সিরিয়ার নয়া সরকারের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সফল আলোচনার পর দেশটির ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নীতির পরিবর্তন আসে। সিরিয়ার ওপর অনেক আগে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত বেশ কিছু নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেন ট্রাম্প। এর মাধ্যমে সিরিয়ায় কুর্দি বিদ্রোহীদের নেতৃত্বাধীন সংগঠন সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেসের (এসডিএফ) সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের সহযোগিতার সম্পর্কের অবনতি ঘটে। মার্কিন নীতির এই পরিবর্তনে এসডিএফ বর্তমানে কার্যত সুরক্ষাহীন হয়ে পড়েছে এবং আমেরিকান পৃষ্ঠপোষকতায় সিরিয়ার কুর্দি অধ্যুষিত অঞ্চলে স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন ভেঙে গেছে।
কুর্দিদের সহযোগিতা ও সুরক্ষা দেওয়ার এতদিনের মার্কিন নীতি থেকে বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সরে আসায় এটা ধরে নেওয়া যায়, সিরিয়ায় দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটতে যাচ্ছে। সিরিয়ার অভ্যন্তরীণ ভূরাজনীতির এই বাঁকবদলে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ও সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
সিরিয়ার সরকারি বাহিনী ২০ জানুয়ারি দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে এসডিএফের নিয়ন্ত্রণ থেকে বিশাল অঞ্চল দখল করার পর দামেস্কের সঙ্গে তাদের যুদ্ধবিরতি নবায়ন করার ঘোষণা দিতে বাধ্য হয় সংগঠনটি। এই চুক্তি অনুযায়ী দামেস্ক সিরিয়ার পূর্বাঞ্চলের অধিকাংশ এলাকার নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাবে এবং এসডিএফ যোদ্ধাদের সিরিয়ার সেনাবাহিনীতে একীভূত করা হবে। তবে, এই চুক্তি কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
কিন্তু এটা বলা যায়, এসডিএফের প্রতি যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন প্রত্যাহার উত্তর-পূর্ব সিরিয়ায় কুর্দিদের গত এক যুগেরও বেশি সময়ের স্বায়ত্তশাসনের অবসান ঘটারই ইঙ্গিত দিচ্ছে। সরকারি বাহিনী বিশাল এলাকা দখলের ফলে ২০১২ সালে গৃহযুদ্ধ শুরুর পর এই প্রথম দেশের সবচেয়ে বেশি অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করছে বর্তমান প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল শারার সরকার। ট্রাম্প প্রশাসনের সহযোগিতার কারণেই সরকারের পক্ষে এই সাফল্য অর্জন সম্ভব হয়েছে।
২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় কুর্দি বিদ্রোহীদের নেতৃত্বে সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস (এসডিএফ) গঠিত হওয়ার পর থেকে সংগঠনটি ওয়াশিংটনকে তাদের রক্ষক হিসেবে দেখে আসছে। কারণ কুর্দিরা ইসলামিক স্টেটের (আইএস) বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান অংশীদার হিসেবে কাজ করেছে এতদিন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এখন নীরবেই পক্ষ পরিবর্তন করেছে। গত নভেম্বরে হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট শারার বৈঠকের পর আইএসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দেয় সিরিয়া। ফলে এসডিএফের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্ক বজায় রাখা অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। দুপক্ষের সম্পর্কে এই ভাঙনের পর এসডিএফের বিরুদ্ধে দামেস্কের নেওয়া সামরিক পদক্ষেপের প্রতি ট্রাম্প প্রশাসনের অনুমোদন আছে বলে মনে করা হচ্ছে।
তুরস্কে মার্কিন রাষ্ট্রদূত এবং ট্রাম্পের সিরিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত টম ব্যারাক গত ২০ জানুয়ারি বলেছেন, ‘স্থলযুদ্ধে আইএসবিরোধী প্রাথমিক বাহিনী হিসেবে এসডিএফের মূল উদ্দেশ্য কার্যত শেষ হয়ে গেছে।’ ওয়াশিংটনের ভূমিকার এই পরিবর্তন এসডিএফ কমান্ডার মাজলুম আবদি এবং অনেক কুর্দিই ক্ষুব্ধ। কারণ, টম ব্যারাক এর আগে বলেছিলেন, আগের চুক্তি অনুযায়ী কুর্দি অধ্যুষিত অঞ্চল পরিচালনার জন্য কুর্দিদের অনুমতি দেবে যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের সুরক্ষার জন্য এসডিএফের কিছু ইউনিট সেখানে টিকে থাকবে।
কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন এখন তার অবস্থান পরিবর্তন করায় অবাক হওয়ার কিছু নেই। কারণ, ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে দুবার এসডিএফের প্রতি মার্কিন সমর্থন প্রত্যাহারের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে তিনি আইএসকে পরাজিত করার দাবি পর সিরিয়ার পূর্বাঞ্চল থেকে ২০০০-এর বেশি মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, এসডিএফকে তার ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দেবেন তিনি। তবে তার তৎকালীন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন এ ব্যাপারে তাকে নিরুৎসাহিত করেন।
২০১৯ সালের অক্টোবরে ট্রাম্প আবার এসডিএফের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য উদ্যোগ নেন। এ সময় তুরস্ক যখন তাল আবিয়াদের কাছে অবস্থিত এসডিএফ ঘাঁটিগুলোয় আক্রমণ করে, তখন তিনি সিরিয়া থেকে প্রায় এক হাজার মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের নির্দেশ দেন। মার্কিন বাহিনীর সুরক্ষা না পেয়ে এসডিএফ সে সময় তুর্কি বাহিনীর হামলা প্রতিরোধে ব্যর্থ ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়।
তবে, এসডিএফকে ত্যাগ না করতে ট্রাম্পকে রাজি করানোর চেষ্টা করে পেন্টাগন। কারণ, তাদের আশঙ্কা ছিল, এর ফলে রাশিয়া এবং তার মিত্র বাশার আল-আসাদের অবস্থান শক্তিশালী হবে। এমনকি এসডিএফ নেতা মাজলুম আবদি সে সময় তুরস্কের বিরুদ্ধে বিকল্প রক্ষাকর্তা হিসেবে বাশার আল আসাদের সঙ্গে জোট গঠনের আলোচনাও করেছিলেন।
কিন্তু এসডিএফ সম্পর্কে ট্রাম্পের মনোভাব কখনো বদলায়নি। তিনি সিরিয়া থেকে অবশিষ্ট মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের জন্য পেন্টাগনের ওপর চাপ অব্যাহত রাখেন। সে সময় তিনি বলেছিলেন, ‘সিরিয়ায় দীর্ঘদিন সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখতে যুক্তরাষ্ট্র আগ্রহী নয়।’ বর্তমান পরিস্থিতি ২০১৮ এবং ২০১৯ সালের পরিস্থিতি থেকে আলাদা। এখন দেশে তার কর্তৃত্ব আরো দৃঢ় হয়েছে। ফলে তার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা বা পেন্টাগন কেউই আগের মতো ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে আগ্রহী নয়।
বাশার আল-আসাদের পতন হলেও রাশিয়া এখনো সিরিয়ায় তার সামরিক ঘাঁটিগুলো ধরে রেখেছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও দেশটিতে রাশিয়ার প্রভাব কার্যকরভাবেই হ্রাস পেয়েছে। এর অর্থ হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র এসডিএফকে ত্যাগ করলে সেখানে মার্কিন প্রতিদ্বন্দ্বীদের লাভ হবে—এমন সম্ভাবনা কম। ফলে এসডিএফকে ত্যাগ করা নিয়ে ট্রাম্পের কোনো উদ্বেগ বা দ্বিধাদ্বন্দ্ব নেই।
