সাবঅল্টার্ন তত্ত্ব এবং হাফডান মানুষ

কাকন রেজা

সাবঅল্টার্ন তত্ত্ব এবং হাফডান মানুষ

সাবঅল্টার্ন নিয়ে আলাপ হচ্ছে। এটি মূলত গ্রামশির তত্ত্ব। নিম্নবর্গ বলতে এদেশের কিছু বুদ্ধিজীবী শুধু অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা মানুকেই বোঝেন এবং বোঝাচ্ছেন। অর্থাৎ যারা দরিদ্র এবং শোষিত এবং যাদের কণ্ঠস্বর নেই। কিন্তু সাংস্কৃতিকভাবে যারা শোষণের শিকার, তারা কি সাবঅল্টার্ন নয়? গ্রামশি তো অর্থনীতি ও সংস্কৃতি দুটোকেই সামনে এনেছেন।

ধরুন আমাদের মতন যারা। যারা বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী। যারা মনে করেন বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্রবাদী চিন্তার কোনো বিকল্প নেই। তারাও শোষণের শিকার। তাদের তো রীতিমতো অচ্ছুত বাণিয়ে রাখা হয়েছে। সব সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে, রাজনৈতিক পরিক্রমায় তাদের পেছনে ফেলে রাখা হয়েছে আজ পর্যন্ত। তাদের ভোকাল রেইজ করতে দেওয়া হচ্ছে না। বিগত ফ্যাসিস্ট রেজিমেও তাদের গলা চেপে ধরে রাখা হয়েছিল। ফ্যাসিজম-পরবর্তী সময়েও তাদের গলা খুলে কথা বলতে দেওয়া হচ্ছে না। যেন এই চিন্তার মানুষ গ্রামীণ, নিম্নবর্গের। আর শহুরে তথা আরবান মানুষই উচ্চবর্গের। শম্পা রেজার মতন পরজীবী চিন্তা যারা করেন, ন্যাকা-ন্যাকা ভঙ্গিতে শান্তিনিকেতনী বলেন, বোলপুরের আলাপ করেন, তারাই উচ্চবর্গ। তারা কথা বলার অধিকার রাখেন এবং মাথায় ঘিলু না থাকলেও। অন্যরা সব সাবঅল্টার্ন।

বিজ্ঞাপন

হাদির কথাই বলি। হাদি যখন নজরুলকে নিয়ে কথা বলা শুরু করলেন। ঈদমিছিল শুরু করলেন। শুরু করলেন গরিষ্ঠ মানুষের সংস্কৃতির চর্চা; তখন কী হলো, হাদিকে মরতে হলো। অর্থাৎ হাদি যখন কথা বলতে শুরু করলেন, তখন তার গলাকে রুদ্ধ করার ব্যবস্থা করা হলো। এখন হাদির কথা বললে, কেউ কেউ বলেন, ‘হাদি ব্যবসা’। যারা বলেন, তারা মূলত এক লাইনের ‘বিদ্যাবান’। এই ‘বিদ্যাবান’বিষয়ক ব্যাখ্যাটা পরে দিচ্ছি, তার আগে এই ‘বিদ্যাবান’দের জিজ্ঞাসা করি, হাদি তো বলতে চেয়েছিলেন আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির কথা। আমরা যে জবান আয়ত্ত করেছি, যে জীবনাচরণে অভ্যস্ত হয়েছি, তাকে প্রাতিষ্ঠানিক করা। এখনো এ কথা যারা বলতে চাচ্ছেন, তাদের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা চলছে। ‘বিদ্যাবান’দের কাছ থেকে বাঁকা কথা শুনতে হচ্ছে। বর্তমান সরকারেরও কেউ কেউ বিরূপ হচ্ছেন তাদের প্রতি। অথচ বর্তমান সরকার সেই বাংলাদেশপন্থা বা বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদকেই ধারণ করে। যে জাতীয়তাবাদ এদেশের মানুষের কথা বলে এবং তা নিজেদের জবানে।

