আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

টিআইবির রিপোর্ট এবং আমাদের নতুন পথচলা

মিনার রশীদ

টিআইবির রিপোর্ট এবং আমাদের নতুন পথচলা
মিনার রশীদ

অনেক দিন আগে ‘সখী তুমি কার’ নামে একটি সিনেমা মুক্তি পেয়েছিল! সিনেমাটি দেখিনি, তবে শিরোনাম দেখে কাহিনিটি অনুমান করতে কষ্ট হয়নি! বাংলাদেশে টিআইবি, সিপিডি ঘরানার কিছু প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যাদের দেখলেই হতাশ নায়কের মতো মনে প্রশ্ন জাগে, সখী তুমি কার?

কোনো সন্দেহ নেই—টিআইবি, সিপিডি কিংবা আলো-স্টার নামের প্রতিষ্ঠানগুলো দৃশ্যমান এক ধরনের নিরপেক্ষতা প্রদর্শন করে। তাদের পেশাগত দক্ষতাও ঈর্ষণীয়। তাদের সবসময় একটা অধিকতর পছন্দের দল বা গোষ্ঠী থাকে। তবে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বোধবিশ্বাস থেকে অধিকতর দূরে অবস্থান করা দল বা গোষ্ঠীটিই এদের নৈতিক সমর্থন ও তাদের লজিস্টিক সহযোগিতাটি পেয়ে থাকে!

বিজ্ঞাপন

তাদের নিরপেক্ষ সাজার কৌশলটিও খুবই ইন্টারেস্টিং! আওয়ামী লীগের অলিগার্করা ১৬ বছরে ২৩৫ বিলিয়ন ডলার পাচার করলেও তেমন উচ্চবাচ্য করেনি টিআইবি। কিছু কম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে কুসুম কুসুম সমালোচনা করেছে। এতে সরকারের মন্ত্রীরা টিআইবিকে গালাগাল করেছেন। এটাকেই নিজেদের নিরপেক্ষতার সার্টিফিকেট হিসেবে সোনার অক্ষরে বাঁধিয়ে রেখেছে।

সোনার অক্ষরে বাঁধাই করা এমনই একটি সার্টিফিকেট হলো—টিআইবির ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য মাহফুজ আনামের নিজের কাগজে একটি সম্পাদকীয় কলাম। ২০২৪ সালের ২৬ জানুয়ারিতে প্রকাশিত সেই লেখার শিরোনাম ছিল, ‘আজীবনের খলনায়ক টিআইবির প্রতিবেদন থেকে শিক্ষা নিন এবং তাদের প্রাপ্য সম্মান দিন!’

লেখাটিতে সব সরকার টিআইবিকে কেমন করে খলনায়ক হিসেবে চিহ্নিত করেছে—তা নিয়ে নিজের পরম সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন! মাহফুজ আনাম, টিআইবির ইফতেখারুজ্জামান—ওনারা হলেন আমাদের এলিট সেটেলমেন্টে একজন আরেকজনের কাজিন। এই কিসিমেই একজন আরেকজনের ইমেজ প্রতিষ্ঠা করেন, একজন আরেকজনের পাশে দাঁড়ান!

যে সরকারের আমলে ১৬ বছরে ২৩৫ বিলিয়ন ডলার দেশ থেকে পাচার হয়েছে—সে সরকারকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন না বানিয়ে এ রকম একটু কুসুম কুসুম সমালোচনা করেই তৃপ্তির ঢেকুর তুলছেন মাহফুজ আনাম! অথচ ২০০১ থেকে শুরু করে পরপর তিনবার দুর্নীতিতে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করে কৌশলে শুধু জোট সরকারকেই বিব্রত করেনি—তথাকথিত এক-এগারোর পটভূমিও এর মাধ্যমে সৃষ্টি করা হয়েছিল! কাকে ধরবে, কাকে ছাড়বে কিংবা কখন ধরবে, কখন ছাড়বে সেটিও একটি বিশেষ চেতনার ক্যালকুলেটর থেকে গণনা করে বের করা হয়।

কাজেই নির্বাচন নিয়ে সেই টিআইবির রিপোর্টের কথা শুনে আমার ছয়টি ইন্দ্রিয়ই সজাগ হয়ে উঠল। দেখতে পেলাম সেই রিপোর্টটিতে যেমন বিএনপির জন্য কিছু তোহফা (Gift) রয়েছে, তেমনি জামায়াতের জন্যও রয়েছে। এই দুটি তোহফা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হলেও আওয়ামী লীগের জন্য নিবেদিত আসল তোহফাটি অনেকেরই নজরে পড়েনি। পাঠক, চলুন এবার একটু নজর বুলাই।

সদ্য অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন ‘গ্রহণযোগ্য মাত্রায় সুষ্ঠু, প্রতিযোগিতামূলক’ হয়েছে বলে পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। পাশাপাশি, নির্বাচন ‘অংশগ্রহণমূলক ও অন্তর্ভুক্তমূলক’ হয়েছে বলেও জানিয়েছে সংস্থাটি। ওপরের এই দুটি লাইন সংগত কারণেই বিএনপি খুব পছন্দ করেছে!

নির্বাচনে কোনো ইঞ্জিনিয়ারিং হয়নি বলে ঘোষণা করলেও নিচের তোহফাটি জামায়াতের জন্য রেখেছে। সাংবাদিক মোস্তফা ফিরোজসহ অনেকেই এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন! মোস্তফা ফিরোজ তার এপিসোডটির ফটোকার্ডে শিরোনাম দিয়েছেন, ভোটের আগেই ব্যালটে সিল ১৪ শতাংশ! ইউনূস সরকারের সেরা নির্বাচনের গুমর ফাঁস/টিআইবির তোলপাড় করা অনিয়মের না না তথ্য। সংগত কারণেই তা ভাইরাল হয়ে পড়েছে!

নির্বাচনের দিন সংঘটিত অনিয়ম (টিআইবির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রক্রিয়া ও হলফনামাভিত্তিক পর্যবেক্ষণ, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬)।

—ভোটারদের জোর করে নির্দিষ্ট মার্কায় ভোট দিতে বাধ্য করা ৩৫ দশমিক ৭ শতাংশ

—জাল ভোট দেওয়া ২১ দশমিক ৪ শতাংশ

—বিধিলঙ্ঘন/আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গ/অনিয়ম প্রতিরোধে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা ২১ দশমিক ৪ শতাংশ

—ভোটগ্রহণের আগেই ব্যালটে সিল মারা ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ

—বুথ দখল করা ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ-প্রতিপক্ষের পোলিং এজেন্টকে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে না দেওয়া ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ

—আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক ভোটারদের অসহযোগিতা ১০ দশমিক ৭ শতাংশ

—রিটার্নিং অফিসারসহ নির্বাচনে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের পক্ষপাতমূলক কার্যক্রম ১০ দশমিক ৭ শতাংশ

—তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ ও যোগাযোগে প্রতিবন্ধকতা (ফোরজি এবং থ্রিজি নেটওয়ার্ক বন্ধ এবং সাংবাদিকদের মোটরযান চলাচলে বাধা) ৭ দশমিক ১ শতাংশ

—ভোটকেন্দ্রে নির্বাচনের তথ্য সংগ্রহে সাংবাদিকদের বাধা প্রদান ৭ দশমিক ১ শতাংশ

—আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে পক্ষপাতমূলক কার্যক্রমের অভিযোগ ৭ দশমিক ১ শতাংশ

—ভোট গণনায় জালিয়াতির অভিযোগ ৭ দশমিক ১ শতাংশ

—ব্যালট পেপার শেষ হয়ে যাওয়া ৩ দশমিক ৬ শতাংশ

—নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের পর্যবেক্ষণে বাধা প্রদান ৩ দশমিক ৬ শতাংশ

