লোহানীপাড়া বন বিভাগে গাছ কাটার মহোৎসব

এমএ সালাম বিশ্বাস, বদরগঞ্জ (রংপুর)

লোহানীপাড়া বন বিভাগে গাছ কাটার মহোৎসব

রংপুরের বদরগঞ্জে লোহানী পাড়া ইউনিয়নের সামাজিক বন বিভাগে চলছে গাছ কাটার মহোৎসব। বন রক্ষা কমিটির সাধারণ সদস‍্যদের বোকা বানিয়ে কমিটির সভাপতিদের যোগশাজসে বিট কর্মকর্তা মজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে লাখ লাখ টাকার গাছ বিক্রির অভিযোগ উঠেছে।

বিজ্ঞাপন

সম্প্রতি অবৈধ পথে আসা বনের প্রায় লাখ টাকার চোরাই গাছ লোহানীপাড়া এলাকার একটি করাতকল থেকে বিট কর্মকর্তা কাগজে কলমে জব্দ করে নিজ হেফাজতে নেন। কিন্তু কয়েক দিন পরে রাতের অন্ধকারে তার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় সেখান থেকে ২০টি গাছের গুঁড়ি উধাও হয়ে যায়।

নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক বন চোর চক্রের একাধিক সদস‍্য আমার দেশের এই প্রতিবেদককে জানান, উপজেলার কুতুবপুর গাছুয়াপাড়া গ্রামের ভোলা চোরের ছেলে শাহিন, নাগেরহাট এলাকার রোস্তম আলী এবং মিঠাপুকুরের কসবা গ্রামের মুকুলসহ ১৫-২০ জনের সংঘবদ্ধ দল বিট কর্মকর্তা মজিবুর রহমানের সঙ্গে সখ‍্য তৈরি করে বনের গাছ কেটে নিয়ে যাচ্ছে।

বিট অফিসের একটি সূত্র বলছে, সামাজিক বন বিভাগের লাখ লাখ টাকার গাছ প্রতি রাতেই কাটা পড়েছে। অথচ বিট কর্মকর্তা তাদের বিরুদ্ধে ব‍্যবস্থা নিতে করেন নানা রকম গড়িমসি।

বন রক্ষা কমিটির সভাপতি নজরুল ইসলাম ও রশিদা বেগম, আ. সালাম ও রশিদুল হক অভিযোগ করেন, সাহেবগঞ্জ অটো স্ট্যান্ডে ৫০ হাজার টাকা দামের একটি আকাশমণি গাছে কেটে ফেলেছিল। গাছটি জব্দ করার জন‍্য মজিবুর রহমানকে অনুরোধ করার পরও আমাদের কথা শোনেননি। কিছুদিন পর গাছটি সেখান থেকে উধাও হয়ে যায়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, সংঘবদ্ধ বন বিভাগের গাছ চোর চক্রের সিন্ডিকেটের সঙ্গে বিট কর্মকর্তা সব সময় যোগাযোগ রক্ষা করে চলেন। বন বিভাগের এসব গাছ বিক্রির সিংহভাগ টাকা চলে যায় ভুঁইফোড় সাংবাদিকসহ বিট কর্মকর্তা ও ফরেস্ট সদস‍্যদের পকেটে।

মাঝেমধ্যে বিট কর্মকর্তা বিভিন্ন করাতকলে লোকদেখানো অভিযান চালিয়ে চোরাই গাছ দু-চারটি উদ্ধার করে তাদের কোটা পূরণ করে দায়িত্ব শেষ করেন। অভিযানের পর খানিকটা সময় বন নিধনকারীরা গা-ঢাকা দিলেও কয়েক দিন পরে আবারও নেমে পড়ে বনের গাছ চুরির প্রতিযোগিতায়। প্রতি রাতেই দিনাজপুরের মধ‍্যপাড়া রেঞ্জের লাখ লাখ টাকার চোরাই গাছ ঢুকে পড়ে বদরগঞ্জ এলাকায়।

সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, দেড় দশক আগে মিঠাপুকুর ফুলবাড়ী মহাসড়কের দুপাশ দিয়ে লোহানীপাড়া বন বিভাগ বিভিন্ন প্রজাতির বনজ গাছ রোপণ করেন। কিন্তু কর্মরত লোহানীপাড়া ফরেস্ট কর্মকর্তা বন রক্ষা কমিটির সভাপতিদের সঙ্গে আঁতাত করে ঝড়ে উপড়েপড়া গাছ রাতের আঁধারে বিক্রি করে টাকা ভাগাভাগি করে নেওয়ার অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে। দক্ষিণপাড়া গ্রামের বন রক্ষা কমিটির সদস‍্য বুলবুল মিয়া অভিযোগ করেন, বিট মজিবুর রহমান ও সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম সম্প্রতি লক্ষাধিক টাকার বাগানের গাছ রাতের অন্ধকারে বিক্রি করে দিয়েছেন।

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, শিয়ালকে রেখেছেন মুরগির খামার পাহারা দেওয়ার জন‍্য।

এছাড়া দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার মধ্যপাড়া রেঞ্জের আওতাধীন পাঁচ পুকুর এলাকার বন বিভাগের আকাশমণি ও শালগাছ সন্ধ্যার পর থেকে ভোরপর্যন্ত পাচার হয়ে আসে কাঠ ব‍্যবসায়ীদের কাছে।

প্রত‍্যক্ষদর্শীরা জানান, লোহানীপাড়া বিট কর্মকর্তা মজিবর রহমান বন বিভাগের উপকারভোগী কমিটির সভাপতি জাহাঙ্গীর আলমের হেফাজতে রাখা লাখ টাকার গাছ গায়েব হয়ে গেছে।

সোনারপাড়া এলাকার বন রক্ষা কমিটির সদস‍্য রেজ্জাকুল ইসলাম ও তহমুল হকসহ আরো অনেকে অভিযোগ করেন, কুতুব বাবা ফিলিং স্টেশনের কাছে প্রায় ৫০ হাজার টাকা দামের একটি শুকনো আকাশমণির গাছ কেটে তার বাড়িতে নিয়ে যান সভাপতি জাহাঙ্গীর সোনার।

আমরা বিটকে ওই গাছ অফিসে নিয়ে যাওয়ার জন‍্য অনুরোধ করি। কিন্তু বিট কর্মকর্তা মজিবর আমাদের কথা আমলে না নিয়ে নানা অজুহাত দেখিয়ে কালক্ষেপণ করেন। কিছুদিন পরেই জাহাঙ্গীর আলম মুজিবুর রহমানের সঙ্গে শলাপরামর্শ করে লাখ টাকার গাছ আত্মসাৎ করেন।

বদরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার আনজুমান সুলতানা জানান, এরকম কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার সঠিক প্রমাণ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে ব‍্যবস্থা নেওয়া হবে।

মিঠাপুকুর রেঞ্জ কর্মকর্তা ইকবাল হোসেন খান বলেন, লোহানীপাড়া বিট রংপুর আলমনগর অফিসের আওতায় ওই অফিসে যোগাযোগ করুন।

একই বক্তব্য দিয়েছেন রংপুর জেলা ফরেস্টের কর্মকর্তা রেজাউল করিম।

লোহানীপাড়া বিট কর্মকর্তা মজিবর রহমান বলেন, জনবল সংকটের কারণেই গাছ চুরি ঠেকানো যাচ্ছে না। তবে অভিযোগ আছে, গাছ চুরির ঘটনায় সংশ্লিষ্ট অফিসের লোকজন জড়িত রয়েছেন।

জেডএম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন