আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

‘আমরা সবাই হাদি হব’ : কিন্তু কীভাবে

ইশফাক ফারহান সিয়াম

‘আমরা সবাই হাদি হব’ : কিন্তু কীভাবে

শহীদ শরীফ ওসমান হাদি চলে গেলেন গত ১৮ ডিসেম্বর। রাজনীতিতে কোনো আদর্শবাদী নক্ষত্রের পতনে আমরা কিছু কথা, স্লোগান বারবার বলি, যা হাদির ক্ষেত্রেও হয়েছে। ‘এক হাদি লোকান্তরে, লক্ষ হাদি ঘরে ঘরে’, ‘জীবিত হাদির চেয়ে মৃত হাদি বেশি শক্তিশালী’। তরুণরা স্লোগান দিচ্ছে ‘আমরা সবাই হাদি হব, যুগে যুগে লড়ে যাব’, ‘আমরা সবাই হাদি হব, গুলির মুখে কথা কব’।

আমাদের একটু ভেবে দেখা দরকার হাদির প্রধান আদর্শ আসলে কী ছিল, কীভাবে তিনি হাদি হয়ে উঠলেন। আমরা যে বলছি, ‘আমরা সবাই হাদি হব’, এই হাদি হতে গেলে আসলে আমাদের কী করতে হবে? শুধু কি গুলির মুখে কথা বললেই হাদি হওয়া যাবে?

বিজ্ঞাপন

অবশ্যই গুলির মুখে কথা বলা হাদির আদর্শের অন্যতম বড় একটি দিক, কিন্তু তার চেয়েও বড় দিক হাদি কী কথা বলতেন, কীভাবে বলতেন। শহীদ ওসমান হাদির মতো তথ্য, যুক্তি ও বাচনভঙ্গির এত চমৎকার মিশেলে কেউ কি কখনো বক্তব্য দিতে পেরেছেন? কখনো কি কেউ হাদিকে বিতর্কে আটকাতে পেরেছেন?

এই জায়গাতেই হাদি একক, হাদি অনন্য। আমরা যদি আসলেই হাদি হতে চাই, তাহলে আমাদের এই যোগ্যতা অর্জনের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে।

ওসমান হাদি শাহাদতের কিছুকাল আগে টানা পাঁচ ঘণ্টা নিজের জীবনের গল্প রেকর্ড করেছিলেন। এমন এক পরিবার পেয়েছিলেন তিনি, যেখানে তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র অবস্থায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে মিছিলে গিয়ে স্লোগান ধরতেন, মিছিল শেষে একটি বাংলাদেশপন্থি দলের পার্টি অফিসে (ছাত্রদল) বসে নেতাদের আড্ডা তন্ময় হয়ে শুনতেন।

আমরা যদি আসলেই হাদি হতে চাই, তাহলে পরিবারে এই পরিবেশের বিকল্প নেই। শুধু পড়াশোনা আর ক্যারিয়ারকেই জীবনের লক্ষ্য বানিয়ে যদি বলা হয় অন্যায়ের প্রতিবাদের ঝুট-ঝামেলা এড়িয়ে চলতে হবে, শেখানো হয় ‘নিজে বাঁচলে বাপের নাম’, তাহলে কি হাদিরা তৈরি হবেন?

আমরা যারা হাদি হতে চাই, তাদের ব্যাপারটা চিন্তা করা উচিত যে কতজন এমন পরিবেশ পেয়েছি। যদি না পেয়ে থাকি, তাহলে আমাদের সন্তানদের জন্য এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে তারা ছোট থেকেই মানুষের কথা, দেশের কথা, উম্মাহর কথা চিন্তা করবে। ছোট থেকেই যাতে সরেজমিনে গিয়ে ইনসাফের সংগ্রামে অংশ নিয়ে নিজের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করতে পারে তবেই লক্ষ হাদি তৈরি হওয়ার পথ তৈরি হবে।

