আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধ ও মুসলিম উম্মার ঐক্যের ভবিষ্যৎ

এলাহী নেওয়াজ খান

ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধ ও মুসলিম  উম্মার ঐক্যের ভবিষ্যৎ

আমরা ক্রমাগত মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের কথা বলে এলেও প্রতিনিয়ত ঘটছে সব উল্টো ঘটনা। অর্থাৎ মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে ঐক্যের বদলে ঘটে চলছে রক্তাক্ত সংঘাত। বিশেষ করে পবিত্র রমজান মাসে দুই মুসলিম দেশ পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যকার যুদ্ধ মুসলিম ঐক্যের ধারণাকে যেন কটাক্ষ করছে। বলা যায়, বিংশ শতাব্দীর শেষের দিক থেকে শুরু করে এই একবিংশ শতাব্দীর বর্তমান সময় পর্যন্ত মুসলিম দেশগুলোর মধ্যকার সংঘাত মুসলিম উম্মাহর ঐক্যকে কেবল দুর্বলই করেনি, বরং ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

এখন দেখা যাচ্ছে, বিগত ৫০ বছরে যত যুদ্ধ হয়েছে, তার সবটাই সংঘটিত হয়েছে মুসলিম দেশগুলোয়। কখনো তা হয়েছে এক মুসলিম দেশের বিরুদ্ধে অন্য মুসলিম দেশের, আবার ঘটেছে মুসলিম দেশের ওপর অমুসলিম পরাশক্তির আক্রমণের ঘটনা। উভয় ক্ষেত্রেই ধ্বংস ও হত্যার শিকার হয়েছে মুসলমানরা। এক্ষেত্রে আমরা স্মরণ করতে চাই ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কথা, যেদিন পাক মুসলিম সামরিক বাহিনী রাতের আঁধারে বাংলাদেশের মুসলিম ভাইদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে যে গণহত্যা চালিয়েছিল। যেভাবেই বিচার-বিশ্লেষণ করা হোক না কেন, সে ঘটনা সহজে ভুলে যাওয়ার নয়। তারপর ১০ মাস ধরে চলা আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধকালে পাকবাহিনী হাজার হাজার নির্দোষ ও নিরস্ত্র মুসলিম ভাইকে হত্যা করেছে। সেই একই পাকবাহিনী এখন আবার আরেক মুসলিম দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত হয়েছে। অথচ ইসলামে যেখানে এক মুসলিম কর্তৃক অন্য মুসলিমকে কষ্ট দেওয়ারও অনুমতি নেই, সেখানে হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি তো দূরের কথা। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘ঈমানদারগণ পরস্পরের ভাই।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত-১০)

বিজ্ঞাপন

গত ৫০ বছরে এমন সব দৃষ্টান্ত আমাদের সামনে আছে, যা মুসলিম উম্মাহর বেদনাদায়ক পরিণতির কথাই আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়। আমরা দেখেছি, কীভাবে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলো ইসরাইলের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে নিজ নিজ দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি বানাতে সাহায্য করেছে। অথচ ইসরাইল বছরের পর বছর ধরে নারী, শিশুসহ হাজার হাজার ফিলিস্তিনিকে হত্যা করে আসছে। আমাদের স্মৃতিতে এখনো অম্লান হয়ে আছে ইরান-ইরাক যুদ্ধের ভয়াবহ দিনগুলোর কথা। সেটা ছিল ১৯৮০ সালের ২০ সেপ্টেম্বর; আকস্মিক ইরাকের সশস্ত্র বাহিনী ইরান আক্রমণ করে বসে, ফলে দুই মুসলিম দেশের মধ্যে সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। সীমান্ত বিরোধের অজুহাত তুলে ইরাকই প্রথম হামলা চালায়। দীর্ঘ আট বছর ধরে এই যুদ্ধ চলেছিল। ১৯৮৮ সালের ২০ আগস্ট যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে এই যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে। এতে উভয় দেশের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াও নিহত হয়েছিল ১০ লক্ষাধিক মানুষ, যারা সবাই ছিলেন মুসলমান।

আবার এই যুদ্ধ শেষ হওয়ার মাত্র দুই বছরের মাথায় ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের নির্দেশে ইরাকের সেনাবাহিনী সীমান্তবর্তী মুসলিম দেশ কুয়েত দখল করে নেয়। কোনো উসকানি ছাড়া ১৯৯০ সালের ২ আগস্ট কুয়েত দখলের ঘটনা পরবর্তী সময়ে কেবল সাদ্দাম হোসেনের পতনের পথকেই সুগম করেনি, বরং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হাতকে শক্তিশালী করেছিল। ক্ষমতার মদমত্ততায় আত্মবিমোহিত সাদ্দাম হোসেনের কুয়েত দখলের ঘটনায় প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধ সংঘটিত হয়। অর্থাৎ জাতিসংঘ কুয়েত ত্যাগ করার জন্য সাদ্দাম হোসেনকে সময় বেঁধে দিলে তা মানতে তিনি অস্বীকৃতি জানালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে জাতিসংঘের সম্মিলিত বাহিনী হস্তক্ষেপ করে এবং ইরাকি বাহিনী কুয়েত থেকে চলে যেতে বাধ্য হয়। এটাই ছিল প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধ। দ্বিতীয় উপসাগরীয় যুদ্ধ সংঘটিত হয় ২০০৩ সালের ১৯ মার্চ। গণবিধ্বংসী অস্ত্র ধ্বংস করার অজুহাতে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে একটি যৌথ বাহিনী ইরাকে সর্বাত্মক সামরিক আগ্রাসন শুরু করে। এই যৌথ বাহিনীতে আরো ছিল যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও পোল্যান্ড। এ যুদ্ধ স্থায়ী হয়েছিল ৪২ দিন। অর্থাৎ ২০০৩ সালের ১ মে সাদ্দাম সরকারের পতন ঘটে এবং তার বিশাল সামরিক বাহিনী সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়ে। এই যুদ্ধে মূলত ধ্বংস হয়েছিল ইরাকের বহিস্থ স্থাপনা এবং নিহত হয়েছিলেন অসংখ্য ইরাকি মানুষ। সাদ্দাম হোসেনের এইসব হঠকারী সিদ্ধান্তের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তি ইরাক দখল করার সুযোগ লাভ করে, যা কার্যত ইসরাইলের হাতকেই শক্তিশালী করেছিল।

এসব ছাড়াও ইয়েমেনের হুথি সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে সৌদি সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যকার সংঘর্ষ দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে, যা আরেক ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধ। এ যুদ্ধে মারা যাচ্ছে উভয় পক্ষের মুসলিম জনগণই। তাই এসব যুদ্ধ দেখতে দেখতে এই রমজান মাসে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যকার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের জন্য দুঃসংবাদ ছাড়া আর কিছুই নয়। লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, এই দুই মুসলিম দেশের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরপরই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথভাবে ইরানে আক্রমণ করেছে। দেখে-শুনে মনে হচ্ছে, ইরানের দুই মুসলিম প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মধ্যকার এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের জন্য একটি সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে।

এখানে উল্লেখ করতে হয়, দুই সপ্তাহ আগে আফগানিস্তানের তালেবান নেতৃবৃন্দ বলেছিলেন, ইরান আক্রান্ত হলে ইরানের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তারা যুদ্ধ করবে। আর এই ঘোষণার পরই পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যকার যুদ্ধের নেপথ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ইন্ধন আছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কারণ যুদ্ধ শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে সমর্থন দিয়েছে। হয়তো আগামীতে এই প্রশ্নের আরো স্পষ্ট উত্তর পাওয়া যাবে। যেমন আমরা এখন আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় দেখতে পাচ্ছি, ইসরাইল ও সৌদি আরবের চাপে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে আক্রমণ চালিয়েছে।

