পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা কার্যক্রমের অর্থ বরাদ্দের কর্তৃত্ব নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিরোধ তৈরি হয়েছে। গবেষণায় অর্থ দেওয়ার প্রচলিত নিয়ম পরিবর্তন করায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও শিক্ষকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
মঞ্জুরি কমিশন ও বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, আগে গবেষণার সরকারি অনুদান ইউজিসির মাধ্যমে সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পেত। এরপর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিজস্ব প্রক্রিয়ায় শিক্ষকদের মধ্যে সেই অর্থ বিতরণ করত। তবে চলতি বছর থেকে সরকার ইউজিসির মাধ্যমে সরাসরি অর্থ ব্যয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দাবি, এই নতুন সিদ্ধান্তের ফলে গবেষণা কার্যক্রমে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষকদের স্বাধীনতা সংকুচিত হবে।
তারা বলছেন, গবেষণার বিশাল এই কর্মযজ্ঞ দেখভাল করার মতো সাংগঠনিক সক্ষমতা মঞ্জুরি কমিশনের নেই।
তবে ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ জানান, তারা ইতোমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
তিনি বলেন, উপাচার্যদের একটি দল এবং কমিশনের অর্থ ও গবেষণা বিভাগ মিলে একটি নতুন নীতিমালা তৈরি করবে। এতে সরকারের সিদ্ধান্ত এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাতন্ত্র্য—দুটি বিষয়ই বজায় থাকবে।
শিক্ষা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এস এম হাফিজুর রহমান মনে করেন, গবেষণার অর্থ ব্যয়ের এখতিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের হাত থেকে সরিয়ে নিলে বড় ধরনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা তৈরি হবে। এটি দেশের গবেষকদের জন্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
এতদিন যেভাবে বরাদ্দ হতো
যুক্তরাজ্যভিত্তিক শিক্ষা ও গবেষণা সংস্থা কিউএস গ্লোবাল র্যাঙ্কিং ২০২৬ অনুযায়ী, এশিয়ার সেরা ১০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বাংলাদেশের কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। তবে সেরা ২০০-র মধ্যে জায়গা পেয়েছে বুয়েট ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়।
শিক্ষকদের মতে, পর্যাপ্ত সময়, সুযোগ ও অর্থের অভাবই দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মানসম্মত গবেষণা না হওয়ার প্রধান কারণ।
ইউজিসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬–২৭ অর্থবছরে কমিশনের মূল বাজেটে গবেষণা খাতে ২৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক শামসুল আলম জানান, আগে ডিনদের মাধ্যমে গবেষণা আবেদনগুলো অনুষদে জমা হতো। এরপর একটি যাচাই-বাছাই কমিটি প্রজেক্ট ও মেধার ভিত্তিতে সেগুলো অনুমোদন করত। অনুমোদন শেষে প্রশাসন সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের নামে বরাদ্দের দুই-তৃতীয়াংশ টাকা ছাড় করত। গবেষণা শেষে তা জমা দেওয়া ও সেমিনারে উপস্থাপনের পর চূড়ান্ত কিস্তির টাকা পেতেন শিক্ষকরা।
নতুন নিয়মে যা হবে
ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ জানান, গবেষণায় অর্থ বরাদ্দের ক্ষেত্রে দ্বৈততা বা ‘ওভারল্যাপিং’ এড়াতে অর্থ মন্ত্রণালয় এই নতুন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখন থেকে গবেষণা মঞ্জুরির অর্থ বিশ্ববিদ্যালয়কে না দিয়ে সরাসরি ইউজিসি নিজেই বিতরণ করবে।
বর্তমানে ইউজিসির অধীনে ৫৯টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকারি অনুদান ইউজিসির মাধ্যমেই যায়। যেমন চলতি বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ হাজার ৩৩ কোটি টাকার বাজেটে সরকার দিচ্ছে প্রায় সাড়ে ৯০০ কোটি টাকা। এই টাকার একটি অংশ গবেষণার জন্য নির্ধারিত থাকত।
ইউজিসি চেয়ারম্যান বলেন, নতুন নিয়মের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে একাডেমিক স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হওয়ার উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে সরকার চায় অর্থের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে। ইউজিসি দুটি পক্ষকেই সম্মান জানিয়ে সমন্বয়ের কাজ করছে। গত ৯ জুলাই উপাচার্যদের সঙ্গে বৈঠকে একটি যৌথ নীতিমালা তৈরির সিদ্ধান্ত হয়েছে, যাতে অর্থ ছাড়ে দীর্ঘসূত্রিতা না হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আপত্তি
সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট অধিবেশনে শিক্ষকরা এই নতুন নিয়মের তীব্র বিরোধিতা করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য ড. মো. আল মোজাদ্দেদী আলফেছানী বলেন, তারা আগের নিয়মেই বরাদ্দ চান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৭টি গবেষণা ব্যুরো ও সেন্টার রয়েছে, যা তদারকি করার সামর্থ্য ইউজিসির নেই। নতুন নিয়মকে তারা গবেষণায় হস্তক্ষেপ বলে মনে করছেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, এই সিদ্ধান্ত শিক্ষকদের ক্ষুব্ধ করেছে। তাদের মনে হচ্ছে অর্থ মন্ত্রণালয় ও ইউজিসির কেউ কেউ এখানে খবরদারি করতে চাইছে। গবেষণার সামান্য টাকার জন্য শিক্ষকরা ইউজিসির বারান্দায় ঘুরবেন কি না, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ড. এস এম হাফিজুর রহমানও বলেন, ইউজিসি বর্তমানে যা আছে তা-ই ঠিকমতো তদারকি করতে পারছে না। নতুন করে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বাড়লে তা গবেষণার ক্ষতি করবে।
তবে ইউজিসি চেয়ারম্যান মামুন আহমেদ আশ্বস্ত করেছেন যে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হবে না। এর আগে ইউজিসির এক বিজ্ঞপ্তিতেও বলা হয়, নতুন এই পদ্ধতি আরো সহজ, স্বচ্ছ ও গবেষক-বান্ধব করা হয়েছে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বকীয়তা ও গবেষণার অগ্রাধিকার কোনোভাবেই ক্ষুণ্ণ হবে না।
এএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