—অন্যান্য ৩ দশমিক ৬ শতাংশ

জাল ভোট-সংক্রান্ত তথ্য বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে টিআইবি। গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সংস্থাটি জানায়, তাদের মাঠপর্যায়ের গবেষণায় দৈবচয়ন পদ্ধতিতে নির্বাচিত ৭০টি আসনের মধ্যে ২১ দশমিক ৪ শতাংশ আসনে এক বা একাধিক জাল ভোট দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। কিন্তু এই তথ্যকে পুরো নির্বাচনে ২১ দশমিক ৪ শতাংশ জাল ভোট পড়েছে—এভাবে ব্যাখ্যা করা সম্পূর্ণ ভুল, ভিত্তিহীন ও বিভ্রান্তিকর।

এই প্রসঙ্গে একটি গল্প মনে পড়ে। এক মা তার ছেলেকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোর শাশুড়ি তোর জন্য যে মুরগিটা জবাই করেছিল, সেটা কত বড় ছিল?’ ছেলে ডান হাত মাথার ওপর তুলে বলল, ‘মা, এত্তো বড়!’ মা অবাক হয়ে বললেন, ‘ওরে বাবা! হাতির মতো নাকি?’ তখন ছেলে লজ্জা পেয়ে বলল, ‘মা, বাম হাতটা নিচে রাখতে ভুলে গেছি!’ এরপর দুই হাতের ব্যবধানে সে আসল আকারটা দেখাল।

টিআইবির উপস্থাপনাতেও এমন কিছু ‘ক্যালকুলেশনের খেলা’ আছে, যেখানে নমুনাভিত্তিক তথ্যকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করা হয় যে তা দিয়ে প্রাথমিক উদ্দেশ্য সাধনের পর পরে বাম হাত দিয়ে মুরগির সাইজ ঠিক করা যায়। বিএনপিকে পরপর তিনবার দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন বানানোর কারসাজিটি করা হয়েছিল। এসব নিয়ে যখন আওয়ামী-বলয় বিএনপিকে খোঁটা দিয়েছে, তখন টিআইবি মুখ খুলেনি। কিন্তু সেই জোট সরকারের এক সঙ্গী একই খোঁটা অন্য সঙ্গীকে দেওয়া শুরু করল, তখনই দেখা গেল—এ বিষয়ে টিআইবির পক্ষ থেকে একটা ব্যাখ্যা দেওয়া হলো। কলিকালের যুধিষ্ঠির দাবিদার মাহফুজ-ইফতেখারদের টিআইবি এবার স্বতঃস্ফূর্তভাবে জানাল যে, প্রথম বছরটি (২০০১ সালের শেষ দিকে ঘোষিত রিপোর্টটি) মূলত আগের আওয়ামী সরকারের আমলনামা ছিল! অথচ এই বুদ্ধিবৃত্তিক ইতরামোর কারণে যে এক-এগারো আসল এবং তার হাত ধরে আওয়ামী জাহেলিয়াত নামক অন্ধকার যুগে জাতি নিপতিত হলো—তজ্জন্যে এই মাহফুজ ও ইফতেখাররা একবারের তরেও জাতির কাছে ক্ষমা চাইল না! বিএনপি এবং জামায়াত দুটি দলই এখন টিআইবির কাছ থেকে সামান্য তোহফা পেয়ে অতীতের সবকিছু ভুলে যাচ্ছে!

