কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্ত এখন শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার নয়, বরং এটি জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক জটিল সমীকরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাহারছড়া, হ্নীলা ও হোয়াইক্যংয়ের দুর্গম পাহাড়গুলো কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা রোহিঙ্গা ও স্থানীয় অপরাধীদের ‘অশুভ আঁতাত’ সীমান্ত সুরক্ষাকে এক চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। ভূপ্রকৃতিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে এই চক্রটি টেকনাফকে অপহরণ ও মানবপাচারের এক অন্ধকার রাজ্যে পরিণত করেছে। টেকনাফের এই সংকটের মূলে রয়েছে অপরাধীদের এক অনন্য ‘হাইব্রিড মডেল’। স্থানীয় অপরাধীরা পাহাড়ের অলিগলি, গোপন পথ এবং সাধারণ মানুষের গতিবিধি সম্পর্কে নিখুঁত জ্ঞান রাখে। তারা মূলত ‘গাইড’ এবং ‘ইনফরমার’ হিসেবে কাজ করে। অন্যদিকে উগ্রপন্থি রোহিঙ্গা গ্রুপগুলো তাদের জনশক্তি এবং আধুনিক মারণাস্ত্রের সরবরাহ নিশ্চিত করে। তাদের জন্য এই পাহাড়গুলো কেবল লুকানোর জায়গা নয়, বরং অপরাধের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। এই দুই পক্ষের মেলবন্ধনে গঠিত ১০-১২টি সশস্ত্র গ্রুপ এখন পুরো টেকনাফ উপকূলে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। স্থানীয় ও রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের এই ‘অশুভ আঁতাত’ টেকনাফের জনজীবনকে এক দীর্ঘস্থায়ী নরকে রূপান্তরিত করেছে। এই দুইয়ের সমন্বয়ে পাহাড় এখন এক সমান্তরাল রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। প্রতিটি আস্তানায় রয়েছে ল্যাপটপ এবং বড় বড় মোবাইল রাউটার। সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে সচল রাখা এসব ডিভাইসের সাহায্যে তারা সার্বক্ষণিক খবরাখবর রাখে। কোনো ভুক্তভোগীর পরিবার পুলিশ বা সাংবাদিকদের সাহায্য নিলে ল্যাপটপের মাধ্যমে তা তাৎক্ষণিকভাবে জেনে যায় সন্ত্রাসীরা। অপহৃতের ওপর নির্যাতনের মাত্রা বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়। মুক্ত হয়ে আসা ভুক্তভোগীদের বর্ণনা আতঙ্কিত করে তোলার মতো। পাহাড়ের দুর্গম চূড়ায় সন্ত্রাসীরা গড়ে তুলেছে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা-সংবলিত আস্তানা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নড়াচড়া পর্যবেক্ষণ করতে তারা ব্যবহার করছে শক্তিশালী দূরবীক্ষণ যন্ত্র ও অত্যাধুনিক ডিভাইস।
অপহরণ এখন এই অঞ্চলের একটি প্রাত্যহিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত যৌথ বাহিনীর অভিযানে বিপুলসংখ্যক মানুষকে উদ্ধার করা হলেও আতঙ্ক কমছে না। মুক্তিপণ আদায়কে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ায় সাধারণ কৃষক ও দিনমজুররা পাহাড়ে কাজ করতে ভয় পাচ্ছেন। প্রান্তিক কৃষকদের জন্য পাহাড় আজ এক অভিশপ্ত নাম। যখনই ফসল ঘরে তোলার সময় হয়, তখনই পাহাড় থেকে নেমে আসে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা। অস্ত্রের মুখে তারা কৃষকদের ফসল তুলতে নিষেধ করে। সন্ত্রাসীদের কথা অমান্য করলেই ২০-২৫ জনের সশস্ত্র দল এসে কৃষকদের জিম্মি করে পাহাড়ে নিয়ে যায়। জিম্মি