আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

শায়েস্তা খাঁর চট্টগ্রাম জয়ের ৩৬০ বছর

মাহমুদ নাসির জাহাঙ্গীরি

শায়েস্তা খাঁর চট্টগ্রাম জয়ের ৩৬০ বছর

১৬৬৫ ও ১৬৬৬ এই ‘দুই বছরের সমগ্রতা’কে ইউরোপে অভিহিত করা হয় ‘ইয়ারস অব ওয়ান্ডার’ বলে। এ সময়ে সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনার একটি ঘটে ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা পরিবারের সর্বদক্ষিণ প্রান্ত বাংলাদেশে এবং অন্যটি উত্তর প্রান্তের ইংল্যান্ডে। তখন ইংল্যান্ডে চলছিল মহামারি আর বাংলাদেশে ঔপনিবেশিক অরাজকতা।

দ্বিতীয় অ্যাংলো-ডাচ যুদ্ধের সময়েই শুরু হয় শায়েস্তা খাঁর চট্টগ্রাম অভিযান (২৪ ডিসেম্বর ১৬৬৫-২৭ জানুয়ারি ১৬৬৬)। শত মাইলব্যাপী বিস্তৃত উত্তর সাগর পাড়ি দিয়ে ব্যয়বহুল যুদ্ধ পরিচালনা করে ইংল্যান্ড ও হল্যান্ড। এমন এক সময়ে এ যুদ্ধ পরিচালিত হয়, যখন ইংল্যান্ডের রাজা ছিলেন প্লেগাক্রান্ত রাজধানী থেকে নির্বাসিত, সংসদের কার্যক্রম ছিল স্থগিত। ইংল্যান্ডের কাছে এ যুদ্ধকে মনে হয় সাগরের মতোই কূলকিনারাহীন, ঝঞ্ঝাকে মনে হয় দৃষ্টি আচ্ছন্ন করা দিকচক্রবাল, মহামারিকে মনে হয় অন্ধকার মরীচিকা। পক্ষান্তরে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে শায়েস্তা খাঁ শুরু করেন তার বহু প্রতীক্ষিত ও পরিকল্পিত অভিযান। সারা পৃথিবীতে টর্নেডোর জন্য বিখ্যাত বঙ্গোপসাগর অভিমুখে এগিয়ে যায় মোগলদের যুদ্ধাস্ত্রসজ্জিত রণতরি। ১৬৬৫ সালের ২৪ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম অভিযান শুরু হয় শায়েস্তা খাঁর ছেলে প্রধান সেনাপতি বুজুর্গ উমেদ খাঁর নেতৃত্বে ঢাকার লালবাগ দুর্গ থেকে। রণকৌশল হিসাবে স্থলবাহিনীর সঙ্গে যুক্ত হয় নৌবাহিনী। তিন ধাপে এ যুদ্ধ পরিচালিত হয়। নৌবাহিনী ঢাকা থেকে যাত্রা শুরু করে প্রথমে জয় করে সন্দ্বীপ। স্থলবাহিনী ঢাকা থেকে জুগিদিয়া অভিমুখে এবং সর্বশেষে যৌথবাহিনী ১৬৬৬ সালের ১৪ জানুয়ারি ফেনী নদীর উত্তর পাড় থেকে চট্টগ্রাম অভিযান শুরু করে। তাকে অতিক্রম করতে হয় প্রমত্তা মেঘনা ও খরস্রোতা পাহাড়ি ফেনী নদী, পার হতে হয় মিরেরসরাই ও সীতাকুণ্ডের জঙ্গলাকীর্ণ পথ। ১৬৬৬ সালের ২৪ জানুয়ারি মোগল বাহিনী পর্তুগিজ বাহিনীকে সামনে রেখে আরাকানি বাহিনীর বিরুদ্ধে বাত্যাসংকুল সন্দ্বীপ চ্যানেলে যুদ্ধ শুরু করে। ২৪ থেকে ২৭—এই চার দিনের যুদ্ধ সংঘটিত হয় কর্ণফুলি নদীর মোহনায়। আরাকানিদের বাঁশের কেল্লায় আগুন ধরিয়ে দেওয়ার পর দেয়াঙ ঘাঁটি পোড়ে লন্ডন নগরীর মতো। তারপরই জয় করা সম্ভব হয় আরাকানি দুর্গ, যাকে শিহাবউদ্দিন তালিশ তুলনা করেছেন আলেক্সান্ডারের দুর্গের সঙ্গে। কর্ণফুলি নদীর যুদ্ধ শেষ হয় শীতকালের নিস্তরঙ্গ নদী বৈতরণি পাড়ি দিয়ে। শায়েস্তা খাঁ দেশের সীমানা বিস্তৃত করেন উত্তর চট্টগ্রাম থেকে দক্ষিণ চট্টগ্রামের রামু পর্যন্ত। শায়েস্তা খাঁর চট্টগ্রাম বিজয় ইতিহাসে সেরা মাইলফলক হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে তার অনন্য রণকৌশলগত দক্ষতার কারণে। স্বাধীন সুলতানাতের পরাজয়ের পর সাময়িক বিরতি দিয়ে প্রায় ১৩০ বছর (১৫৩৮-১৬৬৬) চট্টগ্রাম পর্তুগিজ ও মগদের আবাসস্থল ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। চট্টগ্রাম বিজয়ের ফলে শত বছরের দুর্যোগের পর স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়, ঔপনিবেশিক আধিপত্যবাদের যুগে দেশ মুক্ত হয় বিদেশি শত্রুর রাহুগ্রাস থেকে।

বিজ্ঞাপন

১৬৬৫ সালের ১২ এপ্রিল প্রথম প্লেগে মৃত্যুর ঘটনা ঘটে ইংল্যান্ডে। যে বাড়িতে মানুষ মারা যায়, সে বাড়িতে লাল চক দিয়ে ক্রুশ আঁকা হতো। লন্ডনের এক-তৃতীয়াংশ মানুষ মারা যায় ব্ল্যাক ডেথ বা প্লেগে। হুকুম দেওয়া হয়, সব কুকুর-বেড়াল মেরে ফেলার জন্যÑএ রোগ বিস্তারের জন্য দায়ী করা হয় কুকুর-বেড়ালকে। কুকুর-বেড়ালের মৃত্যুতে ইঁদুরের বংশ বৃদ্ধি পেতে থাকে, তাতে বিপদের মাত্রা না কমে বেড়ে যায়। তার ওপর ছিল জাতিগত বিদ্বেষ। প্লেগের দাবানল ছড়িয়ে পড়ার জন্য ইংল্যান্ডের লোকেরা দায়ী করে হল্যান্ডকে। তারা মনে করে এ রোগ এসেছে সমুদ্রপথে শত্রুদেশ হল্যান্ড থেকে। সে বছর এত গরম পড়ে যে, প্রচণ্ড গরমে রাজা দ্বিতীয় চার্লস শহর ছেড়ে গ্রামের বাড়ি সালিসবাড়ি চলে যান। প্লেগের কারণে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হলে নিউটনও (১৬৪২-১৭২৬) বাড়িতে এসে কোয়ারেন্টাইন জীবনযাপন শুরু করেন। দিনের বেলা প্রচণ্ড গরমে বদ্ধ ঘরে আলোর খেলা দেখে যেমন তার সময় কাটে, তেমনি আসে আলোর সূত্রের ধারণা। রাতের বেলা চাঁদের আলোয় আপেলের পতন দেখে মনে আসে মাধ্যাকর্ষণের ধারণা। মাধ্যাকর্ষণের সঙ্গে চাঁদের সম্পর্ক থাকায় মনে করা হয়, এ ঘটনা ঘটে ১৬৬৫ সালের ২২ ডিসেম্বর থেকে ১৬৬৬ সালের ২০ জানুয়ারির মধ্যে। কারণ দুর্যোগপূর্ণ সেই বছরে পরপর দুটি চন্দ্রগ্রহণের ঘটনা ঘটে ওই দুই তারিখে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন