স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতিতে বড় ধরনের ঘাটতিতে রয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালা ও আচরণ বিধিমালা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। একই সঙ্গে ভোট আয়োজনের জন্য প্রয়োজনীয় নির্বাচনি সামগ্রীরও উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে। তবে নির্বাচন কবে এবং কোন স্তর থেকে শুরু হবে, সে বিষয়ে সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না থাকায় এসব সামগ্রী কেনার ক্ষেত্রেও দ্বিধায় রয়েছে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি।
ইসির নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে ৮৩ লাখ ৪৬ হাজার ৭২৮টি নির্বাচনি সামগ্রী প্রয়োজন হবে। বর্তমানে মজুত রয়েছে ৫৯ লাখ দুই হাজার। ফলে ঘাটতি রয়েছে ২৪ লাখ ৪৫ হাজারের মতো সামগ্রী। চূড়ান্ত নিরীক্ষায় এ সংখ্যা কিছুটা কমবেশি হতে পারে।
এদিকে দীর্ঘদিন ধরে ইসির দাবি ছিল, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য কেনা সামগ্রী স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও ব্যবহার করার। ফলে নতুন করে কেনাকাটার প্রয়োজন হবে না। তবে সম্প্রতি নির্বাচনসংক্রান্ত চেকলিস্ট প্রস্তুতের সময় বিভিন্ন স্তরের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সামগ্রীর ঘাটতির বিষয়টি সামনে আসে। এরপরই কমিশন বিষয়টি নিয়ে নতুন করে পর্যালোচনা শুরু করে।
ইসিসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, নির্বাচনের সঠিক সময়সূচি নিশ্চিত না হওয়ায় এখন সরঞ্জাম কেনা ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ কেনাকাটার পর নির্বাচন বিলম্বিত হলে সরঞ্জামের গুণগত মান নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বিশেষ করে অমোচনীয় কালির কলমের মতো সরঞ্জাম বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়, যা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে প্রায় তিন মাস সময় লাগে।
এদিকে সরকার চলতি বছরের সেপ্টেম্বর বা অক্টোবর থেকে পর্যায়ক্রমে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরুর পরিকল্পনার ইঙ্গিত দিয়েছে। আগামী মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, আগামী এক বছরের মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা, জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশনের নির্বাচন পর্যায়ক্রমে সম্পন্ন করা হবে। বাজেটপ্রাপ্তিসাপেক্ষ প্রথমে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দিয়ে এ প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে।
তবে সরকার ও ইসি সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তুতির ঘাটতির কারণে চলতি বছরে সীমিত পরিসরে পরীক্ষামূলকভাবে ইউনিয়ন পরিষদ অথবা পৌরসভা—এ দুই ধরনের নির্বাচনের যেকোনো একটি আয়োজন করা হতে পারে।
ইসির তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সরকার নির্বাচন পরিচালনায় মোট ৯ ধরনের নির্বাচনি সামগ্রী প্রয়োজন হয়। এগুলো হলো—অমোচনীয় কালির কলম, স্ট্যাম্প প্যাড, ব্রাস সিল, অফিসিয়াল সিল, মার্কিং সিল, গানি ব্যাগ, হেসিয়ান ব্যাগ, স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সের লক ও লাল গালা। সবচেয়ে বেশি ঘাটতি রয়েছে স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সের লকে। এটা প্রয়োজন ৪১ লাখ ৬১ হাজারটি, মজুত আছে ৩৭ লাখ সাড়ে ২৩ হাজারটি, ঘাটতি চার লাখ ৩৭ হাজার ৫০০টি। এছাড়া মার্কিং সিলে ঘাটতি চার লাখ ৬৩ হাজার, অফিসিয়াল সিলে দুই লাখ ৩০ হাজারটি এবং স্ট্যাম্প প্যাডে ৭৯ হাজারটি। অমোচনীয় কালির কলমের প্রয়োজন সাত লাখ ৫৬ হাজার, মধ্যে মজুত রয়েছে সাত লাখ ২১ হাজার। ঘাটতি ৩৪ হাজার ৮১৩টি। এ কলম বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয় এবং দরপত্র প্রক্রিয়াসহ সংগ্রহে প্রায় তিন মাস সময় লাগে। এছাড়া ব্রাস সিলে ঘাটতি ২৫ হাজার ১৪৬টি, হেসিয়ান ব্যাগে ৩১ হাজার ১৯০টি, লাল গালায় ২৫ হাজার ৪৬টি এবং গানি ব্যাগে প্রায় ১১ হাজারটি ঘাটতি রয়েছে।
ইসি সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, নির্বাচনের প্রস্তুতিতে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ বিধিমালা চূড়ান্ত না হওয়া। সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে ভোট করতে হলে আগস্টেই তফসিল ঘোষণা করতে হবে। কিন্তু স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আচরণ বিধিমালার সংশোধনী এখনো চূড়ান্ত হয়নি। কমিশনের প্রণীত খসড়া রাজনৈতিক দল ও অংশীজনদের মতামতের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত মতামত নেওয়ার পর সেগুলো সমন্বয় করে সরকারের অনুমোদনের মাধ্যমে চূড়ান্ত করতে আরো সময় লাগবে। একই অবস্থা নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালার ক্ষেত্রেও।
জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সরঞ্জাম ও প্রক্রিয়ার কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে। জাতীয় নির্বাচন একদিনে ও একযোগে অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে বিপুলসংখ্যক সরঞ্জামের প্রয়োজন হয়। বিপরীতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন হয় ধাপে ধাপে, তাই সরঞ্জামের চাহিদা ও ব্যবহারের ধরনে ভিন্নতা থাকে। তবে সব মিলিয়ে প্রস্তুতির ঘাটতি নির্বাচন কমিশনের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