কৃষকদের পরিবারের কাছে ফোন করে দাবি করা হয় আকাশচুম্বী মুক্তিপণ। টাকা দিতে না পারলে জোটে অমানবিক নির্যাতন, আর ব্যর্থ হলে লাশে পরিণত হতে হয় গহিন জঙ্গলে। আস্তানায় আটকে রেখে নির্যাতনের ভিডিও ধারণ করে পরিবারের কাছে পাঠানো হচ্ছে, যা স্থানীয়দের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি মনস্তাত্ত্বিক ক্ষত তৈরি করছে। সীমান্ত এলাকায় অপরাধীদের এই শক্তিশালী অবস্থান দেশের সার্বভৌমত্ব এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর নজরদারির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। টেকনাফের পাহাড়ে সক্রিয় সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো মুক্তিপণ আদায়ের কৌশল হিসেবে অপহৃত ব্যক্তির হাতের কবজি বা আঙুল ধারালো অস্ত্র দিয়ে কেটে তা পরিবারের কাছে পাঠানো হয়েছে, কিংবা রক্তাক্ত বিচ্ছিন্ন হাতের ছবি-ভিডিও মোবাইলে পাঠিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করা হয়েছে।
২০২৪ সালের মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময়ে টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের লম্বাবিল এলাকার কৃষক উসমান গণি এবং আরো কয়েকজনকে নিজের ক্ষেতে কৃষিকাজ করার সময় সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা অপহরণ করে। অপহরণের পর উসমান গণির পরিবারের কাছে তারা মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ দাবি করে; কিন্তু দরিদ্র পরিবারের পক্ষে সেই টাকা জোগাড় করা সম্ভব না হওয়ায় উসমান গণির ডান হাতটি কবজি থেকে সম্পূর্ণ কেটে ফেলে এবং সেই রক্তাক্ত বিচ্ছিন্ন হাতের ছবি ও ভিডিও পরিবারের কাছে পাঠিয়ে দ্রুত টাকা দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করে (ইত্তেফাক, যুগান্তর, ১৭-১৮ মার্চ, ২০২৪)।
হাত কাটার সেই নৃশংস ঘটনার পর, পাহাড়ি সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো মুক্তিপণ আদায়ের কৌশল হিসেবে এই বর্বরতাকে কাজে লাগায়। দ্রুত টাকা আদায় এবং পুলিশকে তথ্য দেওয়া থেকে বিরত রাখতে পরবর্তী সময়ে একের পর এক অপহৃতের আঙুল কেটে নেওয়ার ঘটনা ঘটতে থাকে। ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসের শেষের দিকে টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের উনছিপ্রাং এলাকার পাহাড়ি ঢাল থেকে চারজন স্থানীয় কৃষককে একযোগে অপহরণ করে। পরদিন থেকেই পরিবারের কাছে ফোন করে জনপ্রতি পাঁচ লাখ টাকা করে মুক্তিপণ দাবি করা হয়। পরিবারগুলো টাকা জোগাড় করতে দেরি করায় সন্ত্রাসীরা লাইভ ভিডিও কলে অপহৃতদের আঙুল কেটে নেওয়ার দৃশ্য দেখায় এবং কান্নার আওয়াজ শোনায়। পরবর্তী সময়ে তীব্র আতঙ্কের মুখে পরিবারগুলো ধারদেনা এবং গবাদিপশু বিক্রি করে আংশিক মুক্তিপণ পরিশোধ করলে রক্তাক্ত ও ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় তাদের পাহাড়ের পাদদেশে ফেলে যাওয়া হয়। ২০২৪ সালের জুন মাসে হ্নীলা ইউনিয়নের পানখালী এলাকা থেকে দুই তরুণকে পাহাড়ের গহিন জঙ্গলবেষ্টিত আস্তানায় ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। সন্ত্রাসীরা ভুক্তভোগীদের একটি গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে লোহার রড দিয়ে পেটানোর পাশাপাশি ধারালো ছুরি দিয়ে হাতের আঙুলের অগ্রভাগ কেটে ফেলে। সেই রক্তাক্ত আঙুলের ছবি হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে তাদের বাবা-মায়ের ফোনে পাঠানো হয় এবং হুমকি দেওয়া হয়, আগামী ১২ ঘণ্টার মধ্যে টাকা না আসলে পরের ধাপে হাত কেটে ফেলা হবে।
২০২৫ সালের মে ও জুন মাসের দিকে টেকনাফের বাহারছড়া ও হোয়াইক্যং সীমান্তে বনের কাঠ সংগ্রহ করতে যাওয়া তিন কাঠুরিয়াকে অপহরণ করা হয়। পুলিশকে খবর দেওয়ার অপরাধে শাস্তিস্বরূপ তাদের প্রত্যেকের হাতের আঙুল এবং কান কেটে জখম করা হয়। এই ঘটনার পর সন্ত্রাসীরা স্থানীয় এলাকায় বার্তা পাঠায়—‘যারা পুলিশ বা সাংবাদিকদের তথ্য দেবে, তাদের আঙুল আর আস্ত থাকবে না।’ একজন কৃষকের আঙুল কেটে নিলে তিনি আর লাঙল বা কাস্তে ধরতে পারেন না। এটি স্থানীয় শ্রমজীবী মানুষের মনে স্থায়ী ভীতি ও অর্থনৈতিক পঙ্গুত্ব তৈরি করে।
এই রোমহর্ষক ও চরম নৃশংসতার মূল উদ্দেশ্য হলো ভুক্তভোগী পরিবার যেন তীব্র আতঙ্কে কোনো ধরনের দরদাম বা আইনি সাহায্য নেওয়ার চিন্তা বাদ দিয়ে দ্রুত দাবি করা টাকা পরিশোধ করে। একটি হাত বা আঙুল কাটার ঘটনা পুরো অঞ্চলের মানুষের মনে এমন ত্রাস সৃষ্টি করে যে, পরবর্তী সময়ে কেউ অপহৃত হলে পরিবারগুলো পুলিশকে জানানোর সাহসটুকুও হারিয়ে ফেলে। এ ধরনের অপরাধের ধরনকে অপরাধবিজ্ঞানের ভাষায় ‘টেরর-ট্যাকটিক্স’ বলা হয়। যখন কোনো অপরাধী চক্র বুঝতে পারে, তাদের শক্তির চেয়ে ভীতি বেশি কার্যকর, তখন তারা এই ধরনের শরীর বিচ্ছিন্ন করার মতো জঘন্য পথ বেছে নেয়।
পুলিশ, র্যাব ও কোস্টগার্ড নিয়মিত অভিযান চালিয়ে অপহৃতদের উদ্ধার করলেও দস্যুদের মূল নেটওয়ার্ক ভাঙা যাচ্ছে না। এর প্রধান কারণ—পাহাড়ের ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত সবকিছু দেখার সুবিধা পাওয়ায় সন্ত্রাসীরা অভিযানের আগেই সতর্ক হয়ে যায়। সন্ত্রাসীদের কাছে থাকা জ্যামার ব্যবস্থার কারণে তাদের লোকেশন ট্র্যাক করা কঠিন হয়ে পড়ছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে টেকনাফের সাধারণ মানুষ এখন আর ছোটখাটো অভিযানে আশ্বস্ত হতে পারছে না। কয়েক হাজার কৃষকের প্রাণের নিরাপত্তা এবং সীমান্ত সুরক্ষায় তারা সেনাবাহিনীর বড় পরিসরে বিশেষ অভিযান দাবি করছেন। সেনাবাহিনীর আধুনিক সিগন্যাল কোর প্রযুক্তির মাধ্যমে সন্ত্রাসীদের ডিজিটাল নেটওয়ার্ক জ্যাম করা সম্ভব। পাহাড়ের কৌশলগত পয়েন্টগুলোয় সেনাবাহিনীর অস্থায়ী বা স্থায়ী ক্যাম্প স্থাপনই পারে সন্ত্রাসীদের স্থায়ীভাবে বিতাড়িত করতে। এই আঁতাত ভাঙতে হলে কেবল গতানুগতিক অভিযান যথেষ্ট নয়, সীমান্ত সুরক্ষায় প্রয়োজন বহুমুখী উদ্যোগ। পাহাড়ের গহিন কোণেও নজর রাখতে ড্রোনের ব্যবহার এবং থার্মাল ইমেজিং সিস্টেম বসানো জরুরি। রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর ভেতরে ও বাইরে গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করতে হবে, যাতে কোনো বড় অপরাধ ঘটার আগেই তা নস্যাৎ করা যায়। স্মর্তব্য, কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলায় বর্তমানে ৩৪টি নিবন্ধিত রোহিঙ্গা ক্যাম্প রয়েছে। এর বাইরে নোয়াখালীর ভাসানচরেও কিছু শরণার্থীকে স্থানান্তর করা হয়েছে, তবে মূল জনঘনত্ব এবং অপরাধের কেন্দ্রবিন্দু কক্সবাজারের এই ৩৪টি ক্যাম্পই। জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা এবং বাংলাদেশ সরকারের সর্বশেষ যৌথ ডেটাবেজ (মার্চ-মে ২০২৬) অনুযায়ী ক্যাম্পে নিবন্ধিত শরণার্থীর সংখ্যা প্রায় ১১ লাখ ৯৪ হাজার। গত ১৬ মাসে (২০২৫ থেকে ২০২৬ সালের শুরু পর্যন্ত) মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সহিংসতা বাড়ায় আরো প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার নতুন শরণার্থী সীমান্ত পেরিয়ে অনুপ্রবেশ করেছে। স্থানীয় প্রশাসন ও বিভিন্ন এনজিওর হিসাবমতে, বর্তমানে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত মিলিয়ে কক্সবাজারে মোট রোহিঙ্গা জনসংখ্যা প্রায় ১৫ লাখ। উখিয়া-টেকনাফের স্থানীয় অধিবাসী প্রায় পাঁচ লাখ, অথচ রোহিঙ্গা জনসংখ্যা তার চেয়ে প্রায় তিনগুণ বেশি। এই বিশাল জনস্রোত মাত্র ২৪ বর্গকিলোমিটার এলাকায় অবরুদ্ধ থাকায় সেখানে অপরাধের উর্বর ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে টেকনাফ ও উখিয়া এলাকা থেকে আড়াই হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা ও স্থানীয় সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার হয়েছে।
আরাকান আর্মি বনাম দেশটির জান্তা বাহিনী ক্যাম্পগুলোর ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যরা দিনের বেলা সাধারণ শরণার্থীর বেশে থাকলেও রাতে ক্যাম্প এবং সংলগ্ন পাহাড়ি এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেয়। ক্যাম্পে তাদের নিজস্ব ক্যাডার নেটওয়ার্ক রয়েছে। উখিয়া-টেকনাফের ৩৪টি ক্যাম্পেরই ভৌগোলিক অবস্থান টেকনাফের গহিন পাহাড়ের গা ঘেঁষে। অপরাধ করে ক্যাম্পে আত্মগোপন করা যেমন সহজ, ঠিক তেমনি ক্যাম্প থেকে বের হয়ে মাত্র ১০ মিনিটে গহিন পাহাড়ে চলে যাওয়া যায়। এই সহজ যাতায়াত ব্যবস্থার কারণেই স্থানীয়রা নিজেদের ঘরের পাশেও নিরাপদ বোধ করছেন না।
টেকনাফের মতো দুর্গম ও সংবেদনশীল এলাকায় অপরাধ নির্মূল করা কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একার পক্ষে সম্ভব নয়। ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা এবং অপরাধীদের স্থানীয় নেটওয়ার্ক ভাঙতে জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য। পাহাড়ের গহিন আস্তানা বা অপরাধীদের গতিবিধি সম্পর্কে স্থানীয় জনগণের চেয়ে ভালো আর কেউ জানে না। এলাকায় অপরিচিত কারো যাতায়াত বা সন্দেহজনক কার্যক্রম দেখলে দ্রুত নিরাপত্তা বাহিনীকে জানানোর ব্যবস্থা করতে হবে। লোভে পড়ে বা ভয়ে কোনো সন্ত্রাসীকে বাড়িতে আশ্রয় বা খাদ্য সরবরাহ না করা। আজকের আশ্রয় কালকের বিপদের কারণ হতে পারে। পাড়া বা গ্রামভিত্তিক ছোট ছোট স্বেচ্ছাসেবক দল ও কমিউনিটি পুলিশিং কমিটি গঠন করলে এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। গ্রামের প্রবেশপথগুলোয় স্থানীয় যুবকদের সমন্বয়ে পাহারার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। প্রতিটি গ্রামের জন্য একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ বা জরুরি মোবাইল নেটওয়ার্ক তৈরি করা, যাতে কোনো বাড়িতে হামলা বা অপহরণের চেষ্টা হলে মুহূর্তের মধ্যে পুরো গ্রাম সতর্ক হতে পারে। সন্ত্রাসীরা সাধারণত একা থাকা বা বিচ্ছিন্ন পরিবারগুলোকে টার্গেট করে। চাষাবাদ বা জঙ্গল থেকে কাঠ সংগ্রহের সময় একা না গিয়ে দল বেঁধে যাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা। এলাকায় নতুন কোনো ভাড়াটিয়া বা শ্রমিক এলে তাদের জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি সংগ্রহ করুন এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিকে অবহিত করুন। অপরাধীদের সামাজিকভাবে বয়কট করা তাদের মনোবল ভেঙে দেওয়ার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। যদি স্থানীয় কোনো কিশোর বা যুবক অপরাধের পথে পা বাড়ায়, তবে শুরুতেই তার পরিবারকে সতর্ক করা এবং তাদের ওপর সামাজিক চাপ প্রয়োগ করা উচিত। যারা সন্ত্রাসীদের রসদ (খাবার, সিম কার্ড, তথ্য) সরবরাহ করে, তাদের সামাজিকভাবে চিহ্নিত করে আইনের হাতে সোপর্দ করা। ইউপি সদস্য বা চেয়ারম্যানদের মাধ্যমে প্রশাসনের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রক্ষা করা জরুরি। গ্রাম পর্যায়ে নিয়মিত সচেতনতামূলক সভা করা এবং প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সেখানে আমন্ত্রণ জানানো, যাতে সাধারণ মানুষের ভয় দূর হয় এবং সাহসিকতা বাড়ে।
টেকনাফের সীমান্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করা মানে কেবল একটি অঞ্চলের শান্তি নয়, বরং পুরো দেশের স্থিতিশীলতা রক্ষা করা। স্থানীয় ও রোহিঙ্গা অপরাধীদের এই নেটওয়ার্ক যদি এখনই সমূলে উৎপাটন করা না যায়, তবে এই দুর্গম পাহাড় অদূর ভবিষ্যতে আরো বড় কোনো আন্তর্জাতিক অপরাধ চক্রের ক্রীড়াক্ষেত্রে পরিণত হতে পারে। সময় এসেছে রাষ্ট্রকে আরো কঠোর এবং কৌশলগত অবস্থানে যাওয়ার। টেকনাফের পাহাড়ে যা ঘটছে, তা কেবল ডাকাতি নয়, এটি একটি সুপরিকল্পিত ‘প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ মডেল’। কৃষকের ঘাম ঝরানো ফসল আর সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে হস্তক্ষেপ এখন সময়ের দাবি। ডিজিটাল বাংলাদেশের একপ্রান্তে বসে ল্যাপটপ ব্যবহার করে সন্ত্রাসীরা যখন অপহরণ বাণিজ্য চালায়, তখন সেই প্রযুক্তির জবাব আরো শক্তিশালী প্রযুক্তি ও সামরিক কৌশলে দেওয়া ছাড়া বিকল্প কোনো পথ খোলা নেই। স্থানীয় মানুষ যখন দেখবে, রাষ্ট্র প্রযুক্তিতে সন্ত্রাসীদের চেয়েও শক্তিশালী এবং তথ্য দিলে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত, তখনই তারা সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তুলবে। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও বিশেষায়িত বাহিনীর মাধ্যমে পাহাড়ের গুরুত্বপূর্ণ চূড়াগুলোয় স্থায়ী ‘অবজারভেশন পোস্ট’ স্থাপন করতে হবে। ফসল কাটার মৌসুমে বিশেষ নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলতে হবে, যাতে কোনো কৃষককে নিজের ঘামের ফসল বিসর্জন দিতে না হয়। এই বর্বরতা বন্ধ না হলে টেকনাফ সীমান্ত সম্পূর্ণরূপে সাধারণ মানুষের বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠবে। টেকনাফের পাহাড় আবার মুখরিত হোক পাখির ডাকে আর কৃষকের হাসিতে—কোনো অপহৃতের আর্তনাদে নয়।
লেখক : সাবেক উপদেষ্টা, ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় অন্তর্বর্তী সরকার
drkhalid09@gmail.com
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন



ভারতের গোয়েন্দা উচ্চাকাঙ্ক্ষায় বিপর্যয়
শুধু দোষারোপ নয়, জানতে হবে করণীয়