সিরিয়ার কুর্দিদের বিক্রি করে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নতুন কোনো বিষয় নয়। এর আগে ইরাকি কুর্দিস্তানের অনানুষ্ঠানিক স্বাধীনতার ওপর ২০১৭ সালে অনুষ্ঠিত গণভোটের পর ইরাক সরকার কিরকুক দখল করে। সে সময় ট্রাম্প কুর্দিদের কোনো সহায়তা দেননি।
১৯৯১ সালে যখন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশের উৎসাহে ইরাকি কুর্দি এবং শিয়ারা সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে, তখন ওয়াশিংটন তাদের প্রত্যাশিত সামরিক সহায়তা দিতে ব্যর্থ হয়। এর ফলে সাদ্দাম সরকার অনেক বিদ্রোহীকে দমনে সক্ষম হয়। যদিও পরে পশ্চিমা বিশ্ব সুরক্ষা দেওয়ায় উত্তর ইরাকে কুর্দি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল প্রতিষ্ঠিত হয়।
১৯৭৫ সালেও যুক্তরাষ্ট্র ইরাক সরকারের বিরুদ্ধে ইরানের তৎকালীন শাসক রেজা শাহ পাহলভির সমর্থনপুষ্ট কুর্দিদের বিদ্রোহে গোপনে সমর্থন দিয়েছিল। কিন্তু ইরান ও ইরাক কুর্দি ইস্যুতে একটি চুক্তি স্বাক্ষরের পর যুক্তরাষ্ট্র কুর্দিদের পরিত্যাগ করে, যা তাদের ওপর দমন-পীড়নের পথ প্রশস্ত করে। সিরিয়ায় কুর্দিদের এবারের সর্বশেষ এই পরাজয়ের ধুলো যখন ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাবে, তখন এসডিএফ নেতা মাজলুম আবদিসহ কুর্দি নেতারা এটাই ভাববেন যে, আমেরিকানদের ওপর আস্থা রাখা তাদের কৌশলগত ভুল ছিল। সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন আফগানিস্তান থেকে দ্রুত সেনা প্রত্যাহার করায় সেখানেও মার্কিন মিত্রদের পরাজয় ত্বরান্বিত করেছিল। এখন এসডিএফকে যুক্তরাষ্ট্র পরিত্যাগের পর অনেকেই বলতে পারেন, ট্রাম্পের ওপর নির্ভর করা তাদের বোকামি ছিল। আর এ জন্যই ইসরাইলি হামলায় নিহত হিজবুল্লাহপ্রধান হাসান নাসরুল্লাহ একবার বলেছিলেন, ‘আপনি জানেন না যুক্তরাষ্ট্রে কখন এবং কার কাছে আপনাকে বিক্রি করে দেবে।’
কুর্দি-সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলো ঘিরে থাকা চারটি দেশ—তুরস্ক, সিরিয়া, ইরাক এবং ইরান কুর্দিদের স্বাধীনতা লাভের বিরোধী এবং একই সঙ্গে তারা এই জনগোষ্ঠীর স্বায়ত্তশাসন লাভের লড়াইকেও দমন করছে। আর এ কারণেই কুর্দি জাতীয়তাবাদীরা যুক্তরাষ্ট্র এবং মাঝেমধ্যে ইসরাইলের মতো বহিরাগত পৃষ্ঠপোষকদের সন্ধান করতে বাধ্য হয়েছে।
সিরিয়ার কুর্দিরা যুক্তরাষ্ট্রের মতো বহিরাগত শক্তির ওপর নির্ভরশীল হতে বাধ্য হয়েছিল, যা তাদের বিক্রি হওয়ার সম্ভাবনাও বাড়িয়ে দিয়েছিল। এর অবশ্য কারণও আছে। সেখানে কুর্দিদের দুর্বল কৌশলগত অবস্থানের কারণে তাদের কাছে অন্য বিকল্প খুব কমই আছে। আর এ কারণেই সিরিয়ার কুর্দিদের স্বায়ত্তশাসনের দীর্ঘ লড়াইটি এই মুহূর্তে শেষ হতে পারে। তবে ভবিষ্যতে সিরিয়া বা অন্য কোথাও আরেকটি অধ্যায় হয়তো শুরু হবে, যদি যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য কোনো বহিরাগতের বৃহত্তর স্বার্থের জন্য কুর্দি বিদ্রোহীদের প্রয়োজন হয়। তখন হয়তো তারা কুর্দিদের সমর্থন দেবে এবং তারপর আবার তাদের পরিত্যাগ করবে।
মিডল ইস্ট আই থেকে ভাষান্তর : মোতালেব জামালী
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


এলপিজি সেক্টরে অস্থিরতা দীর্ঘদিনের পরিকল্পনায়