মহাকাশের বিস্ময় ‘রেড স্প্রাইটস’

আশিকুর রহমান তালহা

মহাকাশের বিস্ময় ‘রেড স্প্রাইটস’

প্রতিনিয়ত ঘটে যাওয়া মহাকাশের মহাজাগতিক বিস্ময়কর ঘটনা দিন দিন বিজ্ঞানীদের গবেষণার দ্বার বিস্তৃত করে দিচ্ছে। তেমনই একটি বিষয় হলো মহাকাশের বজ্রপাত। আকাশে মেঘের ফাঁকে বিদ্যুৎ চমকাতে আমরা সবাই দেখি। কিন্তু সম্প্রতি সাধারণ বজ্রপাতের চেয়েও হাজার গুণ শক্তিশালী ও উজ্জ্বল লাল রঙের এক অদ্ভুত বজ্রপাতের মেঘের ওপর থেকে মহাকাশের দিকে ছুটে যাওয়ার মতো ঘটনা গবেষকেরা লক্ষ করেছেন। কল্পবিজ্ঞানের মতো মনে হলেও বাস্তবে এই অলৌকিক আলোক ঘটনার নাম ‘রেড স্প্রাইটস’ (Red Sprites)। সম্প্রতি বিশ্বজুড়ে মহাকাশচারী এবং বিজ্ঞান-আলোকচিত্রীদের ক্যামেরায় এই বিরল লাল বজ্রপাতের কিছু অবিশ্বাস্য মনোমুগ্ধকর দৃশ্য ধরা পড়েছে, যা নিয়ে বিজ্ঞানপাড়ায় এখন তুমুল আলোড়ন।

নিউজিল্যান্ডের আকাশে ‘নিখুঁত কাকতাল’

বিজ্ঞাপন

ঘটনার সূত্রপাত নিউজিল্যান্ডের ওমারামা ক্লে ক্লিফসে। রাতে আকাশগঙ্গা বা মিল্কিওয়ের ছবি তুলতে গিয়েছিলেন নিউজিল্যান্ডের টম রে এবং স্পেনের ড্যান জাফ্রা ও হোসে কান্তাব্রানা। ছবি তোলার সময় ঝড়-বৃষ্টি শুরু হতেই হোসে তার ক্যামেরার ফাইলে হঠাৎ আবিষ্কার করেন এক অলৌকিক দৃশ্য। সাধারণ বজ্রপাত যেখানে মাটির দিকে নেমে আসে, সেখানে মেঘের ওপর থেকে ঊর্ধ্বমুখী হয়ে মহাশূন্যের দিকে ছুটে গেছে গাঢ় লাল রঙের আলোর ফোয়ারা। মাত্র এক মিলিসেকেন্ডের (এক সেকেন্ডের হাজার ভাগের এক ভাগ) জন্য স্থায়ী হওয়ায় খালি চোখে এটি দেখা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু কাকতালীয়ভাবে টম রে ঠিক সেই মুহূর্তেই আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলেন এবং ইতিহাসের অন্যতম সেরা ‘রেড স্প্রাইটস’ ও ‘মিল্কিওয়ে’ একই ফ্রেমে বন্দি করার গৌরব অর্জন করেন।

রেড স্প্রাইটস

বিজ্ঞানীরা জানান, রেড স্প্রাইটস হলো বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তরে (আয়নোস্ফিয়ার) ঘটা এক ধরনের বৈদ্যুতিক শক্তির তীব্র বিস্ফোরণ। তীব্র বজ্রঝড়ের সময় মেঘের ধনাত্মক চার্জের কারণে এটি তৈরি হয়। এগুলো দেখতে কোনোটি স্তম্ভ, কোনোটি গাজর, আবার কোনোটি বিশালাকার জেলিফিশের মতো দেখায়। ১৯৮৯ সালে আমেরিকার মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা দুর্ঘটনাবশত প্রথমবার এর ছবি তুলতে পেরেছিলেন। বিজ্ঞানীদের কাছে এই লাল বজ্রপাত কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা বোঝা যায় আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন (ISS) থেকে পাঠানো ছবিতে। মেক্সিকো ও আমেরিকার ওপর দিয়ে প্রদক্ষিণ করার সময় মার্কিন নভোচারী নিকোল আইয়ার্স মহাকাশ থেকে পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে একটি দানবাকৃতির রেড স্প্রাইটের ছবি তোলেন। নাসার (NASA) শেয়ার করা সেই ছবিতে দেখা যায়, নিচের ঘনকালো মেঘের ওপর থেকে তীব্র লাল আলো যেন মহাশূন্যের দিকে ছুটে যাচ্ছে।

সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলে ‘জেজে’ নামক একজন অ্যাস্ট্রো-ফটোগ্রাফার টানা কয়েক ঘণ্টা ট্র্যাকিং করে আরো এক অবিশ্বাস্য ছবি উপহার দিয়েছেন। তার ছবিতে একই ফ্রেমে নিচে দেখা যাচ্ছে শত শত জোনাকি পোকার আলো আর ব্যাকগ্রাউন্ডে আকাশের উঁচুতে নাচছে জেলিফিশ আকৃতির বিশাল রেড স্প্রাইটস। অন্যদিকে ইতালির আকাশে রেড স্প্রাইটস এবং বৃত্তাকার ‘এলভেস’ (ELVES) আলোর ঝলকানিকে নাসা তাদের বিখ্যাত ‘অ্যাস্ট্রোনমি পিকচার অব দ্য ডে’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এই বিরল আলো শুধু দেখার সৌন্দর্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এর পেছনে রয়েছে বড় বৈজ্ঞানিক কারণ। নাসা বর্তমানে ‘Spritacular’ নামক একটি বিশেষ প্রজেক্ট চালু করেছে, যেখানে বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষ ও আলোকচিত্রীদের পাঠানো রেড স্প্রাইটসের ছবি ও ডেটা সংগ্রহ করা হচ্ছে। বিজ্ঞানীদের মতে, এই তীব্র লাল আলো পৃথিবীর ওজোন স্তরের ওপর প্রভাব ফেলে। এছাড়া উচ্চ বায়ুমণ্ডলের এই বৈদ্যুতিক পরিবর্তনগুলোর কারণে বিমান চলাচল ও সাবমেরিনের দীর্ঘ দূরত্বের রেডিও যোগাযোগ ব্যবস্থায় (Signal) এক ধরনের বিঘ্ন ঘটায়। এই যোগাযোগ প্রযুক্তিকে ভবিষ্যতে আরো নিরাপদ করতে এবং মহাকাশের আবহাওয়া সম্পর্কে বুঝতে এই নিখুঁত ছবিগুলো বিজ্ঞানীদের গবেষণার জন্য নতুন পথ দেখাচ্ছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন