জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বা প্রতিদ্বন্দ্বিতার সমতা নিশ্চিত করার বিষয়টি কেবল একটি আদর্শিক আলোচনা নয়; এটি একটি রাষ্ট্র কতটা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ধারণ করে, তার সবচেয়ে বড় ব্যবহারিক মাপকাঠি। কিন্তু চব্বিশের মহান জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে যখন একজন জুলাইযোদ্ধা ও সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদীর মতো একজন আলোচিত ব্যক্তিকে প্রকাশ্যে গুলিবর্ষণের শিকার হতে হয়, তখন এই প্রশ্নটি আরো গভীর ও জরুরি হয়ে ওঠে—আমরা কি গণতন্ত্রের পথে আছি, নাকি ক্ষমতার একতরফা প্রয়োগের ‘রণক্ষেত্রে’ প্রবেশ করছি?
লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বলতে কেবল প্রার্থীর জন্য সমান প্রচারণার সুযোগ বোঝায় না; এটি গণতন্ত্রের মূল স্পিরিটকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য অপরিহার্য। এর সাফল্যের জন্য তিনটি মৌলিক স্তম্ভ রয়েছে—
ক. নিরাপত্তার সমতা
গণতন্ত্রে প্রার্থীর প্রধান অধিকার হলো নির্ভয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা। যখন কোনো কোনো প্রার্থী নিরাপত্তার অভাবে স্বাভাবিক প্রচারও করতে পারেন না, অথচ অন্য অনেকে প্রশাসনের ছত্রছায়ায় অবাধে বিচরণ করেন, তখন এই সমতা ভেঙে পড়ে। শরীফ ওসমানের ওপর হামলা সরাসরি ইঙ্গিত করে, রাষ্ট্র তার সব নাগরিক ও প্রার্থীর জন্য ‘ভীতিমুক্ত পরিবেশ’ নিশ্চিত করতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। নির্বাচন কমিশন যদি প্রার্থীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারে, তবে এটি ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তোলে, যা ভোটারভীতি সৃষ্টি করে।
খ. সম্পদের সমতা
নির্বাচনের মূল লড়াই হওয়া উচিত নীতির, অর্থের বা পেশিশক্তির নয়। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডে সরকারি বা রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপব্যবহার বন্ধ করা বাধ্যতামূলক। অনেক প্রার্থী যখন রাষ্ট্রীয় সুবিধা ব্যবহার করে বিলবোর্ড, প্রচারের স্থান ও মিডিয়ার সুবিধা একচেটিয়াভাবে ভোগ করে, তখন অন্য প্রার্থীরা অর্থনৈতিকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়েন। এটি দরিদ্র বা স্বতন্ত্র প্রার্থীর জন্য অসম প্রতিযোগিতা তৈরি করে এবং নির্বাচনকে ‘অর্থের খেলা’য় পরিণত করে। এই বৈষম্য দূর না হলে জনমতের প্রতিফলনকারী সরকার গঠন করা কঠিন।
গ. আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ
এটি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন বা সহিংসতার ক্ষেত্রে প্রশাসনকে অবশ্যই দল, ক্ষমতা বা পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করতে হবে। যখন দেখা যায়, এক পক্ষের অপরাধের ক্ষেত্রে প্রশাসন নীরব থাকে আর অন্য পক্ষের সামান্য ভুলের ক্ষেত্রে কঠোর পদক্ষেপ নেয়, তখন সাধারণ মানুষ আইনের শাসনের ওপর আস্থা হারায়। এই পক্ষপাতিত্ব কেবল নির্বাচনের ফলাফলকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে না, এটি রাষ্ট্রকে তার মৌলিক নিরপেক্ষতা থেকে বিচ্যুত করে।
আস্থার ক্ষয় ও গণতন্ত্রের ঝুঁকি
ভোটারদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হলে গণতন্ত্রের মৃত্যু ঘটে। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের অনুপস্থিতি দুটি গুরুতর সামাজিক ক্ষতি সাধন করে—
ক. ভোটারদের ভীতি ও নিরুৎসাহ : যখন ভোটাররা দেখেন, তাদের পছন্দের প্রার্থীর ওপর হামলা হচ্ছে বা তাকে প্রচারণায় বাধা দেওয়া হচ্ছে, তখন তারা ধরে নেন—ভোটকেন্দ্রে তাদের নিরাপত্তা নেই। এই ভীতি নীরব সহিংসতা (Silent Violence) তৈরি করে, যা ভোটারদের ভোটকেন্দ্র থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। ফলে যারা পেশিশক্তি প্রয়োগ করে এবং তাদের হাতে ক্ষমতা চলে যায়, যা জনমতের প্রতিফলন ঘটায় না।
খ. গণতন্ত্রের প্রতীকী মূল্য হ্রাস : লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত না হলে নির্বাচন ব্যবস্থা বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এর গ্রহণযোগ্যতা কমে যায়। দেশের জনগণ মনে করে, এই নির্বাচন কেবল ক্ষমতা ধরে রাখার একটি কৌশল, জনগণের ইচ্ছাপূরণের মাধ্যম নয়। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের ওপর এই অনাস্থা দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকিস্বরূপ।
রাষ্ট্রযন্ত্রের চ্যালেঞ্জ ও করণীয়
বর্তমান পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনকে মনে রাখতে হবে, তাদের কাজ কেবল ভোটের দিন ব্যবস্থাপনা নয়, বরং ভোটের পুরো প্রক্রিয়াটিকে পক্ষপাতমুক্ত রাখা। এজন্য সন্ত্রাসীদের নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে হবে।
যেকোনো প্রার্থীর নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে বা প্রচারকাজে বাধা দেওয়া হলে দ্রুত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে। নিরপেক্ষতা বজায় রাখা কেবল একটি দায়িত্ব নয়, এটি গণতন্ত্রের প্রতি প্রশাসনের শপথ।
আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, একটি সুষ্ঠু নির্বাচন কেবল সরকার পরিবর্তনের মাধ্যম নয়, এটি দেশের গণতন্ত্রের টিকে থাকার মৌলিক ভিত্তি। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা মানেই হলো, সব প্রার্থীর জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতার পথ সুগম করা, সব ভোটারের জন্য ভীতিমুক্ত পরিবেশ তৈরি করা। জাতি আজ অধীর আগ্রহে প্রশাসনের সেই দৃঢ় ও সাহসী পদক্ষেপের অপেক্ষায়, যা নিশ্চিত করবে—এবারের নির্বাচন ক্ষমতার লড়াই নয়, গণতন্ত্রের বিজয়।
লেখক : শিক্ষক, কুতুবদিয়া, কক্সবাজার
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