যারা বাংলাদেশে বিশ্বাস করেন। যারা ভাবেন বাংলার তীর্থ কলকাতা না ঢাকা, তারাই বাংলাদেশের সংস্কৃতির কথা বলে, বাংলাদেশপন্থার কথা বলে। বলে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের কথা। ঘোষণা করে বাংলাদেশের রাজনীতির মুক্তি বাংলাদেশপন্থায়। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদই সঠিক রাজনৈতিক দর্শন। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই এই তারাই এখন ব্যাকফুটে। এক লাইনের ‘বিদ্যাবান’রাই মহাপণ্ডিত এবং ফ্রন্টফুটে। যে পণ্ডিতদের রাজনীতি কী, তাই জানা নেই। তারা জানে না, এই ভূখণ্ডের ইতিহাস। জানে না, ভারত বলতে কোনো রাষ্ট্র সাতচল্লিশের আগে কখনো ছিল না। তারা সাতচল্লিশের ইতিহাস জানে ‘ভারতভাগ’ নামে। যে রাষ্ট্রই ছিল না, তা ভাগ হয় কীভাবে, এই চিন্তাও তাদের মাথায় নেই। ভারত বলতে কোনো রাষ্ট্র অতীতে ছিল না, এখন যেটা আছে সেটা হলো জোড়াতালি দেওয়া একটা ইউনিয়নমাত্র। এই ইউনিয়নও টিকবে না। কারণ অগ্রসরমান চিন্তার যুগে এমন ইউনিয়ন দীর্ঘ মেয়াদে টিকিয়ে রাখা মূলত ইউটোপিয়ান চিন্তা।

এক লাইনের ‘বিদ্যাবান’ বলতে আমি কী বোঝাতে চাচ্ছি তা বলি। যারা কথায় কথায় বলেন, ‘সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে’। অর্থাৎ এই আলাপ মূলত নারীকে শোষণ করার আলাপ। অথচ এর পরের লাইনটি তারা বলেন না, ‘গুণবান পতি যদি থাকে তার সনে’। অর্থাৎ এই পরের লাইনটি জানলে তো শাসন-শোষণের ধান্ধায় বাঁধা পড়বে। সুতরাং বিদ্যাটা ওইটুকুতেই থাক। এরাই হলেন এক লাইনের ‘বিদ্যাবান’। এক কথায় বলতে পারেন হাফডান মানুষ। এদের কাজ হলো, বুঝুক না বুঝুক মালিকের পারপার্স সার্ভ করা। অর্থাৎ মালিকের বিরুদ্ধে যদি কোনো সমালোচনা যায়, তার বিপরীতে ‘থোড় বড়ি খাড়া’ কোনো যুক্তি দাঁড় করানো।

মূলত সাবঅল্টার্ন ধারণাটা অনেকটা সিঁড়ির মতন। নিচের সিঁড়িটা নিম্নবর্গ, তার ওপরের সিঁড়িটাও তার ওপরেরটার কাছে নিম্নবর্গ। ডেভিড আর্নল্ড চমৎকার বলেছেন এ ব্যাপারে। তিনি বলেন, মর্যাদা উচ্চবর্ণের হয়েও পার্থক্যের ক্রমবিন্যাসে নিচের দিকে থাকা কেউই তার তুলনায় নিচুদের চেয়ে উচ্চবর্গের। খুব সোজা করে বলি, একজন নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষ তার একবেলার গৃহকর্মীর তুলনায় উচ্চবর্গ। সুতরাং অঙ্কের এই সমীকরণে এক লাইনের ‘বিদ্যাবান’দের হিসেবে আমাদের মতন অনেকেই সাবঅল্টার্ন। এক লাইনের ‘বিদ্যাবান’রা যেহেতু ক্ষমতাকেন্দ্রের আশ্রয়ে রয়েছেন এবং যা তারা সবসময়েই থাকেন, তাদের তুলনায় নিশ্চিত আমরা সাবঅল্টার্ন। যেমন ছিলাম বিগত সতেরো বছর। আমাদের দূরে রাখা হয়েছিল আমরা ন্যাশনালিস্ট বলে। আমরা বাংলাদেশপন্থি বলে। আমরা ভারতবিরোধী বলে। যারা রেখেছিল তারাই আবার ক্ষমতার আশ্রয়কেন্দ্রে। হ্যাঁ, আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেওয়ারাও উচ্চবর্গের হতে পারেন। একাত্তরের কথায় আসি। সেখানে যারা শরণার্থী হয়েছিলেন, তাদের সিংহভাগ যুদ্ধ না করেও মুক্তিযোদ্ধা। আর যারা দেশের ভেতর থেকে প্রতিদিন মৃত্যুকে মাথায় রেখে দেশের জন্য যুদ্ধ করে গেছেন, তারা সাবঅল্টার্ন। নাকি, মিথ্যা বললাম? জুলাই বিপ্লবেও তাই দেখি। ক্ষমতাকেন্দ্রে আশ্রয় নেওয়া অনেকের জুলাইয়ে কোনো ভূমিকাই ছিল না। বরং তাদের চিন্তা ও দর্শনে ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদ। যে বাদ মূলত ভারতবাদ এর দর্শন। যে দর্শন নেহরু ডকট্রিনের কথা বলে। যে দর্শন অখণ্ড ভারত প্রতিষ্ঠার। কিন্তু কথায় তারা জুলাইয়ের বড় তালেবর। অথচ জুলাই নেহরু ডকট্রিনের সম্পূর্ণ বিপরীতে। যে জুলাই আধিপত্যবাদের সবচেয়ে বড় বাধা।

