস্টেল খরচের টাকা জোগাড় করতে না পারায় পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তিনি ও তার পরিবার।

বিজ্ঞাপন

মাহমুদার বাবা মাসুদ রানা গ্রামের একটি ছোট চায়ের দোকান চালান। মা সায়েরা বিবি গৃহিণী। দুই মেয়ের মধ্যে মাহমুদা বড়। ছোট বোন মিম খাতুন স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী।

শিক্ষাজীবনের প্রতিটি ধাপে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন মাহমুদা। ২০২৩ সালে কৃষ্ণপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসিতে গোল্ডেন জিপিএ-৫ এবং ২০২৫ সালে কৃষ্ণপুর আদর্শ মহিলা ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসিতেও গোল্ডেন জিপিএ-৫ অর্জন করেন। পারিবারিক অসচ্ছলতার কারণে কখনো নিয়মিত কোচিং কিংবা প্রাইভেট পড়ার সুযোগ পাননি। অনেক সময় সহপাঠীদের বই ধার করে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হয়েছে তাকে।

মাসুদ রানা বলেন, আমরা নিজেরা লেখাপড়া জানি না। কিন্তু মেয়ের পড়ার আগ্রহ দেখে কষ্ট করে তাকে পড়িয়েছি। মেডিকেলে সুযোগ পাওয়ার খবর আমাদের জন্য অনেক বড় আনন্দের ছিল। কিন্তু এখন সেই আনন্দের সঙ্গে যোগ হয়েছে দুশ্চিন্তা। ভর্তির জন্য প্রায় ১৩ হাজার টাকা খরচ হয়েছে, সেটাও ধার করে জোগাড় করতে হয়েছে।

তিনি জানান, মেডিকেলের প্রথম বর্ষের জন্য প্রয়োজনীয় বই কিনতেই প্রায় ২০ হাজার টাকা লাগবে। পাশাপাশি অ্যানাটমি শিক্ষার জন্য একটি কঙ্কাল (স্কেলেটন) কিনতে হবে, যার মূল্য প্রায় ৪০ হাজার টাকা। এছাড়া প্রতি মাসে হোস্টেল, খাবার ও শিক্ষা উপকরণ বাবদ ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা প্রয়োজন হবে।

মাহমুদার মা সায়েরা বিবি বলেন, আমাদের কোনো জমিজমা নেই। মাত্র দুই শতক জমির ওপর কাঁচা ঘরে বসবাস করি। মেয়েটা ছোটবেলা থেকেই ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখে। সে যেন পড়াশোনা শেষ করে মানুষের সেবা করতে পারে, এজন্য সমাজের বিত্তবান ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সহযোগিতা চাই।

বর্তমানে কলেজ হোস্টেলে অবস্থান করলেও প্রয়োজনীয় বই না থাকায় পড়াশোনায় সমস্যা হচ্ছে বলে জানান মাহমুদা। তিনি বলেন, ক্লাস শুরু হয়ে গেছে। অন্যরা বই নিয়ে পড়াশোনা করছে, কিন্তু আমি এখনও নিজের বই কিনতে পারিনি। বাবার সামর্থ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে সব খরচ।

স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল আওয়াল বলেন, অভাব-অনটনের মধ্যেও মাহমুদা অসাধারণ ফলাফল করেছে। তার মতো একজন মেধাবী শিক্ষার্থীর পাশে সমাজের সবাইকে দাঁড়ানো উচিত।

এদিকে মাহমুদার মেডিকেলে ভর্তির খবর ছড়িয়ে পড়ার পর তানোর উপজেলার স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী, শিক্ষাবিদ, সমাজসেবক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে বিভিন্ন পোস্ট দিয়ে তাঁর পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানাচ্ছেন। অনেকেই এটিকে তানোরের জন্য গর্বের অর্জন উল্লেখ করে সরকারি ও বেসরকারি সহায়তার দাবি জানিয়েছেন।

তানোর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও উপজেলা পরিষদ প্রশাসক নাঈমা খান বলেন, মাহমুদা খাতুনের বিষয়টি জেনেছি। এমন অসচ্ছল পরিবার থেকে মেডিকেলে ভর্তি হওয়া শুধু তাঁর পরিবারের নয়, পুরো তানোর উপজেলার জন্য গর্বের বিষয়। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পেলে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে সহযোগিতার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। পাশাপাশি সমাজের বিত্তবানদেরও এগিয়ে আসা প্রয়োজন।

দারিদ্র্য আর প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে মেডিকেল কলেজে পৌঁছানো মাহমুদার গল্প এখন তানোরের মানুষের মুখে মুখে। তবে স্বপ্নপূরণের এই পথ কতটা দীর্ঘ হবে, তা নির্ভর করছে সমাজ ও রাষ্ট্রের সহায়তার ওপর। অনেকের প্রত্যাশা, অর্থাভাবে যেন থেমে না যায় এক সম্ভাবনাময় চিকিৎসকের পথচলা।

এএস

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...