বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় জনপদ যশোর ও খুলনার বিস্তীর্ণ এলাকা কয়েক দশক ধরে এক ভয়াবহ মানবিক ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের শিকার, যা ‘ভবদহ জলাবদ্ধতা’ নামে বহুল পরিচিত। যশোরের অভয়নগর, মনিরামপুর, কেশবপুর এবং খুলনার ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলার অংশবিশেষ নিয়ে বিস্তৃত এই অঞ্চলটি বর্ষা মৌসুমে পানির নিচে তলিয়ে থাকে । এ সমস্যাটি শুধু একটি ভৌগোলিক দুর্যোগ নয়, বরং এটি ভুল উন্নয়ন পরিকল্পনা, প্রকৃতিবিরোধী প্রকৌশল এবং স্থানীয় স্বার্থান্বেষী মহলের চক্রান্তের এক সম্মিলিত রূপ। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর যশোর সফর এবং স্থানীয় সংসদ সদস্যদের সংসদে এ বিষয়ে জোরালো বক্তব্য সমস্যার স্থায়ী সমাধানের পথে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
ভবদহ এলাকার জলাবদ্ধতাকে বুঝতে হলে আমাদের ষাটের দশকের উপকূলীয় বাঁধ প্রকল্প বা ‘পোল্ডার ব্যবস্থা’র দিকে তাকাতে হবে। তখন কৃষিকে জোয়ারের লবণাক্ত পানি থেকে রক্ষা করতে এবং অধিক ফলন নিশ্চিত করতে পোল্ডার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়েছিল। সাময়িকভাবে এটি সুফল দিলেও দীর্ঘ মেয়াদে তা প্রকৃতির স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়। জোয়ারের সঙ্গে আসা পলি নদীগুলোর তলদেশে জমতে শুরু করে, কারণ বাঁধের কারণে সেই পলি প্লাবনভূমিতে (বিলের মধ্যে) প্রবেশ করার পথ হারিয়ে ফেলে। ফলে নদীর বুক উঁচু হতে থাকে এবং বিলে জমে থাকা পানি বের হওয়ার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। এভাবেই সৃষ্টি হয় এক কৃত্রিম ও মানবসৃষ্ট জলাবদ্ধতা। বর্তমানে এই জলাবদ্ধতা শুধু বর্ষা মৌসুমেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা মৌসুমের পরও স্থায়ী হচ্ছে। নদীগুলো নাব্য হারিয়ে মৃতপ্রায় হয়ে পড়েছে, যা পুরো অঞ্চলের পানি নিষ্কাশনব্যবস্থাকে পঙ্গু করে দিয়েছে।
ভবদহ সমস্যার সমাধান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সংশ্লিষ্ট মহলে দুটি প্রধান ধারা বিদ্যমান। একটি হলো প্রচলিত প্রকৌশলগত ড্রেজিং পদ্ধতি এবং অন্যটি হলো প্রকৃতিনির্ভর জোয়ারভাটা ব্যবস্থাপনা।
পলি ড্রেজিং ও নিয়ন্ত্রিত নিষ্কাশন ব্যবস্থাপনা পদ্ধতিটি মূলত নিয়মিত ড্রেজিং এবং স্লুইসগেট বা রেগুলেটরের মতো কংক্রিট কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। সংক্ষেপে একে বলা যেতে পারে ‘ড্রেজিং ও নিয়ন্ত্রিত নিষ্কাশন’ পদ্ধতি। এই পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা হলো এটি প্রকৃতিকে বিবেচনায় নেয় না। যান্ত্রিকভাবে নদী খনন করার পর পরবর্তী জোয়ারেই আবার পলি এসে নদী ভরাট করে দেয়। ফলে সরকারের কোটি কোটি টাকা খরচ হলেও ফল হয় শূন্য। অধিকন্তু, কংক্রিট কাঠামো তৈরির ফলে নদীর স্বাভাবিকপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়, যা জীববৈচিত্র্যের অপূরণীয় ক্ষতি করে এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তরের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। দীর্ঘ মেয়াদে এটি ওই এলাকার পরিবেশগত বিপর্যয়কে আরো ত্বরান্বিত করে।
