জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেছেন, ‘কোন রাষ্ট্রীয় কাজ সংসদ অধিবেশনের চাইতে বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়। সকল রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডের মধ্যে সংসদ অধিবেশন সবচাইতে বেশি গুরুত্ব পায়।’
মঙ্গলবার সংসদে পয়েন্ট অব অর্ডারে বিরোধীদলীয় নেতার উত্থাপিত মন্ত্রীদের অনুপস্থিতির প্রসঙ্গে তিনি এ মন্তব্য করেন।
স্পিকার বলেন, বাজেট অধিবেশনে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম নিয়ে সংসদ সদস্যরা বক্তব্য দেন। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের উপস্থিত থেকে সেসব বক্তব্য শোনা এবং সম্ভব হলে প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
চিফ হুইপকে উদ্দেশ্য করে স্পিকার বলেন, ‘আপনি মাননীয় মন্ত্রীদেরকে বলবেন তারা যেন সংসদে যথাসময় আসেন। সংসদ সদস্যের যেসব বক্তব্য তাদের মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কথা তারা বলেন, সেগুলোর ব্যাপারে তারা অন্তত শুনবেন এবং যদি সম্ভব হয় তার প্রতিকার করার চেষ্টা করবেন।’
পয়েন্ট অব অর্ডারে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, সংসদকে প্রাণবন্ত রাখতে শুরু থেকেই স্পিকার আহ্বান জানিয়ে আসছেন। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায়, যে মন্ত্রণালয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, সেই মন্ত্রণালয়ের কোনো প্রতিনিধি কক্ষে উপস্থিত থাকেন না। তিনি বলেন, সংসদ সদস্যদের কথাগুলো যাদের নিজের কানে সরাসরি শোনা দরকার, বিশেষ করে মন্ত্রীপরিষদের সম্মানিত সদস্যবৃন্দ, অনেক সময় দেখেছি যে মন্ত্রণালয় সম্পর্কে কথা বলছি, সেই মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কেউ এখানে উপস্থিত নেই। এ ধরনের অনুপস্থিতি সংসদের পরিবেশের সঙ্গে যায় কি না, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।
জবাবে স্পিকার বলেন, বিষয়টি আগের দিনও আলোচনায় এসেছিল। তখন সরকার-দলীয় চিফ হুইপ জানিয়েছিলেন, মন্ত্রীরা বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকেন। তবে সংসদ অধিবেশনের গুরুত্বের কথা পুনর্ব্যক্ত করে তিনি মন্ত্রীদের নিয়মিত উপস্থিত থাকার আহ্বান জানান।
উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রী সংসদ নেতা তারেক রহমান বর্তমানে রাষ্ট্রীয় সফরে চীনে রয়েছেন।এর আগে তিনি মালয়েশিয়ায় ছিলেন সেখানে তার সফর সঙ্গী হিসেবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় প্রতিমন্ত্রী এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাত এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ ইসলাম অমিত ছিলেন।
এদিকে সংসদের বৈঠক বিকাল ৩টায় শুরু হওয়ার কথা থাকলেও সোমবারের মত মঙ্গলবারও কয়েক মিনিট পরে শুরু হয়। বৈঠকের শুরুতে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন না। সোয়া ৩টার দিকে দেখা যায় সরকারি দলের প্রথমসারিতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী, সমাজকল্যাণমন্ত্রী সহ ৬ জন সংসদ সদস্য উপস্থিত ছিলেন। মন্ত্রীদের মধ্যে আইনমন্ত্রী, মুক্তিযুদ্ধ, পানি সম্পদ মন্ত্রী, কৃষি মন্ত্রী, বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রী, জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী, প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী, পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী উপস্থিত ছিলেন সংসদ কক্ষে। পরে যোগ দেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। সাড়ে তিনটা পর্যন্ত অধিবেশনে যোগ দেননি অর্থমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রী। এ সময় বিরোধী দলের প্রথম সারিতে বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।
সংসদ কক্ষে ‘ছোট ছোট বৈঠক’ নিয়েও অসন্তোষ
বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান সংসদ চলাকালে সদস্যদের ছোট ছোট দলে আলোচনা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, অনেক সময় সংসদে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা চলার মধ্যেই কয়েকজন সদস্য আলাদা করে বৈঠকের মতো আলোচনা করেন, যা সংসদের শৃঙ্খলা ও পরিবেশের জন্য ভালো নয়।
এ বিষয়ে স্পিকার বলেন, তিনিও মাঝে মাঝে সংসদ কক্ষে ছোট ছোট গ্রুপে কথাবার্তা চলতে দেখেন। হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আপনারা সংসদের মধ্যে গ্রুপ আলোচনা করার চেষ্টা করবেন না। এবং যত সহজ সম্ভব নিজের আসনে বসে সংসদ কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করার, অন্তত ভালোভাবে শোনার চেষ্টা করবেন।’ সংসদের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সদস্যদের সহযোগিতাও কামনা করেন তিনি।
সংসদ সদস্যদের টেলিফোন ডাইরেক্টরি এখনও প্রকাশ হয়নি
এর আগে বিশেষ অধিকার প্রশ্নের বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাতে গিয়ে স্পিকার বলেন, চলতি অধিবেশন পর্যন্ত মোট সাতটি বিশেষ অধিকার প্রশ্নের নোটিস পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ছয়টির বিষয়ে ইতোমধ্যে সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে। সপ্তম নোটিসটি দেন রাজশাহী-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. মুজিবুর রহমান। তিনি অভিযোগ করেন, সংসদ সদস্য, মন্ত্রী এবং জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগাযোগের তথ্য-সম্বলিত ডাইরেক্টরি এখনও প্রকাশ হয়নি।
নোটিশে তিনি বলেন, সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব পালনের জন্য এ ধরনের ডাইরেক্টরি অত্যন্ত জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ। জবাবে স্পিকার জানান, জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের ‘টেলিফোন সহায়িকা-২০২৬’ প্রকাশের কাজ চলছে। তবে কয়েকজন সংসদ সদস্য এখনও তাদের ব্যক্তিগত তথ্য সচিবালয়ে জমা দেননি।
তিনি বলেন, সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোও শিগগির গঠন করা হবে। কমিটি গঠনের পর ডাইরেক্টরি প্রকাশ করা হবে। তবে বিষয়টি সংসদ সদস্যদের বিশেষ অধিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত নয় বলে গ্রহণ করা হয়নি। স্পিকার বলেন, ‘যেসব মাননীয় সদস্য এখনো তথ্য দেননি, অনুগ্রহ করে দ্রুত প্রয়োজনীয় তথ্য সংসদ সচিবালয়ে জমা দিবেন। তার পরপরই এই ডাইরেক্টরিটি প্রকাশিত হবে।’
মন্ত্রণালয়গুলোরও ডাইরেক্টরি চাইলেন চিফ হুইপ
এ সময় সরকার-দলীয় চিফ হুইপ বলেন, সংসদ সদস্যদের জন্য শুধু সংসদের ডাইরেক্টরি নয়, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অধীনস্থ দপ্তরের যোগাযোগ তথ্যও প্রয়োজন। তিনি বলেন, অনেক সময় কোনো বিষয়ে যোগাযোগের প্রয়োজন হলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য না থাকায় সংসদ সদস্যরা সমস্যায় পড়েন।
চিফ হুইপের প্রস্তাবের পর জনপ্রশাসনমন্ত্রী জানান, গুরুত্বপূর্ণ টেলিফোন নম্বরসম্বলিত একটি ডাইরেক্টরি সংসদ সদস্য ও সংসদ সচিবালয়ের জন্য প্রস্তুত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