হাদি হয়ে উঠার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অবদান ছিল ওনার জ্ঞানার্জন। পরিবারে জ্ঞানার্জনের যেই চমৎকার পরিবেশ ওনার বাবা-মা করে দিয়ে গিয়েছিলেন, তার প্রতিফলন শুধু ওসমান হাদি না, তার সব ভাই-বোনের মধ্যে পড়েছিল। তারা বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায় বোর্ডে একেবারে প্রথমদিকের পজিশন অলঙ্কৃত করে অতুলনীয় মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন।

ওসমান হাদি নিজেও পড়াশোনা করেছেন বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেছারাবাদ মাদরাসায়। সেখানে পরীক্ষার ফলে যেমন মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন, তেমনি ছাত্র থাকা অবস্থায়ই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় মাদরাসাশিক্ষার্থীদের বৈষম্যের প্রতিবাদে বিশাল আন্দোলন গড়ে তোলেন। পাশাপাশি, বিতর্কের মতো সহশিক্ষা কার্যক্রমে জাতীয় পর্যায়ে বেশ কিছু পুরস্কার পেয়েছেন।

আওয়ামী দুঃশাসনের একপর্যায়ে তিনি উপলব্ধি করেন, এ ফ্যাসিবাদের শেকড় পার্লামেন্ট বা সেক্রেটারিয়েটে না বরং আরো গভীরে। ইঞ্জিনিয়ার্ড সংস্কৃতিতে, ম্যানিপুলেটেড ন্যারাটিভে আর বানানো ইতিহাসে। এসবই আধিপত্যবাদীদের মেটিকুলাস ডিজাইনের অংশ। আর এই শেকড় উপড়ে ফেলে যদি সত্যকে উদ্ভাসিত না করা যায়, তাহলে এই ভূমিতে ফ্যাসিবাদ বারবার ফেরত আসবে বিভিন্ন মোড়কে।

সে জন্য ৫ আগস্টের পর যখন সবাই ভাবল কাজ শেষ, ওসমান হাদি শুরু করলেন এক নতুন লড়াই। সুপ্ত ফ্যাসিবাদের শেকড়ের বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই। তিনি জানতেন, যারা এই কালচারাল ফ্যাসিবাদের কুশীলব, তাদের অর্থের জোগানের যেমন শেষ নেই, তেমনি নিজ নিজ ক্ষেত্রে তাদের যোগ্যতাও প্রশ্নাতীত।

তাই, তিনি বারবার আমাদের কাছে আবেদন জানিয়েছেন যাতে আমরা অনেক পড়াশোনা করি, স্কিল ডেভেলপ করি, নিজেদের ফিল্ডে সেরা হই। বলেছেন, আমাদের এই লড়াইয়ে জিততে হলে প্রচণ্ড যোগ্য হতে হবে। মাদরাসাছাত্রদের উদ্দেশে একদিন তিনি বলেন, তোমরা এমনভাবে আরবি শিখো, যাতে করে মিডল ইস্টে অনেক ভালো পজিশনে চাকরি পেতে পারো। যে যার জায়গায় সেরা হওয়ার সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে।

হাদি ভাই এই আহ্বানের বাস্তবায়ন করেছিলেন তার নিজের জীবনে সবচেয়ে বেশি। শহীদ জিয়াকে নিজের রাজনৈতিক আদর্শ মানতেন। শহীদ জিয়ার সম্পর্কে ওনার যে পড়াশোনা ছিল, তা বিএনপির অনেক সিনিয়র কেন্দ্রীয় নেতারই নেই।

তিনি ব্যাপক পড়াশোনা করেছেন সুলতানি আমল থেকে শুরু করে হাসিনার ফ্যাসিবাদ পর্যন্ত বাংলার ইতিহাস নিয়ে। তুলে ধরেছিলেন, কীভাবে চট্টগ্রামে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সিপাহি বিদ্রোহে নেতৃত্ব দিয়ে সমগ্র ব্রিটিশ ভারতের বীর হাবিলদার রজব আলীকে আমাদের ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা হলো।