জোয়ারভাটা ও পলি অবক্ষেপণ ব্যবস্থাপনা একটি প্রাচীন ও জনবান্ধব প্রাকৃতিক পদ্ধতি, যা স্থানীয়ভাবে টিআরএম নামে পরিচিত। এই পদ্ধতিতে একটি নদীকে পার্শ্ববর্তী নিচু প্লাবনভূমি বা বিলের সঙ্গে সংযুক্ত করে দেওয়া হয়। জোয়ারের সময় পলিযুক্ত পানি বিলে প্রবেশ করে সেখানে পলি জমা করে বিলের উচ্চতা বাড়িয়ে দেয়। আবার ভাটার সময় কম পলিযুক্ত পানি তীব্র গতিতে বেরিয়ে আসার সময় নদীর তলদেশকে প্রাকৃতিকভাবে গভীর করে তোলে। এটি কোনো কৃত্রিম যন্ত্র ছাড়াই নদীকে প্রবহমান রাখে এবং জলাবদ্ধতা নিরসন করে। একই সঙ্গে এটি সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও লবণাক্ততা মোকাবিলার ক্ষেত্রেও এক অমোঘ ঢাল হিসেবে কাজ করে।
বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে টিআরএম সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হওয়া সত্ত্বেও কেন এটি পূর্ণাঙ্গভাবে সফল হচ্ছে না? গবেষণায় দেখা গেছে, এর পেছনে কাজ করছে এক জটিল ‘রাজনৈতিক অর্থনীতি’ এবং ‘স্বার্থ সংঘাত’।
বিগত কয়েক দশকে ভবদহ অঞ্চলের কৃষির ধরনে এক আমূল পরিবর্তন এসেছে। আগে যেখানে কৃষকরা ধান বা ধান-মাছের সমন্বিত চাষ করতেন, সেখানে এখন গড়ে উঠেছে শত শত বিশাল মৎস্যঘের, যেখানে বছরব্যাপী মাছ চাষ হচ্ছে। এই ঘেরগুলো মূলত স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠী নিয়ন্ত্রণ করে, যাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব অপরিসীম। এই ‘আধা-করপোরেট’ মৎস্য উৎপাদনব্যবস্থা ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিদের ইজারার (হারি) ভিত্তিতে ভূমি থেকে কার্যত উচ্ছেদ করে মুষ্টিমেয় কয়েকজনের হাতে মুনাফা কুক্ষিগত করে রেখেছে। যখনই কোনো বিলে টিআরএম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়, তখনই এই প্রভাবশালী ঘের ব্যবসায়ী গোষ্ঠী তাদের ব্যবসায়িক ক্ষতি হবে ভেবে এর বিরোধিতা শুরু করে। তারা ভূমিহীন ও সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে এবং বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ব্যবহার করে এই উদ্যোগকে নস্যাৎ করে দেয়। এছাড়া আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, প্রাতিষ্ঠানিক জড়তা এবং সময়মতো ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ না দেওয়াও টিআরএমের ব্যর্থতার বড় কারণ।
ভবদহ অঞ্চলের জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তির জন্য শুধু নদী খনন বা ড্রেজিং যথেষ্ট নয়। বর্তমান গবেষণার ফল তিনটি প্রধান সংস্কারের ওপর গুরুত্বারোপ করছে : প্রথমত, স্বচ্ছ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা। টিআরএম চলাকালীন সময়ে যে বিলটিকে বেছে নেওয়া হবে, সেই বিলের কৃষকরা কয়েক বছরের জন্য উৎপাদন থেকে বঞ্চিত হন। অতীতে ক্ষতিপূরণ বিতরণে ব্যাপক অনিয়ম ও বিলম্ব দেখা গেছে। তাই ভূমিমালিকদের পাশাপাশি সেই জমির ওপর নির্ভরশীল ভূমিহীন দিনমজুর ও প্রান্তিক চাষিদের অন্তর্ভুক্ত করে একটি সরাসরি ও স্বচ্ছ ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা চালু করতে হবে। এটি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনবে।
