মন্তব্য প্রতিবেদন

ভারতীয় আধিপত্যবাদী নীতি বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে প্রধান বাধা

Mahmudur Rahman
মাহমুদুর রহমান

ভারতীয় আধিপত্যবাদী নীতি বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে প্রধান বাধা

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে আমাদের সহায়তার পেছনে ভারতের উদ্দেশ্য ছিল তাদের পূর্ব সীমান্তে ভুটানের চেয়েও সামরিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে দুর্বল একটি নামমাত্র স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা, যার নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি দিল্লির হাতে থাকবে।

বাংলাদেশের সীমান্তসংলগ্ন ভারতের শিলিগুড়ি করিডর বা ‘চিকেন নেক’ সম্পৃক্ত নিরাপত্তা হুমকি কমানোর জন্য পাকিস্তানকে দ্বিখণ্ডিত করে পূর্ব অংশে একটি বশংবদ রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তা ১৯৬২ সালের যুদ্ধে চীনের কাছে পর্যুদস্ত হওয়ার পর থেকেই দিল্লি বিশেষভাবে অনুভব করছিল।

বিজ্ঞাপন

মাত্র কয়েকদিনের যুদ্ধে চীনের সেনাবাহিনী চমকপ্রদ গতিতে অরুণাচল পার হয়ে আসাম পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। চীনের সঙ্গে যুদ্ধে শোচনীয় পরাজয়ের ফলে ভারতীয় সমরবিদরা বুঝতে পেরেছিলেন যে, ভবিষ্যতের যুদ্ধে চীন মাত্র ২০ কিলোমিটার প্রস্থের ‘চিকেন নেক’ কেটে দিলেই ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাত রাজ্য মূল ভূখণ্ড থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। অরুণাচল প্রদেশের সীমানা নিয়ে ভারতের সঙ্গে চীনের বিরোধ সেই ১৯৪৭ সাল থেকেই চলছে।

সুতরাং, বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম পরিবহনের জন্য একটি করিডোর ব্যবহারের সুযোগ না পেলে বিশ্বশক্তি চীনের সঙ্গে যুদ্ধে ভারতের পক্ষে দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে রক্ষা করা কঠিন। নেপাল এবং ভুটানের সঙ্গে চীনের ক্রমবর্ধমান সম্পর্ক দিল্লির শিরঃপীড়া বাড়াচ্ছে। বলতে গেলে কাশ্মীর থেকে ‘চিকেন নেক’ পর্যন্ত চীন ভারতকে ঘিরে ধরেছে। এসব কারণেই ট্রানজিটের নামে করিডোর দেওয়ার জন্য ১৯৭২ সাল থেকেই বাংলাদেশের ওপর ভারত নানাভাবে চাপ দিয়ে এসেছে।

আমাদের স্বাধীনতা প্রাপ্তির মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবের একদলীয় বাকশাল সরকারের রক্তাক্ত পতন হলে দিল্লির পরিকল্পনা দীর্ঘ সময়ের জন্য ভেস্তে গিয়েছিল। বাংলাদেশের রাজনীতিতে তুমুল জনপ্রিয় জেনারেল জিয়ার আবির্ভাব ভারতীয় আগ্রাসনের মোকাবিলা করে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় জনগণকে অনুপ্রাণিত করেছিল। শেষ পর্যন্ত ২০০৯ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তৎকালীন ‘বশীভূত’ জেনারেলদের সহায়তায় এবং সেই সময়ের ‘ইসলামোফোবিক’ ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মার্কিন সমর্থনে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় এনে ভারতের শাসকশ্রেণি তাদের উদ্দেশ্য বেশ বিলম্বে হলেও সফল করতে সক্ষম হয়।

শেখ হাসিনার ১৫ বছরের ফ্যাসিস্ট শাসনকালে বাংলাদেশ ভারতের অলিখিত উপনিবেশে পরিণত হয়েছিল। দিল্লির শাসকরা যে তখন ঢাকার সরকারের প্রকৃত মনিবে পরিণত হয়েছিলেন, এ নিয়ে শেখ হাসিনা এবং তার মন্ত্রীদের মধ্যে কোনোরকম লজ্জাশরমের বালাই ছিল না। হাসিনা চ্যালেঞ্জ করে বলেছিলেন, তিনি ভারতকে যা দিয়েছেন তা আর কেউ দিতে পারবে না।

তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মোমেন ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে স্বামী-স্ত্রীর অম্লমধুর সম্পর্ক আবিষ্কার করেছিলেন। শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনির ভাষ্য ছিল, ভারত প্রশ্নে বাংলাদেশে জনমতের নাকি এতটাই পরিবর্তন হয়েছে যে, ভারতকে ট্রানজিট দেওয়ার ঘোষণা প্রকাশ্যে দিলেও তার বিরুদ্ধে দেশে কোনো প্রতিবাদ হয় না! অন্যান্য আওয়ামী ফ্যাসিস্ট নেতারাও ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ককে রক্তের বাঁধন, চিরায়ত বন্ধুত্ব, অভিন্ন সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ, ইত্যাদি নামে অভিহিত করতেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আবরণে সেনাবাহিনীসহ বাংলাদেশের সর্ব সেক্টরে ভারতীয়করণকে জায়েজ করে ফেলা হয়েছিল।

বাংলাদেশ কার্যত ভারতীয় নিরাপত্তা বেষ্টনীর একেবারে ভেতরে ঢুকে গিয়েছিল। দেশের সেনাপ্রধান কে হবেন তার চূড়ান্ত অনুমোদনও নাকি দিল্লি থেকে আসত। ডিজিএফআইয়ের প্রধান কার্যালয়ে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ যে অফিস খুলে বসেছিল, তার স্বীকারোক্তি একজন সাবেক সেনাপ্রধান আদালতে দিয়েছেন। ২০২৪-এর মহান জুলাই বিপ্লবে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ এদেশের নিরস্ত্র তরুণ ও কিশোর প্রজন্ম কেবল প্রবল সাহসে ভর করে মাত্র ৩৬ দিনের অসম লড়াইয়ে দিল্লির সেই দীর্ঘ প্রচেষ্টার সাজানো বাগান উপড়ে ফেলতে সমর্থ হয়েছে। আবু সাঈদ, মুগ্ধ, ইয়ামিন, আনাস, নাফিজ ও ওয়াসিমদের শাহাদতের বিনিময়ে আমরা পুনরায় স্বাধীন হয়েছি।

শেখ হাসিনার ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের পরাধীনতার শৃঙ্খলমুক্তি দিল্লি আজ পর্যন্ত মেনে নিতে পারেনি। ড. ইউনূসের দেড় বছরের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শুরু থেকেই ভারত সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে সর্বপ্রকারে অসহযোগিতা করেছে। তারা বাংলাদেশের নাগরিকদের ভিসা দেওয়া বন্ধ করেছে, বাংলাদেশে চাল, ডাল, পেঁয়াজ ইত্যাদি পণ্যের রপ্তানি আটকে দিয়ে এখানে খাদ্যসামগ্রীর কৃত্রিম অভাব তৈরি করার চেষ্টা চালিয়েছে, আমাদের তৈরি পোশাক রপ্তানি বাধাগ্রস্ত করার জন্য দিল্লি থেকে বিমানে ট্রানজিট সুবিধা স্থগিত করেছে, ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে হিন্দুত্ববাদীরা বাংলাদেশ দূতাবাসে আক্রমণ করেছে, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশবিরোধী অপপ্রচার চালিয়েছে এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পরাজিত ফ্যাসিস্ট শক্তি ও ভারতীয় এজেন্টদের দিয়ে বিভিন্নভাবে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করেছে। দেশের জনগণ উপরোক্ত হুমকি সম্পর্কে মোটামুটি সজাগ থাকায় আমাদের ভালোয় ভালোয় গণতান্ত্রিক উত্তরণ ঘটেছে।

১৭ বছরের নির্বাসন শেষে গত বছর ২৫ ডিসেম্বর বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশে ফিরলে দিল্লি নানাভাবে ইঙ্গিত দিচ্ছিল যে, নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে তারা পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটাতে ইচ্ছুক। এদিক থেকেও সদিচ্ছার কোনো অভাব পরিলক্ষিত হয়নি। একথা সর্বজনবিদিত যে, ২০১৫ সালের পর থেকেই বিএনপি ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ার যথাসাধ্য চেষ্টা করেছে। কিন্তু এক হাসিনার ঝুড়িতে সব ডিম ঢেলে দিয়ে নিশ্চিন্ত মোদি সরকার বিএনপির সেই উদ্যোগের প্রতি কোনোরকম উৎসাহ দেখায়নি।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট হাসিনা পুরোনো আস্তানা দিল্লিতেই পালিয়ে গেলে বাংলাদেশে তারেক রহমানের নেতৃত্ব মেনে নেওয়া ছাড়া ভারতের রাজনৈতিক ও সামরিক ‘এস্টাবলিশমেন্টের’ কাছে আর কোনো দ্বিতীয় বিকল্প ছিল না। আওয়ামী লীগের অবর্তমানে জামায়াত এবং এনসিপির তুলনায় বিএনপিকেই ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির পক্ষে মেনে নেওয়া সহজ ছিল। সুতরাং, ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর ভারত তার শক্তির অন্ধ অহমিকা পরিত্যাগ করে আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা মেনে নিলে বাংলাদেশের সঙ্গে সুপ্রতিবেশীমূলক সম্পর্ক স্থাপন হয়তো সহজ হতো। কিন্তু কথায় আছে না, স্বভাব যায় না মলে, ইত্যাদি ইত্যাদি।