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রক্রিয়া ও প্রার্থীদের হলফনামাভিত্তিক পর্যবেক্ষণ তুলে ধরতে সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর ধানমন্ডিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন। তিনি মন্তব্য করেন, Awami League-কে বাইরে রেখে এই নির্বাচন কতটা ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ হয়েছে—তা নিয়ে আরো প্রশ্ন উঠতে পারে।

এ মন্তব্যই ছিল মূল রাজনৈতিক বার্তা এবং এটিই আওয়ামী লীগের জন্য টিআইবির আদি ও আসল তোহফা! এই প্রশ্ন উত্থাপনের মাধ্যমে নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক সমীকরণে আওয়ামী লীগকে প্রাসঙ্গিক ও অপরিহার্য শক্তি হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠার একটি বার্তা দেওয়া হয়েছে।

দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক শক্তি—বিএনপি ও জামায়াতের পারস্পরিক বৈরিতার প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে এমন মন্তব্য রাজনৈতিক বিতর্ককে নতুন মাত্রা দিতে পারে। নমুনাভিত্তিক গবেষণার তথ্যকে এমনভাবে সামনে আনা হয়েছে, যাতে নির্বাচনের সামগ্রিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয় এবং রাজনৈতিক বিতর্ককে নির্দিষ্ট দিকে পরিচালিত করা যায়। কারণ দুটি দলের মধ্যে এমন দূরত্ব সৃষ্টি হয়ে গেছে যে তারা একসঙ্গে এক কণ্ঠে ইফতেখারুজ্জামানের এই বুদ্ধিবৃত্তিক অসততার (আওয়ামী লীগের জন্য টিআইবির তোহফা) বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতে পারবে না। কারণ দুটি দলই মনে করছে—টিআইবির রিপোর্ট তাদের জন্য সহায়ক হচ্ছে।

দুটি দলের তৃণমূলে নির্বাচন-পূর্ববর্তী ফাইটিং মোডে থাকলেও দল দুটির টপ নেতৃত্ব খুবই আশাব্যঞ্জক কিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন! জামায়াত আমির ডাক্তার শফিকুর রহমান নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ তুললেও ফল মেনে দায়িত্বশীল বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন! একই সঙ্গে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান ডা. শফিক এবং নাহিদের বাসায় গিয়ে সাক্ষাৎ করে এসেছেন! বাংলাদেশে এই প্রথম কোনো বিজয়ী দলের প্রধান নির্বাচনের পরপরই বিজিত দলের প্রধানের বাড়ি গিয়ে দেখা করলেন! ডা. শফিকুর রহমান এবং নাহিদের দোরগোড়ায় তারেক রহমানকে দেখে মনে হলো, A small step for a man but a giant leap for our political culture.

জামায়াত ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের কথা ঘোষণা করেছে এবং তাকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন সাধুবাদ জানিয়েছেন! গত ১২ ফেব্রুয়ারির বিজয়ের পর দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের সামনে দেওয়া বক্তব্যে তারেক রহমান বলেন, ‘জাতীয় ঐক্যই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি’—এ বিজয় কোনো ব্যক্তি বা একক দলের নয়, বরং জনগণের সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষা ও ত্যাগের ফসল। তিনি গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, আইনের শাসন ও জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলার অঙ্গীকার করেন এবং নির্বাচন-পূর্ব বিভেদ ভুলে সংলাপ ও সহযোগিতার রাজনীতি এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানান।

ত্রয়োদশ সংসদের যাত্রা শুরুটি পুরোপুরি মসৃণ না হলেও রাজনৈতিক অচলাবস্থার দিকে গড়ায়নি—এমনটাই পর্যবেক্ষকদের অভিমত। তবে শুরুতেই সংবিধান সংস্কার কমিটির সদস্যদের শপথগ্রহণ ইস্যুতে বড় দু-তিনটি রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে মতপার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