আধিপত্য ও অধীনতা বিষয়ে যাদের পরিষ্কার ধারণা রয়েছে, তারাই মূলত সাবঅল্টার্ন তত্ত্ব সঠিকভাবে বুঝতে পারবেন। ভারতীয় আধিপত্যবাদের কাছে আমরা সাবঅল্টার্ন। একই কারণে বাংলাদেশে যারা সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিকভাবে আধিপত্যবাদের সোল এজেন্ট তাদের কাছে হাদিরা সাবঅল্টার্ন। আমরা সাবঅল্টার্ন। সুতরাং যারা আধিপত্যবাদের প্রকাশ্য এবং পরোক্ষ তাঁবেদার তাদের কাছে সাবঅল্টার্ন ধারণাটি শুধু অর্থনৈতিক চিন্তাতেই সীমাবদ্ধ। গাড়ি-বাড়ি, পদ-পদবিতে তারা সাবঅল্টার্ন তত্ত্বের ব্যাখ্যা করতে চায়। এরা মূলত বিক্রিয়যোগ্য বলেই অর্থনীতি তাদের কাছে মূল-কথা হয়ে ওঠে।

এই এক লাইনের ‘বিদ্যাবান’রা এ কারণেই হাফডান মানুষ। তারা অর্ধেক দেখে, অর্ধেক দেখে না। একটা জাতিকে পরাভূত করার প্রধান কৌশল হলো তাদের সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে দেওয়া, সঙ্গে আধিপত্যবাদী সংস্কৃতিকে প্রতিষ্ঠা করা। নজরুল এটা ভালো বুঝেছিলেন। তাই তিনি তার কবিতায়, গল্পে, আলেখ্যে, নাটকে উর্দু-ফারসি-আরবিকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আমাদের জবানের সঙ্গে পরিচিত শব্দগুলো তিনি পরিচয়হীন হতে দেননি। তিনি তাকে বাংলায় প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন। নজরুল বুঝেছিলেন, সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদকে না ঠেকালে এই ভূখণ্ডের মানুষ ভুগবে আইডেন্টি ক্রাইসিসে। এখনকার পুশইন কর্মকাণ্ডের দিকে নজর দিলে তা পরিষ্কার বোঝা যাবে।

সুতরাং ক্ষমতাকেন্দ্রে যারা আছেন, তাদের বলব, সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদ ঠেকানোটা জরুরি। শহীদ জিয়াউর রহমান ভালোভাবেই বুঝেছিলেন সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদ না ঠেকানো গেলে, জাতি হিসেবে টিকে থাকা আমাদের পক্ষে দুরূহ হয়ে দাঁড়াবে। ভূখণ্ডের অধিকার প্রতিষ্ঠাই স্বাধীনতা নয়। স্বাধীনতা পরিপূর্ণ হয় স্বাতন্ত্র্য ও স্বকীয়তায়। ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ’ হলো সেই আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে পরিপূর্ণ সাংস্কৃতিক উচ্চারণ। এই উচ্চারণের বাইরে আর কোনো তত্ত্ব নেই। এই তত্ত্বের অনুসারীরাই সাবঅল্টার্ন। এই সাবঅল্টার্নরাই বাংলাদেশ।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...