জবাবদিহিতাহীন এবং আমলাতান্ত্রিক উপায়ে তৈরি নতুন বাজেট দেশের পরিবেশগত সংকট মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। মেগা প্রজেক্টের নামে পরিবেশ ধ্বংসের মহোৎসব বন্ধ করে প্রকৃত অর্থে সবুজ অর্থনীতি গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে।
শনিবার বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) - র উদ্যোগে নতুন অর্থবছরের ২০২৬-২৭ বাজেট বিশ্লেষণ শীর্ষ নিয়ে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা এই দাবী জানান। বাপার সভাপতি অধ্যাপক নুর মোহাম্মদ তালুকদার-এর সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবির-এর সঞ্চালনায় সংবাদ সম্মেলনে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন বাপার সদস্য ফারহান হোসেন জয়।
সম্মেলনে মূল বক্তব্যে ফারহান হোসেন জয় বলেন, “বাজেট থেকেই একটি সরকারের রাষ্ট্র বিনির্মাণের সদিচ্ছা প্রতিফলিত হয়। এই সরকারের আগের আমলেই আমরা দেখেছি পলিথিন ব্যান হতে। এই সরকারই আগেরবার বেবি ট্যাক্সির কালো ধোঁয়া থেকে ঢাকাকে মুক্ত করে সিএনজি মোটরে আনতে পেরেছিল। তাহলে এবারও নাগরিকদের ও পরিবেশের জন্য কাজ করবে এমন সমাধান আনতে পারবে এই আশা রাখি।”
তবে বরাদ্দের বৈপরীত্য নিয়ে সমালোচনা করে তিনি বলেন, “যেই রাজনৈতিক দল দলীয় ছত্রছায়ায় বালু উত্তোলনকে উৎসাহিত করে, সেই দলের সরকার-ই যখন নদীর ড্রেজিংয়ের হাজার কোটি টাকার বাজেট দেয়, জনগণের কাছে তা দ্বিমুখী আচরণ বলেই মনে হয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বরাদ্দের তুলনায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ প্রায় ২২ শতাংশ বৃদ্ধি পেলেও, কঠোর জবাবদিহিতা ছাড়া এই বরাদ্দ কেবলই শুভঙ্করের ফাঁকি।”
সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবির বলেন, “পরিবেশ ও জলবায়ু খাতে যে বরাদ্দ আসে তা যথাযথ খাতে বাস্তবায়ন করা হয় না, সেই খাতের টাকা অন্য খাতে ব্যবহার হয়। বাজেট সবসময় মুখরোচক হয়ে থাকে, কিন্তু পরে তা অপচয় ও লোপাট করা হয়। রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য ময়লাযুক্ত কয়লা আমদানি বন্ধের কোনো উদ্যোগ সরকারের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়নি।”
সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক নুর মোহাম্মদ তালুকদার বলেন, গতানুগতিক আমলানির্ভর বাজেট পরিকল্পনা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। বছরের শেষপ্রান্তে এসে বাজেটের টাকা খরচের যে মহাউৎসব আমরা বিগত দিনগুলোতে দেখেছি, তার ফলে টাকা খরচের ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও লুটপাটের ঘটনাই পরিলক্ষিত হয়েছে। বাজেটের বরাদ্দকৃত অর্থ দুর্নীতিমুক্ত ভাবে খরচ করতে হবে এবং পরিবেশের বাজেট করার আগে পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের সাথে পরামর্শ করার দাবি জানাই।
বাপা সহ-সভাপতি অধ্যাপক এম. ফিরোজ আহমেদ বলেন, “কার্বন ট্রেডিং কিয়োটো-প্রটোকলের মাধ্যমে বিক্রি করা সম্ভব হলেও বাংলাদেশ তা করতে ব্যর্থ। অথচ এই মার্কেটের শতকরা ৬০ ভাগ চায়না নিয়ে যাচ্ছে। সলিড ডিসপোজালগুলোকে পুরোপুরি কার্বন ট্রেডিংয়ের আওতায় আনা উচিত। ফ্লাইওভার তৈরির মাধ্যমে শহরে বায়ুদূষণ বৃদ্ধি পেয়েছে; আন্ডারগ্রাউন্ড যোগাযোগের ব্যবস্থা করা হলে এ বায়ু দূষণের মাত্রা অনেকাংশে কমানো সম্ভব হতো। পয়ঃবর্জ্য ও শিল্প দূষণ আজ সুপেয় পানির উৎস বাধাগ্রস্ত করছে। বাংলাদেশ এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এশিয়ার যেকোনো দেশের চেয়ে অনেক নিচে অবস্থান করছে।”
সহ-সভাপতি জাকির হোসেন বলেন, “বাজেটে ‘গ্রিন জব’ বলতে সরকার আসলে কী বুঝাতে চেয়েছেন, সেটি সরকারকে পরিষ্কার করতে হবে।”
যুগ্ম সম্পাদক হুমায়ুন কবির সুমন বলেন, “সরকার বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছে যা প্রশংসনীয়, কিন্তু কিছু কিছু উদ্যোগ সরকার নিয়েছে যা দেশের পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতি বয়ে আনবে। ঢাকা শহরসহ দেশের বড় বড় শহরগুলোতে যানজট নিরসনের জন্য যথেষ্ট বাজেট দেওয়া প্রয়োজন।”
বাপা জীবন সদস্য ড. এম এ আব্দুল ওহাব বলেন, “আমলানির্ভর বাজেট হলে জনগণ খুব বেশি সুফল পাবে না। বাজেট প্রস্তুত করার সময় সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত এবং এই বাজেটে এসডিজির বিষয়ে সরকারের স্পষ্ট বক্তব্য প্রদান করা আহ্বান জানাই।” পরিবেশকর্মী হাফিজুল ইসলাম নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য দেশের প্রতিটি স্কুল-কলেজের ছাদে সোলার প্যানেল বসানোর উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়ে বিবেচনা করার আহ্বান জানান।
সংবাদ সম্মেলনে পরিবেশ ও জলবায়ু রক্ষায় সরকারের কাছে ৫টি সুনির্দিষ্ট সুপারিশ তুলে ধরা হয়
আর্থিক কাঠামো ও বরাদ্দ বৃদ্ধি: জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষয়ক্ষতি প্রশমনে বর্তমান ০.৭৬ শতাংশ বরাদ্দ যথেষ্ট নয়। ২০৩০ সালের মধ্যে এটি অন্তত শতকরা ৩ এ উন্নীত করতে হবে। বেসরকারি খাত থেকে পরিবেশবান্ধব অর্থায়নের জন্য সরকারি গ্যারান্টিযুক্ত বন্ড চালু করে তহবিল গঠন করা যেতে পারে।
কার্বন ট্যাক্স ও দূষণ মূল্য: উচ্চ কার্বন নিঃসরণকারী শিল্প ও লাক্সারি গাড়ি আমদানিতে বিশেষ কার্বন কর আরোপ করে সেই অর্থ পরিবেশ সংরক্ষণে ব্যবহার করা। যেসকল শিল্প বর্জ্য শোধনাগার চালায় না, তাদের ওপর কঠোর জরিমানা আরোপ করে সেই তহবিলে কেন্দ্রীয় শোধনাগার নির্মাণ।বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সার্কুলার ইকোনমি: মহানগরগুলোর ল্যান্ডফিলে বর্জ্য পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকল্প গ্রহণ করে পরিবেশ রক্ষা ও জ্বালানি সাশ্রয় নিশ্চিত করা। প্লাস্টিক রিসাইক্লিং শিল্পে কর ছাড় দেওয়া এবং একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক সম্পূর্ণ নিষিদ্ধকরণ। প্রযুক্তি ও গবেষণা : বাংলাদেশে ক্লাইমেট টেকনোলজি স্টার্টআপদের জন্য বিশেষ ইনকিউবেশন সেন্টার ও সিড ফান্ড প্রদান করা। মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র কে শক্তিশালী করে নদীর গতিপথ ও বনভূমি দখল রিয়েল-টাইম ট্র্যাকিং করা। উপকূলীয় সুরক্ষা ও ম্যানগ্রোভ: সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় কৃত্রিম বাঁধের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নতুন ম্যানগ্রোভ বনায়ন সৃষ্টি করে সাইক্লোন থেকে রক্ষার প্রাকৃতিক দেয়াল তৈরি করা।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