বিএনপির অবস্থান

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল সংবিধান সংস্কার কমিটির সদস্য হিসেবে তাৎক্ষণিক শপথগ্রহণ থেকে বিরত থাকে। দলটির বক্তব্য অনুযায়ী, এখানে কিছু ‘টেকনিক্যাল’ বা প্রক্রিয়াগত জটিলতা রয়েছে—বিশেষ করে কমিটির এখতিয়ার, কার্যপরিধি ও সাংবিধানিক বৈধতার প্রশ্নে। বিএনপি সরাসরি সংস্কারের বিরোধিতা করেনি; বরং তারা জানিয়েছে, প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক সংশোধন বা স্পষ্টতা আনার পর তারা শপথগ্রহণ করবে। অর্থাৎ দলটি নীতিগতভাবে সংস্কার প্রক্রিয়ার বাইরে থাকতে চায় না, তবে প্রক্রিয়াগত নিশ্চয়তা চায়।

জামায়াত ও এনসিপির অবস্থান

অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং এনসিপি সংবিধান সংস্কার কমিটির সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করে। তারা মনে করে, সংস্কার প্রক্রিয়া বিলম্বিত না করে ভেতরে থেকে কাজ করাই যুক্তিযুক্ত। তবে বিএনপির এই অবস্থানের প্রতিবাদ জানাতে তারা প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিপরিষদের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান বর্জন করে। তাদের ভাষ্য—এর মাধ্যমে সরকারি দলটি ২৪-এর শহীদ ও আহতদের প্রতি অবমাননা এবং অবজ্ঞা দেখিয়েছে।

এখন মূল প্রশ্ন হলো—বিএনপি যে ‘সাংবিধানিক পরিবর্তন’ বা স্পষ্টতার কথা বলছে, তা কত দ্রুত ও কীভাবে সমাধান হবে। যদি আলোচনার মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য কাঠামো তৈরি হয়, তাহলে এই প্রাথমিক মতভেদ রাজনৈতিক সমঝোতায় রূপ নিতে পারে। অন্যথায়, সংসদের শুরুতেই যে সূক্ষ্ম বিভাজন তৈরি হয়েছে, তা ভবিষ্যতে বড় রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিতে পারে।

সার্বিকভাবে বলা যায়, ত্রয়োদশ সংসদের শুরুতে যে মতভিন্নতা দেখা দিয়েছে, তা এখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি। তবে এটি ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমীকরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করছে।

২০০৮ সালের নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করত—এ নিয়ে তেমন সন্দেহ ছিল না। কিন্তু পরে যে ভূমিধস বিজয়ের চিত্র দেখা যায়, তা শুধু জনসমর্থনের ফল ছিল না; কিছু প্রভাবশালী অপশক্তির ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর মাধ্যমে ফলকে অতিরঞ্জিত করা হয়েছিল। সেই অস্বাভাবিক বিজয় শেষ পর্যন্ত দলটির জন্য কল্যাণকর হয়নি; বরং দীর্ঘ মেয়াদে ধ্বংসের কারণ হয়েছে।

এখন ২০২৬ সালের নির্বাচনকে অনেকে সে সময়ের সঙ্গে তুলনা করছেন। এ বিষয়ে আমরা চূড়ান্ত মন্তব্য করতে চাচ্ছি না। তবে একটি সতর্কতা বার্তা দিয়ে রাখছি। সদ্য ক্ষমতাসীন দলটি যদি কৃতজ্ঞতা বা স্বল্পমেয়াদি সুবিধার আশায় একই ধরনের শক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে এবং তাদের পরামর্শনির্ভর পথে হাঁটে, তবে ফল ভিন্ন হওয়ার সম্ভাবনা কম। টেকসই রাজনৈতিক শক্তি গড়ে ওঠে জনগণের আস্থা, প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও নৈতিক দৃঢ়তার ওপর—ক্ষণেকের বিজয়ের ওপর নয়। ইতিহাসের শিক্ষা হলো, অস্বাভাবিক উত্থান প্রায়ই অস্বাভাবিক পতনের ঝুঁকি বহন করে।

তবে ইতিহাসের শিক্ষা হলো, ইতিহাস থেকে আমরা কেউ শিক্ষা নেই না!

লেখক : কলামিস্ট

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...