আমাদের বৃহৎ প্রতিবেশী দেশটি ১৯৪৭ সাল থেকেই দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভু বনে যাওয়ার স্বপ্নেই বিভোর হয়ে আছে। বিগত প্রায় আট দশকে অর্থনীতি এবং সামরিক সক্ষমতায় চীন বিশ্বের দ্বিতীয় প্রধান শক্তিধর রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে এবং পাকিস্তান পারমাণবিক বোমা বানিয়ে ফেললেও ভারতের অক্ষম দাদাগিরি স্বভাবের কোনো পরিবর্তন হয়নি। বিশ্বের যে কোনো অঞ্চলের প্রভাবশালী দেশগুলোর মধ্যে ভারত এমন এক আশ্চর্য ব্যতিক্রম, যার সঙ্গে কোনো প্রতিবেশীর সুসম্পর্ক নেই। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে যে, দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সব রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ভারত সামরিক আগ্রাসন চালিয়েছে। দেশটির সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড থেকেও প্রতীয়মান হচ্ছে যে, আগের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ সরকারের ওপর নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করে দিল্লি তার আধিপত্যবাদী নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত রাখতে চায়। পশ্চিমবঙ্গ এবং আসামের সাম্প্রতিক নির্বাচনে বিজেপি মূলত মুসলমান এবং বাংলাদেশবিরোধী প্রচারণা চালিয়ে জয়লাভ করেছে।

আমাদের দুই প্রতিবেশী ভারতীয় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদ্বয়, শুভেন্দু অধিকারী ও হিমন্ত বিশ্বশর্মা, প্রতিটি নির্বাচনি বক্তৃতায় বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করেছেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাদের কূটনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত বক্তব্যে লাগাম টানার পরিবর্তে কদিন আগে কলকাতার জনসভায় নিজেও মুখ্যমন্ত্রীদের আক্রমণাত্মক কথার প্রতিধ্বনি করেছেন। পশ্চিমবঙ্গের একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী ওই রাজ্যের মুসলমানদের উদ্দেশ করে এটা পর্যন্ত বলেছেন যে, নামাজ পড়তে হলে নাকি বাংলাদেশ কিংবা পাকিস্তানে চলে যেতে হবে। বাংলাদেশের কোনো মন্ত্রী যদি বলতেন, পূজা করতে হলে আমাদের দেশের হিন্দু নাগরিকদের ভারতে চলে যেতে হবে, তাহলে আমি নিশ্চিত যে, সেই মন্ত্রীকে সরকার শুধু বরখাস্তই করতো না, তার সংসদ সদস্য পদও চলে যেত। বিজেপির রাজনীতিবিদদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক উগ্রবাদ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, তারা ভারতের সংবিধানে প্রদত্ত নাগরিকের ধর্ম পালনের স্বাধীনতাও অস্বীকার করছে।

ভারতের বিভিন্ন অংশে মসজিদ ভাঙার রীতিমতো উৎসব চলছে। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর অব্যাহত নির্যাতনের অপরাধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভারতকে কালোতালিকাভুক্ত করা হয়েছে। ওদিকে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বিএসএফ অহরহ বাংলাদেশের নাগরিকদের গুলি করে হত্যার পাশাপাশি ভারতের বাংলা ভাষাভাষী মুসলমান নারী, পুরুষ ও শিশুদের অমানবিকভাবে বাংলাদেশে পুশব্যাকের চেষ্টা চালাচ্ছে। আমাদের বিজিবি এবং নাগরিকদের পুশব্যাক ঠেকাতে দিনরাত সীমান্ত অঞ্চলে পাহারা দিতে হচ্ছে। এতসব অপকর্মের সঙ্গে তাল মিলিয়ে মোদির আশ্রয়ে থেকে শেখ হাসিনা এবং অন্যান্য পলাতক আওয়ামী নেতাকর্মীদের বাংলাদেশবিরোধী তৎপরতার মাত্রাও বেড়েছে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরেও আওয়ামী লীগের এজেন্ট ও হিন্দুত্ববাদীরা নাশকতা ও উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া ও চীন সফরের আগে উদ্দেশ্যমূলকভাবে দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির জন্য ভারতীয় এজেন্টরা বিশেষভাবে তৎপর হয়েছে। নতুন করে সংখ্যালঘু কার্ড খেলা হচ্ছে।

আশার কথা হলো, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ভারতের প্রভাব ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং গণমাধ্যমের সব আন্তর্জাতিক সূচকে ভারতের গ্রাফ নিম্নমুখী হওয়ায় গণতন্ত্রের লেবাসে ভারতের উগ্র সাম্প্রদায়িক, স্বৈরাচারী এবং আধিপত্যবাদী চেহারাটা পশ্চিমা বিশ্ব ধরে ফেলেছে। একঘরে জায়োনিস্ট ইসরাইল এবং মুসলিম বিশ্বে বিভীষণ ছাড়া ভারতের আর কোনো বন্ধু নেই। দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বে পাকিস্তানকে একঘরে করার ভারতীয় চেষ্টা বুমেরাং হয়ে এখন উল্টো ভারতকেই আঘাত করেছে। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ বন্ধে পাকিস্তানের কূটনৈতিক মধ্যস্থতা সফল হওয়ায় দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের একাধিপত্যের অবসান হয়েছে বলা যেতে পারে।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী এবং সেনাপ্রধান যখন জেনেভায় কাতারের প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে মিলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার শান্তি আলোচনায় মধ্যস্থতা করছেন, তখন স্বঘোষিত বিশ্বগুরু ভারত আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিতে প্রায় অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। উপরোক্ত প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের ‘আঞ্চলিক গুন্ডার’ ভূমিকায় অবতীর্ণ পার্শ্ববর্তী দেশটিকে তোয়াজ করার কোনো কারণ দেখি না। ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক স্থাপনে সফল হওয়ায় এতদিন ধরে দিল্লির চশমায় বাংলাদেশকে দেখার বৈদেশিক নীতি থেকেও ওয়াশিংটন দৃশ্যত সরে এসেছে। এছাড়া চীনের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার যে উদ্যোগ প্রফেসর ইউনূস গ্রহণ করেছিলেন, বর্তমান সরকার তা অব্যাহত রেখেছে। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে তুরস্ক, মালয়েশিয়া এবং পাকিস্তানসহ মুসলিম বিশ্বের সঙ্গেও বাংলাদেশের সম্পর্ক দৃঢ় হয়েছে। সব মিলিয়ে ভারতের আগ্রাসী তৎপরতাকে মোকাবিলা করার মতো অবস্থানে আমরা পৌঁছাতে পেরেছি।

অবশ্যই ভারত পারমাণবিক শক্তিধর আমাদের প্রতিবেশী দেশ। তাছাড়া ঐতিহাসিক কারণেই ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। সুতরাং, দুই দেশের মধ্যে কোনো বৈরী সম্পর্ক থাকুক সেটা ভারত এবং বাংলাদেশের কোনো বুদ্ধিমান ও বাস্তববাদী নাগরিকের কাম্য হতে পারে না। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকেই ভারতীয় শাসকশ্রেণির আমাদের দেশকে অলিখিত উপনিবেশে পরিণত করার অন্যায় আকাঙ্ক্ষা থেকেই যাবতীয় বিরোধের সূত্রপাত হয়েছে। দেশটির রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে একটি অহংবোধ সর্বদা কাজ করেছে যে, যেহেতু বাংলাদেশের স্বাধীনতাপ্রাপ্তিতে ভারতের অবদান রয়েছে, তাই আমাদেরকে সবসময় নতজানু হয়ে থাকতে হবে।

এই আবদারের ফলে দুটি স্বাধীন দেশের সার্বভৌমত্ব মেনে নিয়ে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের ভিত্তিতে যে সম্পর্ক বিকশিত হওয়ার কথা ছিল, সেটি সম্ভব হয়নি। তদুপরি, আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব এবং এদেশের তথাকথিত সেক্যুলার শ্রেণির অতিমাত্রায় ভারতপ্রীতিও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে জটিল করেছে। এই শ্রেণি সর্বদা বাংলাদেশের স্বার্থকে উপেক্ষা করে ভারতের সব চাহিদা পূরণ করতে চেয়েছে। ফলে স্বাধীনতা যুদ্ধের পর থেকে একমাত্র আওয়ামী লীগকেই ভারত যেকোনো মূল্যে এদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় দেখতে চেয়েছে। পুরো দেশের জনগণের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক সৃষ্টির পরিবর্তে দিল্লি সবসময় একটি দলের ওপর নির্ভর করেছে। ভারতের শাসকশ্রেণির এই সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ছাড়া দুই রাষ্ট্রের মধ্যে সৎ প্রতিবেশীমূলক সম্পর্ক গড়ে ওঠা সম্ভব নয়। সে পর্যন্ত ভারতের ক্রমাগত আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আমাদের সতর্ক এবং ঐক্যবদ্ধ থাকা প্রয়োজন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন