লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলা সদরের ঐতিহ্যবাহী বুড়িরহাট-বাজারের সরকারি জায়গা অবৈধ দখলদারদের সিন্ডিকেটের কবলে পড়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন হাটের ইজারাদার। পহেলা বৈশাখ থেকে পরবর্তী এক বছরের জন্য সরকারি ভ্যাট-ট্যাক্সসহ মোট ১৭ লাখ ৪০ হাজার টাকায় বুড়িরহাটটি ইজারা নেন সাইফুজ্জামান ফারুক। কিন্তু হাটের দায়িত্ব বুঝে নিতে গিয়ে তিনি দেখেন, হাটের কাঁচাবাজার, গরুর হাট, মুরগির বাজার ও সাইকেলের হাটের জন্য নির্ধারিত মূল জায়গাগুলো সম্পূর্ণ বেদখল হয়ে গেছে।
সেখানে নিয়মবহির্ভূতভাবে গড়ে উঠেছে স্থায়ী দালান, মুরগির খামার, টিনশেড ঘর ও দোকানপাট। এমনকি সরকারি এই জায়গা অবৈধভাবে দখল করে লাখ লাখ টাকা জামানত নিয়ে অন্য ব্যবসায়ীদের কাছে ভাড়া দেওয়ার মতো তথ্যও মিলেছে । ফলে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী হাটে কোনো স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণের সুযোগ না থাকলেও, দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে এখানে দখলের মহোৎসব চলেছে। বর্তমানে মূল জায়গা না পেয়ে বাধ্য হয়ে অন্যের জায়গা ভাড়া নিয়ে হাট পরিচালনা করতে হচ্ছে ইজারাদারকে, যার কারণে তিনি মারাত্মক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন এবং সরকারও বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে।
হাটের জায়গায় গড়ে ওঠা বিভিন্ন দোকানের ভাড়াটিয়া ও মালিকদের সঙ্গে কথা বলে এই অনিয়মের সত্যতা মিলেছে।
মুরগির খামারের ভাড়াটিয়া আনিসুর রহমান জানান, তিনি আগের হাট কালেক্টরের কাছ থেকে মাসে ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা ভাড়ায় দোকানটি নিয়েছেন। ১ লাখ ২০ হাজার টাকা জামানত দিয়ে পাঁচ বছরের চুক্তিতে দোকান নেওয়া। সেলুন মালিক বিমল দেবদাস জানান, জায়গাটি ফাঁকা পেয়ে তিনি নিয়েছিলেন, তবে পরে জেনেছেন এটি হাটের জায়গা। অন্যদিকে, মুদি দোকানদার আব্দুর রাজ্জাক মালামালের নিরাপত্তার স্বার্থে অবৈধ জেনেও সেখানে শেডঘর তৈরি করার কথা স্বীকার করেছেন।
এই দখলদারিত্বের পাশাপাশি বাজারে চরম পরিবেশ বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। হাটের বর্জ্য নিষ্কাশনের প্রধান ড্রেনগুলোর ওপর অবৈধ স্থাপনা তৈরি করায় ড্রেনেজ ব্যবস্থা পুরোপুরি অচল হয়ে পড়েছে। প্রতিদিন জবাই করা গরুর রক্ত ও বর্জ্য উন্মুক্ত স্থানে ফেলায় পুরো এলাকায় তীব্র দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে এবং মশা-মাছির উপদ্রব বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে করে হাটের চারপাশের বসতবাড়ির বাসিন্দারা চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে দিন কাটাচ্ছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা শারমিন আক্তার ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, স্বামীহীন সংসারে সন্তানদের নিয়ে এই দুর্গন্ধ ও দূষণের কারণে তারা বাড়িতে টিকে থাকতে পারছেন না, এমনকি আত্মীয়-স্বজনরাও বাড়িতে আসতে চায় না। ইজারাদারকে বারবার জানিয়েও এর কোনো প্রতিকার মেলেনি।
আইনগতভাবে, ‘বাংলাদেশ হাট ও বাজার (স্থাপন ও ব্যবস্থাপনা) আইন, ২০২৩’ অনুযায়ী যথাযথ অনুমতি ছাড়া সরকারি খাস জমিতে কোনো স্থাপনা তৈরি করা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এছাড়া এই আইনের ২০ ও ২৪ ধারা অনুযায়ী যত্রতত্র পশুর বর্জ্য ফেলে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি করলে সুনির্দিষ্ট আর্থিক জরিমানা ও শাস্তির বিধান রয়েছে। তবে বুড়িরহাটে এই আইনের কোনো প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে না।
এই বিষয়ে আদিতমারী উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) গুঞ্জন বিশ্বাস জানান, তিনি একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, হাট ইজারা হওয়ার আগেই এই অবৈধ দোকানপাটগুলো সেখানে গড়ে উঠেছিল। তবে দ্রুত এই অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করে হাটটি দখলমুক্ত করা হবে এবং ইজারাদারের কাছে হাটের জায়গা হস্তান্তরের জন্য সর্বোচ্চ আইনি সহায়তা প্রদান করা হবে বলে তিনি আশ্বাস দিয়েছেন।
এমএইচ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