কীভাবে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে আমাদের শত বছরের সহজাত বাংলার তৎসমীকরণ করা হলো একটি বিশেষ গোষ্ঠীকে ওপরে ওঠানোর জন্য আর এই কাজে যুক্ত ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মতো ব্যক্তিরা, যাদের এখনো আমাদের মূলধারার বয়ানে কোনো বিতর্ক ছাড়াই মহিমান্বিত করা হয়।

কীভাবে, পপুলার কালচারে দেশভাগের সময় মুসলমান মুহাজিরদের ব্যথাগুলো উপেক্ষা করা হয়েছে, তা বুঝতে তিনি সিনেমা বিশ্লেষণ করতেন। ৭১-কে কেন ৪৭-এর কন্টিনিউয়েশন না ধরে কাউন্টারথিসিস হিসেবে দাঁড় করানোÑএটা নিয়েও তিনি কথা বলেছেন।

তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, এগুলো ইতিহাসের নিছক কোনো বিচ্ছিন্ন ম্যানিপুলেশন না। বরং একটি গ্র্যান্ড স্ট্র্যাটেজির অংশ, যার মাধ্যমে আধিপত্যবাদী শক্তি আমাদের মস্তিষ্ককে গোলাম বানিয়ে রাখতে চায়। তাই, আমরা যদি সত্যিকার সার্বভৌমত্ব অর্জন করতে চাই, তাহলে এই ফ্যাসিবাদের শেকড় উপড়ে ফেলে নতুন বয়ান নির্মাণ করতে হবে সত্যাশ্রয়ী ইতিহাসের ওপর ভর করে।

এ কাজের জন্য যে নানা যোগ্যতা দরকার, সেটা অর্জন করাই প্রকৃত হাদি হয়ে ওঠা। কিন্তু হাদি ভাই একদিন দুঃখ করে বলছিলেন, ‘মানুষ আমাদের কাছে এসে বলে আমি আপনার জন্য জান দিয়ে দিতে চাই। কিন্তু আমি যখন বলি জান দেওয়া লাগবে না ভাই, আমাদের একজন প্রফেশনাল ক্যামেরাম্যান দরকার, আপনাকে একটি ফটোগ্রাফি কোর্সে ভর্তি করে দিই, তখন আর তিনি কথা বলেন না।’ গুলিবিদ্ধ হওয়ার কয়েক দিন আগেও আমাদের অনুরোধ করেছেন, যাতে আমরা ভারত-পাকিস্তানের পতাকা না মাড়িয়ে বরং কীভাবে বাংলাদেশের পতাকাকে উঁচু করে ধরা যায় সে চেষ্টা করি।

প্রকৃত হাদি হওয়ার মানে হচ্ছে হাদির সংগ্রামকে এগিয়ে নেওয়া। গুলির মুখে কথা বলার চেয়ে নিজেকে এমনভাবে তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ, যাতে করে আমাদের যুক্তি, জ্ঞান, দক্ষতা, সততা আর নিষ্ঠা দেখে আধিপত্যবাদীদের অন্তরে কাঁপন ধরে যায়। যেটি তাদের হয়েছিল শহীদ ওসমান হাদির যোগ্যতা দেখে। সঙ্গে এটিও মনে রাখতে হবে, হাদি একদিনে তৈরি হননি। ৩২ বছরে তিলে তিলে গড়ে উঠেছেন। হাদি ভাই যেই শিক্ষা পেয়েছিলেন, যেই পরিবেশ পেয়েছিলেন, সেটিও আমাদের সন্তানদের জন্য নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।

শহীদ ওসমান হাদির এই আদর্শগুলো যদি আমরা বাস্তবায়ন করতে পারি, তবেই ‘আমরা সবাই হাদি হব’ স্লোগানটি সার্থক হবে।

লেখক : স্নাতক শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, জর্জটাউন ইউনিভার্সিটি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন