‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান’-এর সফলতার চূড়ান্ত মুহূর্তে ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যান। দেশকে ফ্যাসিবাদমুক্ত করার এই সফলতাকে আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতা ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’ এবং ৫ আগস্ট দিনটিকে ‘৩৬ জুলাই’ হিসেবে অভিহিত করেন। শেখ হাসিনা তার প্রায় ১৬ বছরের শাসনামলে নিজ দলের পোষা ও সরকারি বিভিন্ন বাহিনীর অনুগত ঘাতকদের আন্দোলনকারী নিরস্ত্র জনগণের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়েছিলেন। এই ঘাতকরা নির্বিচারে যে হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে তার সব দায় শেখ হাসিনার। এজন্য তার অবশ্যই কঠোর বিচার হতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে এদেশের আর কোনো শাসক এমন খুনি হয়ে ওঠার সাহস না পান। বিচারের আওতায় আনতে হবে তার ঘাতক বাহিনীর সব সদস্যকেও। কেউই যেন বিন্দুমাত্র ছাড় না পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ফ্যাসিস্ট দল হিসেবে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে। দলটি আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণও করতে পারবে না, কারণ নির্বাচন কমিশন আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত করেছে। আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করে পলাতক শেখ হাসিনা ও তার ঘাতক দোসরদের বিচারের প্রক্রিয়া যখন শুরু হয়েছে, তখন দেশের কোনো কোনো রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের রাজনীতি করার অধিকার আছে বলে বক্তব্য দিয়ে অনাহুত বিতর্ক তৈরির চেষ্টা করছে। প্রশ্ন হচ্ছে, ফ্যাসিস্ট দল হিসেবে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশে রাজনীতি করার অধিকার রাখে কি না? বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর গত ৫৪ বছরে দলটি দেশে যা করেছে, তারই মধ্যে এই প্রশ্নের যথার্থ উত্তর রয়েছে। সেদিকে নজর দিতে হবে ফ্যাসিবাদী দল আওয়ামী লীগের প্রতি সহানুভূতিশীল রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তিদের।
বেগম খালেদা জিয়াকে তার ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার ন্যক্কারজনক দিনটির কথা মনে করুন। বেগম খালেদা জিয়াকে বাড়ি থেকে বিতাড়িত করেই ক্ষান্ত হননি ফ্যাসিস্ট হাসিনা, রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সহায়তায় বাড়িটি নিমিষেই মাটির সঙ্গে মিশিয়েও দেওয়া হয়েছিল। তারপর টেলিভিশনে প্রচার করা হলো খালেদা জিয়ার ঘরে নাকি পাওয়া গেছে ‘মদের বোতল’। রাষ্ট্রীয় প্রচারযন্ত্র ব্যবহার করে তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে এমন অপমানজনক নাটক হয়েছিল সেই দিনগুলোয়। বেগম খালেদা জিয়াকে নিয়ে এমন কোনো অশ্লীল বাক্য নেই, যা শেখ হাসিনা বলেননি। এমনকি বেগম খালেদা জিয়াকে পদ্মায় ‘টুপ’ করে ফেলে দিলে কেমন হয়, সে কথাও উচ্চারণ করে নিজেকেই নিজে আনন্দ দিয়েছিলেন শেখ হাসিনা।
একজন ৭৫ বছর বয়সি রাজনৈতিক নেত্রী, যিনি তখনো একটি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাকে নিয়ে প্রকাশ্যে এমন বক্তব্য দিতে শেখ হাসিনার মুখে একটুও আটকায়নি। গুরুতর অসুস্থ বেগম জিয়াকে সুচিকিৎসার জন্য বিদেশে নিতে চাইলেও সেই সুযোগ দেওয়া হয়নি। অকালে মারা গেল তার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো। বড় ছেলে তারেক রহমান প্রায় ১৭ বছর ধরে লন্ডনে নির্বাসিত জীবনযাপন করছেন। পরিবার থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে দেশে একাকী থাকা বেগম খালেদা জিয়ার ওপর দিয়ে দীর্ঘ ১৬ বছরে কী ঝড় বয়ে গেছে, তা কল্পনারও অতীত। অসীম ধৈর্যের প্রতীক হয়ে সবকিছু নীরবেই সহ্য করেছেন খালেদা জিয়া।
শেখ হাসিনা যদি আরো পাঁচ-দশ বছর ক্ষমতায় থাকতেন, তাহলে বেগম জিয়ার ভাগ্যে কী ঘটত তা ভাবলে গা শিউরে উঠতে হয়। ন্যায়বিচার না পেয়ে দুনিয়া থেকে চিরবিদায় ঘটত তার। তারেক রহমানকেই কি আমরা দেশে ফিরে আসার অনুকূল পরিবেশে পেতাম—এখন তিনি দেশে আসবেন আদালতের রায়ে। তারেক রহমানকে উদ্দেশ করে শেখ হাসিনা প্রায়ই বলতেন, ‘সাহস থাকলে দেশে আয়।’ তার এসব কথার জবাব দেওয়ার মতো সাহস কারো ছিল না; কারণ ভয়ের সংস্কৃতি, যেটা শেখ হাসিনার নিজেরই সৃষ্ট। তিনি বলতেন, ‘আমি একবার যারে ধরি, তারে ছাড়ি না।’
জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের অর্থ নিয়ে মিথ্যা মামলার প্যাঁচে ফেলে বেগম জিয়াকে বিদেশে চিকিৎসা নিতে না দেওয়া, ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি থেকে তাকে উচ্ছেদ করা, তার বিরুদ্ধে অপমানজনক রাজনৈতিক বক্তব্য প্রদান, তারেক রহমানের নির্বাসন—এসবের কোনোকিছু নিয়েই কখনো কথা বলেননি আওয়ামী লীগ থেকে আসা বিএনপি নেতা ফজলুর রহমান। ৩২ নম্বরের বাড়ির প্রেমে গদগদ রুমিন ফারহানার মুখেও কোনো প্রতিবাদ ছিল না। এখনো এসব বিষয়ে তাদের মুখে কোনো কথা শোনা যায় না, যা সচেতন জনগোষ্ঠীকে পীড়া দেয়।
বেগম খালেদা জিয়ার ওপর ফ্যাসিস্ট সরকারের এসব অত্যাচারের কথা বিএনপির নেতারা এত দ্রুত ভুলে যান কীভাবে, তা চিন্তা করে বিস্মিত হই। ভারত ও আওয়ামী লীগের পক্ষে বিএনপির নেতাদের সাফাই গাওয়া এদেশের সচেতন মানুষ কখনোই মেনে নেবে না। বিএনপিকে এটা অনুধাবন করতে হবে। দলটিকে অবশ্যই ভারতপ্রেম বাদ দিতে হবে। বিএনপি যদি সেটা না বোঝে তাহলে দলটিকে ভবিষ্যতে এর জন্য খেসারত দিতে হবে। জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের কথা ভুলে গিয়ে পতিত শেখ হাসিনা ও তার দল আওয়ামী লীগের পক্ষে দাঁড়ানো হবে বিএনপির জন্য আত্মঘাতী পদক্ষেপ। আওয়ামী লীগের ‘পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন’ লোকজনকে বিএনপিতে নেওয়া যাবে বলে দলটির যেসব নেতা প্রকাশ্যেই বক্তব্য দেন, তাদের মাথা থেকেও আওয়ামী ভূত তাড়াতে হবে।
২০২৪ সালের জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত ৩৬ দিন দেশে দানবীয় পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল ফ্যাসিস্ট সরকার। এই ৩৬ দিনে আন্দোলনরত ১ হাজার ৬০০ জন শহীদ হয়েছেন। গুলিতে অন্ধ হয়েছেন ৪০০ জন, আহত হয়েছেন ২৫ হাজার মানুষ এবং আজীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে গেছেন অনেক মানুষ। এর আগে ২০০৯ সালে পিলখানায় ৫৭ চৌকস সেনা অফিসারসহ ৭৪ জনকে হত্যা করা হয়। শাপলা চত্বরে হেফাজত নেতাকর্মীদের হত্যা করা হয়েছে।
এ ছাড়া আয়নাঘর, নারায়ণগঞ্জের সাত খুন, দরজি দোকানি বিশ্বজিৎকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা, সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনী হত্যা, বুয়েটের মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদকে হত্যা, মসজিদে ঢুকে মানুষ হত্যাসহ অসংখ্য গুম-খুন, দেশকে ভারতের অঙ্গরাজ্যে পরিণত করা এবং ২৫০ বিলিয়ন ডলার পাচার করার মতো ঘটনাগুলো শেখ হাসিনার ফ্যাসিস্ট শাসনামলেই ঘটেছে। এমন কোনো ঘৃণ্য কাজ নেই, যা শেখ হাসিনা করেননি। এসব ঘটনা যদি এদেশের কোনো রাজনৈতিক দল ভুলে যেতে চায়, তাহলে সেসব দলকে জনগণ প্রত্যাখ্যান করবে।
বাংলাদেশের পচন ধরেছে জন্মের পর থেকেই এবং এটা ঘটেছে ইসলামি ও জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক শক্তির ভুলের কারণেই। যেমন আওয়ামী লীগকে প্রথম পুনর্বাসন করেছিলেন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। বিনিময়ে তিনি শহীদ হলেন। দ্বিতীয়বার আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন করে জাতীয় পার্টি, বিনিময়ে দলটি আজ বিলুপ্তির পথে। তৃতীয়বার আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন করে জামায়াতে ইসলামী। বিনিময়ে দলটির শীর্ষ নেতাদের ফাঁসিতে ঝোলায় আওয়ামী লীগ। চতুর্থবার ওয়ান-ইলেভেনের সময় আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন করেছিল সেনাবাহিনী। বিনিময়ে ৫৭ চৌকস সেনা অফিসারকে জীবন দিতে হয়েছে আওয়ামী লীগের ষড়যন্ত্রের কারণে।
আওয়ামী লীগকে কাছে টানার মতো ভুলের খেসারত যে কত ভয়ানক হতে পারে বাংলাদেশের গত ৫৩ বছরে ইতিহাস তার প্রমাণ। এ বিষয়টি সব রাজনৈতিক দলকে উপলব্ধি করতে হবে। তাই বলব, পঞ্চমবার কেউ আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের দুঃসাহস দেখাবেন না।
লেখক : রাজনীতি বিশ্লেষক
Harunrashidar@gmail.com
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