দ্বিতীয়ত, মৎস্য চাষের ‘জোনিং’ এবং মৎস্যজীবীদের সম্পৃক্তকরণ। পুরো বিল জুড়ে বারোমাসি মৎস্য চাষ বা বিশাল ঘের পদ্ধতি নিষিদ্ধ করে এলাকাভিত্তিক ‘জোনিং’ প্রবর্তন করতে হবে। বিলের সবচেয়ে নিচু এলাকাগুলোকে মৎস্য চাষের জন্য নির্দিষ্ট করা যেতে পারে, যা শুষ্ক মৌসুমে সেচের আধার হিসেবেও কাজ করবে। ঘের ব্যবসায়ীদের জন্য একটি নির্দিষ্ট ‘উত্তরণকালীন সময়’ দিতে হবে, যাতে তারা তাদের বিনিয়োগ গুছিয়ে নিতে পারেন। তাদের এই প্রক্রিয়ার প্রতিপক্ষ না বানিয়ে অংশীদার হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
তৃতীয়ত, জীবিকা উন্নয়নমূলক বিশেষ পদক্ষেপ। টিআরএম চলাকালীন সময়ে স্থানীয় শ্রমজীবী মানুষের জীবিকা ব্যাহত হয়। এই সাময়িক কষ্ট লাঘবের জন্য সরকারকে বিশেষ জীবিকা-উন্নয়নমূলক প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ, বিকল্প কর্মসংস্থান এবং সহজশর্তে ঋণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কোনো স্বার্থান্বেষী মহল মানুষের অভাবকে পুঁজি করে আন্দোলন উসকে দিতে না পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের একার পক্ষে এই বিশাল বহুমুখী সমস্যা সমাধান করা কঠিন। অনেক সময় ওপর মহলের নির্দেশে বা কারিগরি সীমাবদ্ধতার কারণে তারা শুধু ড্রেজিং বা শর্ট-টার্ম সমাধানে মনোযোগী হয়। কিন্তু ভবদহ সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য প্রয়োজন একটি স্বাধীন এবং উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সংস্থা।
গবেষণাটি একটি স্বতন্ত্র ‘উপকূলীয় টেকসই ব্যবস্থাপনা কমিশন’ (CSCD) গঠনের প্রস্তাব দিচ্ছে। এই কমিশন হবে অংশগ্রহণমূলক এবং এতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, পরিবেশবিদ, বিশেষজ্ঞ এবং অংশীজনদের প্রতিনিধিত্ব থাকবে। এই কমিশন শুধু পানি নিষ্কাশন নয়, বরং ভূমি ব্যবস্থাপনা, মৎস্য চাষ ও পরিবেশ সংরক্ষণের মধ্যে একটি আন্ত খাত সমন্বয় নিশ্চিত করবে।
ভবদহ জলাবদ্ধতা শুধু যশোর বা খুলনার সমস্যা নয়, এটি জাতীয় অর্থনীতির ওপর এক বিশাল বোঝা। বছরের পর বছর ড্রেজিংয়ের নামে হাজার কোটি টাকা খরচের চেয়ে একটি টেকসই প্রাকৃতিক পদ্ধতি বাস্তবায়ন করা অনেক বেশি সাশ্রয়ী ও যুক্তিসংগত। প্রকৃতি তার নিজের পথ নিজেই তৈরি করে নেয়, আমাদের কাজ শুধু সেই পথে বাধা না হয়ে বরং সহায়তা করা।
ভবদহ সমস্যার টেকসই সমাধান হতে পারে জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার বিশ্বের অন্যান্য বদ্বীপ অঞ্চলের জন্য এক অনন্য অনুসরণীয় মডেল। এখন প্রয়োজন শুধু দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির সঠিক প্রয়োগ।
লেখক : অধ্যাপক, অর্থনীতি ও আঞ্চলিক পরিকল্পনা, বুয়েট
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


ইরান যুদ্ধ গুঁড়িয়ে দিয়েছে আমিরাতের উচ্চাকাঙ্ক্ষা