অন্তু ক্লাস ফাইভে ভালো রেজাল্ট করার পর ছোট কাকু তাকে উইশ করার জন্য তার পছন্দের খাবার ও প্রিয় লেখকদের একগাদা বই নিয়ে বাড়িতে এলেন। ছোট কাকু জানেন অন্তু বইয়ের পোকা।
রাতে খাবার টেবিলে ছোট কাকু অন্তুর বাবাকে বললেন, ‘দাদা, অন্তু তো ভালো রেজাল্ট করছে। আমার ইচ্ছে অন্তুকে ভালো একটা স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিই। তাহলে সে ভবিষ্যতে আরো ভালো রেজাল্ট করতে পারবে। আমার বাসায় থেকে পড়াশোনা করবে ।’
‘তাহলে তো ভালো হয়।’
অন্তুর কাকু তাকে সবকিছু গুছিয়ে নিতে বললেন। অন্তু মাথা নেড়ে সায় দেয়। বাবা নিজের হাতে অন্তুকে সবকিছু গোছগাছ করে দেন।
এই ক’দিন অন্তু বাবার মধ্যে একটা পরিবর্তন লক্ষ করে। বাবার মনটা সবসময় কেমন যেন মনমরা থাকে । অন্তু বুঝতে পারে, সে বাবাকে ছেড়ে চলে যাবে বলে বাবার মন খারাপ।
সেই ছোটবেলায় এক জটিল রোগে বেশ কয়েক মাস ভোগার পর অন্তুর মা মৃত্যুবরণ করেছিলেন। মা মারা যাওয়ার পর অন্তুর বাবা তাকে মায়ের অভাব অনুভব করতে দেননি। মায়ের মতো স্নেহ-মমতা দিয়ে তাকে আগলে রেখেছেন ।
আজকে অন্তুরা গ্রাম ছেড়ে শহরের পথে রওনা হবে, আজকের সকালটা ঠিক অন্যদিনের মতোই শুরু হয়েছিল। ভোরবেলা মোরগ ডেকেছিল, জানালার ফাঁক দিয়ে রোদ ঢুকেছিল, উঠোনের গাছে গাছে পাখির কিচিরমিচির ডাকছিল, অঙ্গনজুড়ে রঙ্গন ফুটেছিল; কিন্তু অন্তুর কাছে আজকের সকালটা অন্যরকম। কারণ আজ সে প্রথমবারের মতো বাবাকে ছেড়ে দূরে কোথাও যাচ্ছে ।
সকালে ঘুম থেকে উঠে অন্তু দেখে, বাবা রান্নাঘরে ওর প্রিয় খাবার তৈরিতে ব্যস্ত। অন্তুর এসবের কিছুই দরকার নেই, তারপরও বাবাকে বোঝাবে কে?
বাবাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে অন্তু বলে, ‘এত কিছু বানাচ্ছ কেন, বাবা? আমি তো একাই যাচ্ছি।’
‘তুই একা যাচ্ছিস বলেই তো আমার চিন্তা আরো বেশি। শহরে কে তোর মতো করে তোকে খাওয়াবে?’
বাবার মুখের কথা শুনে অন্তুর বুকের ভেতরটা হঠাৎ মোচড় দিয়ে উঠল। সে নিজের ঘরে এসে দরজায় খিল দিল । তার বুক ফেটে কান্না এলো, দুচোখ জুড়ে নেমে এলো লোনা জলের শ্রাবণধারা ।
কিছুক্ষণ পর দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে অন্তু দরজা খুলে দেখে বাবা দাঁড়িয়ে আছেন। বাবা অন্তুকে খেতে ডাকেন। অন্তু বাবার পিছুপিছু খাবার টেবিলে গিয়ে বসে । টেবিলে থরে থরে সাজানো তার সব প্রিয় খাবার। সে দু-একটা পদ দিয়ে খাবার সেরে নেয় ।
এবার যাওয়ার পালা। বাবা লাগেজের সঙ্গে একটা খাবারের ব্যাগও হাতে ধরিয়ে দেন । অন্তু সেসব নিয়ে রেলস্টেশনে যাওয়ার জন্যে কাকুর সঙ্গে রিকশায় চেপে বসে। রিকশা কিছুদূর যেতেই অন্তু ঘাড় ফিরিয়ে দেখে বাবা দাওয়ায় দাঁড়িয়ে হাত নাড়ছেন।
ধীরে ধীরে বাবার অবয়ব ছোট হয়ে যাচ্ছে, রিকশা রাস্তার বাঁক নিতেই বাবা অদৃশ্য হয়ে গেলেন। গাঁয়ের রাস্তা ধরে রিকশা এগিয়ে চলে। একসময় রিকশা রেলস্টেশনে পৌঁছে যায় । কিছুক্ষণ পর ট্রেন হুইসেল বাজিয়ে স্টেশনে ঢোকে। অন্তুরা হুড়োহুড়ি করে ট্রেনে উঠে পড়ে। অন্তু জানালার পাশে একটা সিটে বসে, কাকু অন্য সিটে ।
হুইসেল বাজিয়ে ট্রেন স্টেশন ছেড়ে যায় । এ সময় বাবার সঙ্গে অন্তুর অনেক স্মৃতি মনে পড়ে । কয়েক মাস আগে অন্তুর টাইফয়েড হয়েছিল। সে অবস্থায় বাবার উদ্বিগ্ন চেহারা এখনো তার চোখে ভাসে। কত রাত যে বাবা জেগে ছিলেন!
ঘণ্টা চারেক ট্রেন চলার পর একসময় অন্তুরা শহরে এসে পৌঁছে । কাকুর বাসায় সবাই অন্তুর আসার অপেক্ষায় ছিল, বাসায় পৌঁছে সে সবার কাছ থেকে উষ্ণ ভালোবাসা পায় ।
কাকুর বাসায় আসার পর অন্তু ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। পড়াশোনার পাশাপাশি অন্তুকে নিজের কাজ নিজেকেই করতে হয়। কিন্তু মাঝেমধ্যে যখন সে কোনো জিনিস গুছিয়ে রাখতে ভুলে যায়, কিংবা শরীরটা খারাপ হয়, তখন বাবার সেই রাতজাগা মুখের কথা বড্ড বেশি মনে পড়ে।
কাকুর বাসায় অন্তুর শহুরে জীবন শুরু হওয়ার পর বাবার সঙ্গে সময়ে সময়ে ফোনে যোগাযোগ হয় । সেদিন ফোনে বাবা জিজ্ঞেস করেন, ‘খেয়েছিস? ঠিকমতো ঘুমাচ্ছিস তো?’
অন্তু হেসে বলে, ‘জি বাবা, সব ঠিক আছে।’
কিন্তু সত্যি বলতে, সব ঠিক থাকলেও বাবার অভাবটা অন্তুর মনে থেকেই যায়। টেলিফোন রাখার পর নিজের অজান্তেই অন্তুর চোখের কোণ বেয়ে দু’ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

