প্রতিরোধ আন্দোলন দমনে ফিলিস্তিনি অভিজাতদের ভূমিকা

জোসেফ মাসাদ

প্রতিরোধ আন্দোলন দমনে ফিলিস্তিনি অভিজাতদের ভূমিকা

ফিলিস্তিনিদের প্রতিরোধ আন্দোলনের ইতিহাস কেবল প্যালেস্টাইন লিবারেশন অরগানাইজেশন (পিএলও), হামাস বা ইসলামিক জিহাদের লড়াইয়ের ইতিহাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং দখলদার পশ্চিমা ঔপনিবেশিক শক্তি, তাদের সমর্থনপুষ্ট জায়নবাদী ইহুদি গোষ্ঠী এবং তাদের সহযোগিতা করা ফিলিস্তিনি অভিজাত শ্রেণির বিরুদ্ধে সাধারণ ফিলিস্তিনিদের প্রতিরোধ আন্দোলনের ইতিহাস শত বছরের পুরোনো। আগের আমলের ফিলিস্তিনি অভিজাতরা স্বাধীনতাকামী ফিলিস্তিনিদের প্রতিরোধ আন্দোলন দমনে যেভাবে পশ্চিমা ঔপনিবেশিক শক্তি ও জায়নবাদী ইহুদিদেরকে সহযোগিতা করেছে, তাদের প্রতিনিধি হিসেবে বর্তমানে সেই ভূমিকা পালন করছে মাহমুদ আব্বাসের নেতৃত্বাধীন ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ (পিএ)। গাজায় চলমান ইসরাইলি গণহত্যা এবং অধিকৃত পশ্চিম তীর ও লেবাননে ইসরাইলের অব্যাহত সন্ত্রাসের মধ্যে ফিলিস্তিন ও লেবাননের প্রতিরোধ আন্দোলনকে কেবল জায়নবাদী ইহুদি নয়, নিজেদের অভিজাতদের বিরোধিতার মোকাবিলাও করতে হচ্ছে।

অধিকাংশ দরিদ্র কৃষক, শ্রমিক এবং শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণির ফিলিস্তিনির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ প্রতিরোধ আন্দোলনের সঙ্গে শুরু থেকেই জড়িত ছিল। অন্যদিকে ধনী অভিজাত শ্রেণির একটি বড় অংশ এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণির কিছু অংশ এই প্রতিরোধ আন্দোলনের বিরুদ্ধে পশ্চিমা শক্তি এবং ইউরোপ থেকে নিয়ে আসা জায়নবাদী ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের সহযোগিতা করেছে। অভিজাত ফিলিস্তিনিরা মনে করত, এর মাধ্যমে তারা ঔপনিবেশিক শক্তির কাছ থেকে নানা ধরনের সুবিধা ও ছাড় পাবে। তারা এটাও মনে করত, প্রতিরোধ আন্দোলনকারীরা পরাজিত হবে।

বিজ্ঞাপন

গত শতকের বিশের দশকের শুরু থেকেই ফিলিস্তিনি অভিজাতদের নেতৃত্ব দিয়েছিল আরব নির্বাহী এবং সর্বোচ্চ মুসলিম পরিষদ। এ দুটি সংগঠনকে নিয়ন্ত্রণ করত জেরুসালেম, জাফা এবং অন্যান্য শহরের ফিলিস্তিনি ধনী পরিবারগুলো। আবার এদের বিরোধিতা করেছিল অন্য অভিজাতরা, বিশেষ করে জেরুসালেমের একটি প্রতিদ্বন্দ্বী পরিবার। পরবর্তী সময়ে এই অভিজাতরা জায়নবাদী অর্থায়নে ও সমর্থনে এগ্রিকালচারাল পার্টি বা কৃষি দল (আল-হিজব আল-জিরাই), ন্যাশনাল ডিফেন্স পার্টি, জাতীয় মুসলিম সমিতি এবং পরে আল-হিজব আল-ওয়াতানি (জাতীয় দল) প্রতিষ্ঠা করে। কিন্তু অধিকাংশ কৃষক ও শ্রমিক এতে যোগ না দিয়ে প্রতিরোধের পথ বেছে নেন এবং শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণির ব্যাপক সমর্থন পান তারা।

স্বাধীনতা আন্দোলন

ফিলিস্তিনি মধ্যবিত্ত শ্রেণির বুদ্ধিজীবীরা অভিজাতদের এই আচরণে হতাশ হয়ে ১৯৩২ সালে হিজব আল-ইস্তিকলাল (‘স্বাধীনতা’ দল) গঠন করেন। দলটি কৃষক ও শ্রমিকদের প্রতিরোধ আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানায় এবং বিক্ষোভ, বয়কট ও আইন অমান্য আন্দোলনের মাধ্যমে নাগরিক অধিকার আন্দোলন শুরু করে। ইস্তিকলাল পার্টির নেতারা ব্রিটিশ শাসনের সঙ্গে জড়িত থাকার জন্য অভিজাতদের প্রকাশ্যে সমালোচনা করেন।

১৯৩২ সালের ডিসেম্বরে ইস্তিকলাল পার্টির প্রথম সম্মেলনে এর নেতারা স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান। তারা একই সঙ্গে ব্রিটেন ও জায়নবাদের নিন্দা এবং সদ্য স্বাধীন ইরাক, সৌদি আরব ও মিসরের সঙ্গে সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান জানান। তারা আরব নির্বাহী পরিষদকে নিষ্ক্রিয়তার দায়ে অভিযুক্ত করেন এবং এর নেতাদের কাছে ব্রিটিশ ম্যান্ডেটরি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সহযোগিতা না করার দাবি জানান। পরের বছর ব্রিটিশ দমনপীড়ন, জায়নবাদী বর্ণবৈষম্য, ফিলিস্তিনি কৃষকদের উচ্ছেদ এবং ফিলিস্তিনে ইহুদি অভিবাসন জোরদার করা হলে জনগণকে সংগঠিত করতে দলটির তৎপরতাও জোরালো হয়ে ওঠে।

প্রতিরোধ ও দমনপীড়ন

ব্রিটিশ শাসকদের অসহযোগিতার নীতি গ্রহণে আরব নির্বাহী পরিষদকে রাজি করাতে ব্যর্থ হয়ে ইস্তিকলাল পার্টি ১৯৩৩ সালের অক্টোবরে ব্রিটিশ নীতি এবং ইহুদি উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার প্রতিবাদে বিক্ষোভের ডাক দেয়। সহযোগী অভিজাত গোষ্ঠীর বিরোধিতা সত্ত্বেও নির্বাহী পরিষদ অবশেষে নতি স্বীকার করে এবং বিক্ষোভের আহ্বানে সমর্থন জানায়। এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে ফিলিস্তিনজুড়ে হাজার হাজার মানুষ মিছিল শুরু করে। তাদের অনেকের জমি কয়েক মাস আগেই জায়নবাদী উপনিবেশকারীরা দখল করেছিল। তাণ্ডব সৃষ্টিকারী ব্রিটিশ পুলিশ জাফফা ও হাইফায় ২৬ জন নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীকে হত্যা করে, আহত হন অনেকেই। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ, উভয় শিবিরের ধনী অভিজাত ফিলিস্তিনি এবং জায়নবাদীরা ইস্তিকলাল পার্টিকে দমন করার ক্ষেত্রে একটি অভিন্ন স্বার্থ দেখেছিল। তাদের সম্মিলিত চেষ্টায় ১৯৩৪-১৯৩৫ সালের মধ্যে উপনিবেশ-বিরোধী জনপ্রিয় ফিলিস্তিনি দলটি প্রায় ধ্বংস হয়ে যায়।

অভিজাত রাজনীতিবিদরা যখন একটি আইনসভা প্রতিষ্ঠার বিষয়ে ব্রিটিশ হাইকমিশনারের সঙ্গে আলোচনা করছিলেন, তখন ইস্তিকলালের নেতাদের নেতৃত্বে এবং শ্রমিকদের অংশগ্রহণে ১৯৩৬ সালের এপ্রিল মাসে সাধারণ ধর্মঘট কর্মসূচি শুরু হয় এবং ছয় মাস ধরে চলা এই ধর্মঘট আজ পর্যন্ত বিশ্বের দীর্ঘতম সাধারণ ধর্মঘট কর্মসূচির শীর্ষে রয়েছে।

ইস্তিকলালের নেতৃবৃন্দ এবং ইয়ং মুসলিম মেন’স অ্যাসোসিয়েশনসহ ফিলিস্তিনি বিভিন্ন যুবগোষ্ঠীর নেতৃত্বে সংগঠিত ফিলিস্তিনিরা এসব রাজনৈতিক কর্মসূচির অগ্রভাগে ছিলেন। তাদের এই কর্মসূচি অভিজাত রাজনীতিবিদদের একটি আরব হায়ার কমিটি প্রতিষ্ঠা করতে বাধ্য করে। এটি ছিল একটি জোট, যা অভিজাতদের গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে ১৯৩৪ সালের আগস্টে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া আরব এক্সিকিউটিভের স্থলাভিষিক্ত হয়। হায়ার কমিটি আইন অমান্য আন্দোলনের দাবিগুলোকে সংযত করার চেষ্টা করে, অন্যদিকে ব্রিটিশ হাইকমিশনার জনগণকে সংযত রাখার ভূমিকার কথা অভিজাত নেতৃত্বকে স্মরণ করিয়ে দেন।

ফিলিস্তিনি অভিজাত যারা ব্রিটিশদের আনুকূল্য লাভের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং জায়নবাদীদের তোষামোদ করত, তারা রাজনৈতিক দল গঠন করতে শুরু করে। অন্যদিকে সাধারণ ফিলিস্তিনিরা বিদ্রোহ শুরু করলে ১৯৩৯ সালে ব্রিটিশ ও জায়নবাদী বসতি স্থাপনকারীদের নৃশংস দমন অভিযানে আট হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হন। এ সময় ফিলিস্তিনি অভিজাত সহযোগীরা বিপ্লবীদের হত্যা করতে ‘শান্তি বাহিনী’ নামে একটি প্রতিবিপ্লবী মিলিশিয়া বাহিনী গঠন করে। এই বিদ্রোহ ব্যর্থ হওয়ার ৯ বছর পর ১৯৪৮ সালের ১৪ মে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেওয়া হয়, যা ফিলিস্তিনিদের প্রথম ‘নাকবা’ বা গণঅভ্যুত্থানের সূচনা করেছিল। এই নাকবা চলাকালে প্রায় ৫৫০ ফিলিস্তিনি গ্রাম ও শহর দখল এবং ধ্বংস করে ইসরাইলি সামরিক বাহিনী ও মিলিশিয়া গ্রুপগুলো। এর ফলে প্রায় আট লাখ ফিলিস্তিনি তাদের বাড়িঘর হারিয়ে উদ্বাস্তুতে পরিণত হন। এদের অধিকাংশই জর্ডান ও লেবাননে গিয়ে আশ্রয় নেন।

অসলো চুক্তির উত্তরাধিকারী

নাকবা-পরবর্তী যুগে ফিলিস্তিনিদের লড়াই আবার শুরু হয়। বিতাড়িত ফিলিস্তিনি কৃষক ও শ্রমিকদের সন্তানরা মধ্যবিত্ত শ্রেণির একাংশের সঙ্গে মিলে গত শতকের পঞ্চাশের দশকের শেষের দিকে একটি নতুন রাজনৈতিক সংগ্রাম শুরু করে। ষাটের দশকের শেষের দিকে এটি একটি সশস্ত্র প্রতিরোধ আন্দোলনে রূপান্তরিত হয়। কিন্তু ফিলিস্তিনি অভিজাতরা দ্রুতই এই আন্দোলনকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। বলা হয়, ‘আন্তর্জাতিক’ বৈধতা অর্জনে সহায়তা করার জন্যই এটা করা হয়েছে। এর প্রথম পদক্ষেপ ছিল ১৯৭৪ সালে আরব সরকারগুলোর কাছে মধ্যস্থতা করে প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশনকে (পিএলও) ‘ফিলিস্তিনি জনগণের একমাত্র বৈধ প্রতিনিধি’ হিসেবে স্বীকৃতি আদায় করা। আরব সরকারগুলোর অর্থায়ন শিগগিরই পিএলওকে তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে।

নাকবা-পূর্ববর্তী ফিলিস্তিনি অভিজাতদের কৌশল অনুকরণ করে পিএলও জায়নবাদী বসতি স্থাপনকারী ঔপনিবেশিকতা থেকে ফিলিস্তিনি মুক্তির দাবিকে ‘নরম’ করে তার পরিবর্তে ‘দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান’-এর আহ্বান জানায়। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গোপন এবং ইউরোপের সঙ্গে প্রকাশ্য যোগাযোগ শেষ পর্যন্ত পিএলওর পূর্ববর্তী যে কর্মসূচি—‘ফিলিস্তিনিদের পূর্ণ মুক্তি’, তা থেকে সরে এসে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের একটি ক্ষুদ্র অংশে একটি ক্ষুদ্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবিতে পরিণত করেছিল।

এদিকে ইয়াসির আরাফাতের নেতৃত্বাধীন পিএলও এবং এর উত্তরসূরি বর্তমান ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ (পিএ) ইস্তিকলাল পার্টি ও কৃষক বিপ্লবীদের পরিচালিত সংগ্রামকে পুনরুজ্জীবিত করার সব উদ্যোগকে দমন করার চেষ্টা করেছে। এই সংগ্রামটি প্রাথমিকভাবে সত্তরের দশকের মাঝামাঝি থেকে পিএলও’র ‘প্রত্যাখ্যানবাদী ফ্রন্ট’ এবং আশির দশকের শেষভাগ ও নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকে হামাস, ইসলামিক জিহাদ ও পিএলও’র অবশিষ্ট বামপন্থিদের সমর্থন পেয়েছিল।

এর চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে ২০০৭ সালে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল এবং পিএ’র সংগঠিত একটি অভ্যুত্থানের মাধ্যমে, যা তিরিশের দশকে ইস্তিকলাল পার্টির বিরুদ্ধে অনুরূপ জোটের জোটবদ্ধ হওয়ার ঘটনারই প্রতিচ্ছবি বলা যায়। পিএ’র নিরাপত্তা বাহিনী তিরিশের দশকের ‘শান্তিরক্ষী বাহিনী’র ভূমিকা পালন করেছিল। ১৯৯৩ সাল থেকে ফিলিস্তিনি জনগণ এই পরিস্থিতিরই সম্মুখীন হয়েছে। তাদের সংগ্রাম আজও চলছে ইসরাইলের সহযোগী ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ (পিএ) এবং ইহুদি বসতির অবসান ঘটাতে বদ্ধপরিকর একটি মুক্তিকামী প্রতিরোধ বাহিনীর নেতৃত্বে।

গাজা গণহত্যা হলো ফিলিস্তিনি প্রতিরোধের বিরুদ্ধে ইসরাইল ও তার পশ্চিমা পৃষ্ঠপোষকদের প্রতিক্রিয়া, অন্যদিকে গণহত্যার সময় তাদের প্রতিনিধি পিএ নিয়ন্ত্রিত পশ্চিম তীরের এলাকাগুলোয় প্রতিরোধের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ও দমনপীড়ন আরো তীব্র করেছে। পিএ’কে তার এই অভিযানে সহায়তা করে ইসরাইলি দখলদার সেনাবাহিনী এবং সশস্ত্র ইহুদি বসতি স্থাপনকারীরা।

কিন্তু ১৯২০ থেকে ১৯৪০-এর দশকের সহযোগী ও সহযোগিতাকারী ফিলিস্তিনি অভিজাতরা যেমন প্রতিরোধ আন্দোলনকে থামাতে পারেনি, তেমনি বর্তমান পিএ’র সহযোগীরাও ফিলিস্তিনিদের প্রতিরোধের চেতনাকে দমন করতে ব্যর্থ হচ্ছে। ইসরাইল ও তার পশ্চিমা পৃষ্ঠপোষক, তাদের সহযোগী মাহমুদ আব্বাসের পিএ এবং এটাকে সমর্থনকারী ধনী ফিলিস্তিনি অভিজাতদের এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে প্রতিরোধ আন্দোলনের বিরোধিতা এবং ইসরাইলকে সহযোগিতা করা সত্ত্বেও সাধারণ ফিলিস্তিনিদের সমর্থনের পাল্লা প্রতিরোধের দিকেই ঝুঁকছে।

মিডল ইস্ট আই অবলম্বনে মোতালেব জামালী

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন