জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউট-এর সাবেক মহাপরিচালক, একুশে পদকপ্রাপ্ত বরেণ্য শিল্পী, প্রখ্যাত চিত্রকর, পাপেট শিল্পের পথিকৃৎ এবং বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মুস্তাফা মনোয়ার আজ, ২৯ জুন রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯১ বছর।
মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন বাংলাদেশের শিল্প, সংস্কৃতি ও গণমাধ্যম জগতের এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। কবি গোলাম মোস্তফার সন্তান হিসেবে তিনি শৈশব থেকেই শিল্পচর্চায় আত্মনিয়োগ করেন। ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণ থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশে শিল্প, সংস্কৃতি ও গণমাধ্যমের বিকাশে তিনি অসামান্য অবদান রেখে গেছেন।
তিনি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের লাল সূর্যের অন্যতম স্থপতি, বাংলাদেশের পাপেট শিল্পের অগ্রদূত এবং শিশু-কিশোরদের জন্য জনপ্রিয় চরিত্র ‘পারুল’-এর স্রষ্টা। বাংলাদেশ টেলিভিশনের বহুল প্রশংসিত অনুষ্ঠান ‘নতুন কুঁড়ি’ ও ‘মনের কথা’ নির্মাণের মাধ্যমে তিনি প্রজন্মের পর প্রজন্মের সৃজনশীল বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
সেই তুমুল জনপ্রিয় অনুষ্ঠানের নাম ছিল ‘মনের কথা’, যা এ প্রজন্মের অনেকেই আজও ভোলেননি। যেখানে পারুল আর বাউলের মজার মজার গল্প, আর একটু পরপর একটি গরুর ‘হাম্বা’ ডাক শিশুদের আনন্দে ভাসাত। বাউল হাতে একতারা নিয়ে গান গাইত, আর পারুল এসে গল্প জুড়ত।
পারুল-বাউলের এই যুগলবন্দি একটি প্রজন্মকে এতটাই কাছে টেনে নিয়েছিল যে, তার প্রয়াণের খবরের পরপরই সামাজিক মাধ্যমে ‘মনের কথা’ অনুষ্ঠানের পুরোনো ভিডিওর মন্তব্য ঘরে এসে এই গুণী ব্যক্তিত্বকে স্মরণ করছেন নেটিজেনরা। শৈশবের স্মৃতি রোমন্থন করে অনেকেই তার আত্মার শান্তি কামনা করে আবেগঘন বার্তা দিচ্ছেন।
এছাড়াও UNICEF -এর শিশু-কেন্দ্রিক উদ্যোগ ‘মীনা’- এর সঙ্গেও তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় শরণার্থী শিশুদের মানসিক সাহস ও আনন্দ ফিরিয়ে আনতে পাপেট শোর আয়োজন তাঁর মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি ও সৃজনশীলতার এক অনন্য উদাহরণ।
কর্মজীবনে তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ শিশু একাডেমি, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা (বিএফডিসি), বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি ০৩ মে ১৯৯০ থেকে ১২ এপ্রিল ১৯৯১ পর্যন্ত জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে গণমাধ্যম উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ এবং সৃজনশীল মানবসম্পদ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
শিল্প, সংস্কৃতি ও গণমাধ্যমে তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ২০০৪ সালে একুশে পদক-এ ভূষিত হন। তাঁর সৃষ্টিশীল কর্ম, প্রজ্ঞা এবং মানবিক মূল্যবোধ বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গন ও গণমাধ্যম জগতে চিরদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

