আলোচনা সভায় বক্তারা

রাষ্ট্রীয় কাঠামোর পরিবর্তন ছাড়া ফ্যাসিবাদ ঠেকানো সম্ভব নয়

স্টাফ রিপোর্টার

রাষ্ট্রীয় কাঠামোর পরিবর্তন ছাড়া ফ্যাসিবাদ ঠেকানো সম্ভব নয়

জুলাই বিপ্লবের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে রাজধানীতে এক আলোচনা সভায় বক্তারা বলেছেন, সংবিধানের শুধু সংশোধন নয়, বরং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর পরিবর্তন ছাড়া ফ্যাসিবাদের পুনরাবৃত্তি ঠেকানো সম্ভব নয়। ফ্যাসিস্ট হাসিনার দেশে ফিরে আসার রাজনৈতিক বাস্তবতা নেই বলেও মনে করেন তারা। সেই সঙ্গে শোষণ ও লুটপাট করে যারা পালিয়ে যায় দেশের সে সব শত্রুদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন তারা।

বৃহস্পতিবার দুপুরে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে ‘আত্মোপলব্ধি ও আত্মপর্যালোচনায় অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনের দীপ্ত শপথ’ শীর্ষক আলোচনা সভার আয়োজন করে আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি । এতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, শহীদ পরিবারের সদস‍্য ও জুলাই অভ‍্যুত্থানের সংগঠকরা বক্তব্য দেন।

বিজ্ঞাপন

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু। দলের যুগ্ম সাধারণ সাধারণ সম্পাদক মো. আলতাফ হোসাইনের সঞ্চালনায় এ সময় বক্তব্য দেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ড. আসাদুজ্জামান রিপন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান সমন্বয়কারী আখতার হোসেন, সংসদ সদস্য ও জুলাই শহীদ জাবির ইব্রাহিমের মা রোকেয়া বেগম, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সাবেক প্রেস সচিব শফিকুল আলম, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম, এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, শহীদ আরাফাত হোসেনের বড় ভাই হাসান আলী, এবি পার্টির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান প্রফেসর ডা. আব্দুল ওহাব মিনার, নারী উন্নয়নবিষয়ক সম্পাদক ফারাহ নাজ সাত্তার এবং সাংবাদিক সালাহউদ্দিন লাভলু প্রমুখ।

এ সময় আসাদুজ্জামান রিপন বলেন, শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ফিরে আসতে পারবে না। কারণ, তার বাংলাদেশে ফিরে আসার কোনো রাজনৈতিক বাস্তবতা নেই। পৃথিবীর কোনো দেশও তাকে গ্রহণ করতে আগ্রহী হয়নি।

তিনি বলেন, গণভবন দখলের মতো ঘটনা ইতিহাসে বিরল, যা জনগণের চূড়ান্ত অনাস্থার বহিঃপ্রকাশ। তাই বাংলাদেশের জনগণ শেখ হাসিনাকে আর কখনোই গ্রহণ করবে না। তিনি বলেন, রাষ্ট্র ও রাজনীতির পরিবর্তন কখনোই রাতারাতি আসে না; পরিবর্তন ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং বাংলাদেশও সেই পথেই এগোচ্ছে।

বিএনপির এই ভাইস চেয়ারম্যান বলেন, বিরোধী দলীয় নেতা নির্বাচনের কারচুপির অভিযোগ তুলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করার চেষ্টা করছেন। তিনি বলেন, রাজনৈতিক মতপার্থক্য ও বিরোধ থাকতেই পারে, কিন্তু জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা, বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে সব গণতান্ত্রিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, জুলাই জাতির জনআকাঙ্ক্ষার প্রতীক এবং অন্যায় ও স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিজয়ের নাম। গণভোটের মাধ্যমে জনগণ সংস্কারের পক্ষে রায় দিলেও সেই জনম্যান্ডেট উপেক্ষিত হচ্ছে। তিনি বলেন, সংস্কার করতেই হবে, আমাদের প্রতিশ্রুতির শপথ জুলাইকে মুছে দেওয়া যাবে না। মুছে ফেলার চেষ্টা যারা করবে তাদের বিরুদ্ধে আমাদের ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়াতে হবে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি চিরতরে বন্ধ করতে হবে উল্লেখ করে জামায়াতের এই নেতা বলেন, যারা খুন করেছে, হামলা করেছে, গুলি করেছে শুধু তাদের বিচার নয়; বরং যারা নির্দেশ দিয়েছে, মদদ দিয়েছে তাদেরও বিচার করতে হবে।

নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, জুলাই সনদের একটি সংস্কারও বাস্তবায়িত হয়নি। রাষ্ট্রীয় কাঠামোর পরিবর্তন ছাড়া ফ্যাসিবাদের পুনরাবৃত্তি ঠেকানো সম্ভব নয়। মানুষ এখনো জুলাইকে ভুলে যায়নি এবং প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম অব্যাহত রাখার মধ্য দিয়েই জুলাইয়ের অঙ্গীকার প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।

মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান শুধু একটি সরকার পতনের ঘটনা নয়; এটি রাষ্ট্র পুনর্গঠন, ন্যায়বিচার ও জনগণের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক অঙ্গীকার। দুই বছরের মাথায় জুলাইয়ের পরাজিত শক্তি পরিকল্পিতভাবে জুলাইকে হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করছে বলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

শহীদ জননী রোকেয়া বেগম এমপি বলেন, জুলাই আন্দোলনে শহীদদের আত্মত্যাগের উদ্দেশ্য ছিল ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা; তাই জুলাই সনদ বাস্তবায়নে আর টালবাহানা চলতে পারে না।

এনসিপির সদস‍্যসচিব আখতার হোসেন বলেন, কোটা সংস্কার আন্দোলন জনগণের সর্বস্তরের অংশগ্রহণে গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। জনগণের রায়কে উপেক্ষা করে রাষ্ট্র পরিচালনা করা যাবে না। তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রকাঠামো থেকে মুক্তির জন্য জনগণের দেওয়া সংস্কারের ম্যান্ডেট বাস্তবায়ন করতে হবে।

শফিকুল আলম বলেন, গত ৫০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের সবচেয়ে অহংকারের বিষয় জুলাই বিপ্লব। এ কারণে জুলাইয়ের শক্তিকেই আগামীর বাংলাদেশ নির্মাণ করতে হবে। তিনি বলেন, যারা গণহত্যা, গুম, আয়নাঘর ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে জড়িত ছিল, তাদের প্রত্যেকে চিহ্নিত করতে হবে। এ জন্য প্রয়োজনে সরকারকে একটি বিশেষ এজেন্সি গঠন এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোর মাধ্যমে তাদের চিহ্নিত করা। তিনি আরও বলেন, জুলাইয়ের শপথ হলোÑ কেউ যেন হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে পার না পায়।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বাতিল হওয়া গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার অধ্যাদেশগুলো পুনরায় আইনে পরিণত করা, জুলাই জাদুঘর খুলে দেওয়া এবং নতুন প্রজন্মের কাছে জুলাইয়ের ইতিহাস পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান।

এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী গণঅভ্যুত্থান। এটি কোনো রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে হয়নি; দেশের তরুণরাই এর নেতৃত্ব দিয়েছে। জুলাইয়ের অর্জনকে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিকভাবে সুরক্ষিত করতে হবে, যাতে আর কখনো ফ্যাসিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে।

আলোচনা সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার যোবায়ের আহমেদ ভূইয়া, অ্যাডভোকেট আবদুল্লাহ আল মামুন রানা,শ্রম বিষয়ক সম্পাদক শাহ আব্দুর রহমান, ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক সেলিম খান, দক্ষিণের আহ্বায়ক আব্দুল হালিম খোকন,সাংগঠনিক সম্পাদক গাজী নাসির, যুব পার্টির সদস্য সচিব হাদীউজ্জামান খোকন,কর্মসংস্থান বিষয়ক সম্পাদক সফিউল বাশার পাঠাগার ও গণশিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক আনোয়ার ফারুক এবং স্বেচ্ছাসেবক পার্টির আহ্বায়ক কেফায়েত হোসাইন তানভীর।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...