যদিও এখানে উল্লেখ করা দরকার যে, দীর্ঘদিন ধরে সীমান্ত ইস্যু নিয়ে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে বিরোধ চলে আসছিল। মাঝেমধ্যেই উভয় দেশ সংঘাতে জড়িয়ে পড়ত। বিশেষ করে টিটিপি ও বালুচ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার জন্য আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের বিরুদ্ধে অনেক দিন ধরে অভিযোগ তুলে আসছিল পাকিস্তান। কিন্তু তালেবান সরকার তা কখনো গ্রাহ্য করেনি। বরং উল্টো তারা ব্রিটিশ নির্ধারিত সীমারেখা মানে না বলে প্রায়ই হুংকার দিয়ে থাকে এবং পাকিস্তানের ভেতরকার পশতু ভাষাভাষী অঞ্চলকে আফগানিস্তানের অংশ বলে দাবি করে আসছে।

যাহোক, মহান আল্লাহ তায়ালা যখন বলেছেন, ‘ঈমানদাররা পরস্পরের ভাই’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত-১০), তখন দুই মুসলিম দেশের মধ্যকার যুদ্ধ ও রক্তপাত সম্পূর্ণ অবৈধ; বলা যায় হারাম। হাদিস শরিফে আছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘একজন মুসলমান অন্য মুসলমানের ভাই। সে তার ওপর কোনো রূপ অত্যাচার করতে পারে না এবং অন্য কারো করুণার ওপর ছেড়েও দিতে পারে না এবং যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের কোনো প্রয়োজন মেটাতে ব্যস্ত থাকে, আল্লাহ পাক তার প্রয়োজন মিটিয়ে দেন। এবং যে ব্যক্তি তার মুসলমান ভাইয়ের সংকট মোচনে সাহায্য করে, মহান আল্লাহ তাকে তার সংকটসমূহ বিচার দিবসে মোচন করবেন। এবং যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানের দোষ গোপন করবে, আল্লাহ পাক বিচার দিবসে তার দোষ গোপন করবেন।’ (বুখারি, হাদিস-২৪৪২)

রাসুল (সা.) আরো বলেছেন, ‘পরিপূর্ণ ঈমানদার না হয়ে তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না; আর পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা না থাকলে তোমরা পরিপূর্ণ ঈমানদার হতে পারবে না।’ (মুসলিম, হাদিস-৫৪)

আরেকটি হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, ‘পাপ হিসেবে এটাই যথেষ্ট যে, একজন মুসলমান তার ভাইকে উপেক্ষার চোখে দেখে। একজন মুসলমানের জীবন, সম্পদ ও সম্মান অপর মুসলমানের জন্য সম্পূর্ণরূপে অলঙ্ঘনীয় এবং পবিত্র।’ (মুসলিম, হাদিস-২৫৬৪)

তাই এই প্রেক্ষাপটে এটাও বলার দরকার, শুধু দুই মুসলিম দেশের মধ্যকার যুদ্ধ নয়, বরং মুসলিম দেশগুলোর শাসকরা যখন অন্যায়ভাবে জনগণের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন চালানোর পাশাপাশি ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে নির্মম হত্যাকাণ্ড পরিচালনা করে, তাও আল্লাহর বিধান অনুযায়ী হারাম, যেটা বাংলাদেশে জুলাই বিপ্লবের সময় আমরা দেখেছি। এমনকি ব্যক্তিগত পর্যায়েও কোনো মুসলমান অপর কোনো মুসলমানকে অবজ্ঞা বা অসম্মান করতে পারে না। এটাই কোরআন ও হাদিসের বিধান। কিন্তু ব্যক্তি, সমষ্টি ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এই বিধান অমান্য করার ফলেই মুসলিম উম্মাহর ঐক্য আজ আপ্তবাক্য হিসেবেই রয়ে গেছে। এখন মুসলিম উম্মাহর ঐক্য খুব জরুরি।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন