গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, ফ্যাসিবাদী সরকার রাষ্ট্রের বিভিন্ন সাংবিধানিক ও স্বশাসিত প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেছিল, যার ফলে গণতান্ত্রিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়েছিল।
বুধবার (২৪ জুন) জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে আয়োজিত দুই দিনব্যাপী ‘রবীন্দ্র-নজরুল উৎসব: সাহিত্য, সংগীত ও সংস্কৃতির মিলনমেলা’ অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।
মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, বর্তমান সরকার এমন এক সময়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে, যখন দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠান, সাহিত্য-সংস্কৃতি এবং অর্থনৈতিক খাত নানা সংকট ও অব্যবস্থাপনার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় ছিল।
তিনি আরও বলেন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলীর বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিকৃতি ঘটানো হয়েছিল। ইতিহাসের সঠিক উপস্থাপন এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের মাধ্যমে জাতির আত্মপরিচয়কে সুদৃঢ় করার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
কাজী নজরুল ইসলাম সম্পর্কে মন্ত্রী বলেন, সাধারণ ও দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে এসেও নজরুল তার অসাধারণ প্রতিভা, বিদ্রোহী চেতনা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থানের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অনন্য স্থান অর্জন করেছেন। তার সংগ্রামী জীবন, আত্মমর্যাদাবোধ এবং শোষণবিরোধী দর্শন আজও সমাজকে অনুপ্রাণিত করে। তিনি উল্লেখ করেন, নজরুলের ব্যক্তিত্ব ও সাহসিকতার জন্য কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও তার প্রতি বিশেষ স্নেহ ও শ্রদ্ধা পোষণ করতেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রবীন্দ্রনাথ ছিলেন গভীর মানবতাবোধসম্পন্ন একজন বিশ্বকবি, যিনি মানুষের কল্যাণ, মানবিক মূল্যবোধ এবং সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতি আন্তরিক সহমর্মিতা প্রদর্শন করেছেন। তার সাহিত্য, দর্শন ও চিন্তাধারা আজও বাঙালি জাতির সাংস্কৃতিক ও মানবিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
মন্ত্রী আরও বলেন, বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর বৈচিত্র্য। সমতল, পাহাড়, বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী, নৃগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের সহাবস্থান দেশের সাংস্কৃতিক ঐশ্বর্যকে সমৃদ্ধ করেছে। এই বৈচিত্র্যের সৌন্দর্য ও মানবিক মূল্যবোধকে ধারণ করে রাষ্ট্রের সব নাগরিকের সমঅধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকার কাজ করে যাচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্দীন, রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. তাহমিনা আখতার, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আজম এবং জবি ট্রেজারার অধ্যাপক ড. সাবিনা শরমীন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংগীত বিভাগের চেয়ারম্যান ড. অণিমা রায়।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্দীন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমবারের মতো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামকে কেন্দ্র করে যৌথভাবে উৎসব আয়োজনের জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সাংস্কৃতিক চর্চার ক্ষেত্রে যে স্থবিরতা ও সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছিল, বর্তমান সময়ে তা কাটিয়ে ওঠার নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
উপাচার্য বলেন, বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের অবদান অবিস্মরণীয়। তবে বিভিন্ন সময়ে রবীন্দ্রচর্চা অব্যাহত থাকলেও নজরুলচর্চা তুলনামূলকভাবে উপেক্ষিত হয়েছে। অথচ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের জাগরণের কবি, আস্থার কবি এবং অস্তিত্বের কবি। তাঁর সাহিত্য ও দর্শন বাঙালির মুক্তি, সাম্য, মানবতা এবং প্রতিবাদের চেতনাকে ধারণ করে।
তিনি আরও বলেন, রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল এই দুই মহাকবির চিন্তা, সাহিত্য ও দর্শনকে একত্রে ধারণ করার মধ্য দিয়েই বাঙালি জাতিসত্তার পূর্ণ বিকাশ সম্ভব। এ ধরনের উৎসব নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁদের জীবনাদর্শ ও সাহিত্যকর্মকে আরও বিস্তৃতভাবে তুলে ধরবে এবং জাতীয় সাংস্কৃতিক চেতনাকে সমৃদ্ধ করবে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর সাহিত্য, সংগীত ও দর্শনের মাধ্যমে দেশপ্রেম, মানবতাবোধ এবং জাতিগত সম্প্রীতির শিক্ষা দিয়েছেন।
রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. তাহমিনা আখতার বলেন, সংগীতচর্চা কেবল শাস্ত্রীয় বিদ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর আবেদন সর্বস্তরের মানুষের কাছে রয়েছে। তিনি বলেন, রবীন্দ্রনাথ একাধারে কবি, সাহিত্যিক, গীতিকার ও সমাজসংস্কারক ছিলেন এবং তাঁর পল্লী উন্নয়ন ভাবনা আজও প্রাসঙ্গিক। একইভাবে নজরুল সমাজ উন্নয়ন, শান্তি ও আত্মনির্ভরশীলতার চেতনা ধারণ করে সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছেন।
উদ্বোধনী পর্ব শেষে অনুষ্ঠিত সাংস্কৃতিক আয়োজনে রবীন্দ্রসংগীত, কবিতা আবৃত্তি ও নৃত্য পরিবেশনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে অংশগ্রহণ করেন দেশের খ্যাতিমান শিল্পী বুলবুল ইসলাম, শামা রহমান এবং জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়। এছাড়া ‘শ্যামল সুন্দর’ পরিবেশন করে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগ। ‘নৃত্যনাট্য চিত্রাঙ্গদা’ পরিবেশন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃত্যকলা বিভাগ, ধৃতি নর্তনালয় এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগ।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের আয়োজনে এবং সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় দুই দিনব্যাপী রবীন্দ্র-নজরুল উৎসবের দ্বিতীয় দিন আগামীকাল বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) অনুষ্ঠিত হবে নজরুল পর্ব। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন জবি উপাচার্য, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক শেখ রেজাউদ্দিন আহমেদ এবং জবি ট্রেজারার।
এআরবি
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

