১৭ হাজার বৃক্ষ, ২৭৭টি প্রজাতি শনাক্ত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমবারের মতো বৃক্ষ শুমারি

প্রতিনিধি, ঢাবি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমবারের মতো বৃক্ষ শুমারি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমবারের মতো পরিচালিত সমন্বিত বৃক্ষ শুমারি-২০২৫-এর ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে। শুমারিতে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ৬২টি গোত্রের ২৭৭টি প্রজাতির মোট ১৭ হাজার ১৬১টি বৃক্ষ শনাক্ত হয়েছে।

একই সঙ্গে ক্যাম্পাসের বৃক্ষসম্পদের প্রজাতিগত বৈচিত্র্য, কার্বন মজুদ, জীবভর, স্বাস্থ্যগত অবস্থা এবং অবস্থানভিত্তিক একটি পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক তথ্যভাণ্ডার তৈরি করা হয়েছে, যা ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজায়ন ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিজ্ঞাপন

বৃহস্পতিবার নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনের কনফারেন্স কক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এ শুমারির ফলাফল প্রকাশ করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবরিকালচার সেন্টারের পরিচালক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জসীম উদ্দিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম, প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী, কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. আবুল কালাম সরকার এবং আর্থ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. হুমায়ুন কবির। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবরিকালচার সেন্টার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবেশ সংসদ এবং বাংলাদেশ সোসাইটি ফর ইকোলজিক্যাল রিসার্চ ইনিশিয়েটিভ যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

শুমারির ফলাফলে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের মোট বৃক্ষের মধ্যে প্রজাতির হিসেবে ৫৮ শতাংশ দেশীয় এবং ৪২ শতাংশ বিদেশি। তবে বৃক্ষসংখ্যার ভিত্তিতে দেশীয় ও বিদেশি বৃক্ষের অনুপাত যথাক্রমে ৫৪ শতাংশ ও ৪৬ শতাংশ। সর্বাধিক আধিক্যসম্পন্ন ১৫টি বৃক্ষ প্রজাতির মধ্যে পাঁচটি বিদেশি প্রজাতি রয়েছে। এগুলোর মধ্যে মেহগনি, দেবদারু, ম্যাকারথুরি পাম, রেইনট্রি এবং সেগুন উল্লেখযোগ্য।

এতে আরও উঠে এসেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃক্ষসমূহের মোট ভূ-উপরিভাগীয় জীবভর ৯ হাজার ৯০০ মেট্রিক টন এবং ভূ-নিম্নীয় জীবভর ২ হাজার ৩৭০ মেট্রিক টন। এসব বৃক্ষের মাধ্যমে মোট ৪ হাজার ৬৫০ মেট্রিক টন কার্বন মজুদ রয়েছে। জীবভরের ক্ষেত্রে দেশীয় বৃক্ষের অবদান ২১ দশমিক ৫ শতাংশ এবং বিদেশি বৃক্ষের অবদান ৭৮ দশমিক ৫ শতাংশ।

উপযোগিতার ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃক্ষসম্পদের মধ্যে ফলদ বৃক্ষ ২৫ শতাংশ, প্রাণিকূল সহায়ক বৃক্ষ ২২ শতাংশ, ঔষধি বৃক্ষ ২১ শতাংশ, কাঠ উৎপাদনকারী বৃক্ষ ২০ শতাংশ এবং শোভাবর্ধনকারী বৃক্ষ ১২ শতাংশ। এছাড়া স্বাস্থ্য মূল্যায়নে ১ হাজার ৮১১টি বৃক্ষকে বিভিন্ন মাত্রার স্বাস্থ্যগত ঝুঁকিতে এবং ২ হাজার ২১৩টি বৃক্ষকে সম্ভাব্য বৃক্ষজনিত বিপর্যয়ের (ট্রি হ্যাজার্ড) আওতায় চিহ্নিত করা হয়েছে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, বৃক্ষ শুমারির মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বৃক্ষসম্পদ সম্পর্কে একটি নির্ভরযোগ্য তথ্যভাণ্ডার তৈরি হয়েছে, যা ভবিষ্যৎ সবুজায়ন ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তিনি পরিবেশবান্ধব ও দেশীয় প্রজাতির বৃক্ষরোপণ সম্প্রসারণ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে আরও সবুজ, নান্দনিক ও টেকসই ক্যাম্পাস হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

তিনি বলেন, পরিকল্পিত বৃক্ষরোপণ ও সুষ্ঠু পরিবেশ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়কে এমন একটি ক্যাম্পাসে পরিণত করতে হবে, যেখানে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও দর্শনার্থীরা নির্মল পরিবেশে স্বস্তির সঙ্গে চলাচল করতে পারবেন। এ লক্ষ্যে পরিবেশবান্ধব বৃক্ষ সংরক্ষণ, ফলজ ও উপকারী গাছের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সংশ্লিষ্ট সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃক্ষ শুমারি ক্যাম্পাসের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা ও টেকসই সবুজায়ন পরিকল্পনায় কার্যকর ভূমিকা রাখবে। তিনি বায়ুদূষণ সহনশীল দেশীয় বৃক্ষরোপণ, জলাধার সংরক্ষণ এবং জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ প্রাকৃতিক পরিবেশ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী বলেন, টেকসই ও নিরাপদ ক্যাম্পাস গঠনে বৃক্ষ শুমারি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। তিনি ঝুঁকিপূর্ণ গাছ দ্রুত চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং পর্যায়ক্রমে নতুন বৃক্ষরোপণের ওপর জোর দেন।

শুমারি সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০২৫ সালে পরিচালিত এ জরিপে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসকে পাঁচটি প্রধান জরিপ একক এবং ৪৫টিরও বেশি উপ-এককে বিভক্ত করা হয়। প্রতিটি বৃক্ষের তথ্য Direct Measurement Method অনুসরণ করে সংগ্রহের পর আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে প্রজাতিগত বৈচিত্র্য, জীবভর, কার্বন মজুদসহ বিভিন্ন সূচক নিরূপণ করা হয়। পাশাপাশি Google My Maps ও ArcGIS-এর সহায়তায় ক্যাম্পাসের একটি উন্মুক্ত, ডিজিটাল ও মানচিত্রভিত্তিক বৃক্ষ ডাটাবেজও তৈরি করা হয়েছে, যা ভবিষ্যতে গবেষণা, সংরক্ষণ ও পরিবেশ পরিকল্পনায় ব্যবহার করা যাবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...