দুবাইয়ের খাঁচায় এক ‘ফ্রাংকেনস্টাইন’ এবং একটি চিঠির হাহাকার

কমডোর জসীম উদ্দীন ভূঁইয়া (অব.)
কমডোর জসীম উদ্দীন ভূঁইয়া (অব.)

দুবাইয়ের খাঁচায় এক ‘ফ্রাংকেনস্টাইন’ এবং একটি চিঠির হাহাকার

ক্ষমতা ও দম্ভের যুগে বসে যিনি একসময় পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকে হাতের পুতুল ভাবতেন, সেই প্রতাপশালী সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের পতন আজ ইতিহাসের নির্মম পরিহাস। ২০২৬ সালের ১২ জুন দুবাইয়ে ইন্টারপোলের রেড নোটিসে গ্রেপ্তার হন তিনি। সাধারণ মানুষ আজ তার দুর্নীতির পাহাড় দেখে চমকে উঠলেও, পর্দার আড়ালে কীভাবে এক সুনির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক ‘সুরক্ষাকবচ’ ভেঙে এই দানব তৈরি করা হয়েছিল, তা এখনো এক অপ্রকাশিত অধ্যায়। অথচ এই বিপর্যয়ের পূর্বাভাস অনেক আগেই সরকারের উচ্চপর্যায়ে পাঠানো চিঠিতে নথিবদ্ধ ছিল। সেই নীতিগত প্রস্তাবনা মানলে আজ এই কলঙ্কজনক অধ্যায় এড়ানো যেত। নিয়মের সেই ব্যত্যয় কীভাবে একটি এলিট ফোর্সকে পথভ্রষ্ট করে ক্ষমতার মোহে অন্ধ এক ‘ফ্রাংকেনস্টাইন’ তৈরি করল, তা জানতে আমাদের ফিরে যেতে হবে এর জন্মলগ্নে।

র‍্যাব গঠন এবং একটি অপরিহার্য এলিট ফোর্সের জন্ম

বিজ্ঞাপন

২০০৩-০৪ সালের দিকে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যখন চরম অবক্ষয়ের তলানিতে, তখন রাজনৈতিক চাপ ও নৈতিক স্খলনের কারণে তা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয় প্রথাবদ্ধ পুলিশ বাহিনী। এই সংকটকালে, শীর্ষ সন্ত্রাসী ‘কালা ফারুক’ হত্যাকাণ্ডের পর তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর একটি বিশেষায়িত ফোর্স গঠনের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেন। এর প্রথম প্রয়াস ‘র‍্যাট’ (RAT) পুলিশের কর্মকর্তাদের শারীরিক অযোগ্যতার কারণে ব্যর্থ প্রজেক্টে পরিণত হয়। এই ব্যর্থতার পটভূমিতেই সেনাবাহিনীর কঠোর শৃঙ্খলা ও রণকৌশলকে কাজে লাগিয়ে জন্ম নেয় এলিট ফোর্স ‘র‍্যাব’, যার নেপথ্য আইন ও নীতি প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এনএসআই ও ডিজিএফআই।

তবে শুরু থেকেই র‍্যাবে সামরিক বাহিনীর এই আধিপত্যকে পুলিশ তাদের প্রাতিষ্ঠানিক আত্মসম্মানে আঘাত হিসেবে দেখে, যার ফলে শীর্ষ স্তর থেকে একধরনের মনস্তাত্ত্বিক অসহযোগিতা শুরু হয়। এনএসআইয়ের সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তখন সরকার একটি কৌশলগত পাল্টা ভারসাম্য তৈরি করে। সেই সমীকরণ অনুযায়ী, প্রাথমিকভাবে মহাপরিচালকের পদটি সেনাবাহিনীর জন্য নির্ধারিত থাকলেও, পুলিশের ক্ষোভ প্রশমনে তা অতিরিক্ত আইজিপি আনোয়ার ইকবালকে দেওয়া হয়। তবে বাহিনীর মূল অপারেশনাল মেরুদণ্ড ও কঠোর সামরিক চেইন অব কমান্ড বজায় রাখতে অতিরিক্ত মহাপরিচালক (ADG-Operations) পদটি সম্পূর্ণভাবে সেনাবাহিনীর (তৎকালীন কর্নেল মিল্লাত) হাতেই ন্যস্ত রাখা হয়।

‘২ বছরের প্রেষণ নীতি’ : ফাইলে নিশ্চিত করা সেই অমোঘ সুরক্ষাকবচ

র‍্যাব সফলভাবে কার্যক্রম শুরু করার পর বাহিনীর অভ্যন্তরীণ সততা ও পেশাদারিত্ব আজীবন অক্ষুণ্ণ রাখতে এনএসআই একটি বিশেষ নীতিগত প্রস্তাবনা তৈরি করে, যা সরকারের উচ্চপর্যায়ে পাঠানো হয়েছিল। সেই ফাইলে একটি অমোঘ সুরক্ষাকবচ যুক্ত ছিল, তা হলো, র‍্যাবে প্রেষণে আসা কোনো কর্মকর্তা বা জোয়ানের কাজের মেয়াদ কোনোভাবেই যেন ‘২ বছর’-এর বেশি না হয়।

সাধারণত সব বাহিনীতে পোস্টিংয়ের মেয়াদ সর্বোচ্চ তিন বছর হলেও, র‍্যাবের ক্ষেত্রে তা কঠোরভাবে ‘২ বছর’ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছিল। এর একমাত্র কারণ ছিল, কোনো সংবেদনশীল পদে দীর্ঘদিন থাকলে কর্মকর্তারা যেন স্থানীয় অপরাধী চক্র, রাজনীতি বা দুর্নীতির সিন্ডিকেটে জড়াতে না পারেন। দুই বছর পর মূল বাহিনীতে ফিরে গেলে কোনো স্থায়ী কায়েমি স্বার্থ তৈরি হওয়ার সুযোগ থাকে না।

জিয়ার দীর্ঘমেয়াদি প্রেষণ ও প্রাতিষ্ঠানিক পঙ্গুত্ব

চেইন অব কমান্ড ভেঙে জিয়াকে র‍্যাবের ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের ডিরেক্টর, এডিজি অপারেশনস ও ভারপ্রাপ্ত ডিজির দাপুটে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এরপর এনএসআই এবং পরে এনটিএমসির মহাপরিচালক হিসেবে ২০২৪ সালের পতন পর্যন্ত তিনি চেয়ার আঁকড়ে রাখেন। সামরিক বাহিনীর বাইরে একটানা ১৫ বছর প্রেষণে কাটানোর এ ঘটনা সামরিক ইতিহাসে একটি নজিরবিহীন রেকর্ড।

সামরিক মানদণ্ডে জিয়া যে অত্যন্ত সাধারণ মানের অফিসার ছিলেন, তা ট্রাইব্যুনালে সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল ইকবাল করিম ভূঁইয়ার সাক্ষ্যেই প্রমাণিত। তিনি জানান, জিয়া স্টাফ কলেজ সম্পন্ন করার যোগ্যতাই অর্জন করেননি, যা লে. কর্নেল পদের জন্য আবশ্যক; এমনকি তিনি কোনো ব্যাটালিয়নও কমান্ড করেননি, যা কর্নেল পদের পূর্বশর্ত। সাবেক সেনাপ্রধানের মতে, পদোন্নতি বোর্ডের অনেক সদস্য তখন নিজেদের ভবিষ্যৎ স্বার্থের কথা চিন্তা করে জিয়ার এই মারাত্মক প্রাতিষ্ঠানিক অযোগ্যতা ও নিয়মের ব্যত্যয়কে চোখ বুজে সায় দিয়েছিলেন। নিজের মূল বাহিনীর কোনো প্রথাগত ফর্মেশন কমান্ড না করেই জিয়ার এই উল্কাগতির উত্থান সশস্ত্র বাহিনীর চৌকস ও পেশাদার অফিসারদের মধ্যে চরম হতাশা এবং ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল, যা স্পষ্ট প্রমাণ করে কীভাবে রাজনৈতিক অপশক্তি দ্বারা সামরিক বাহিনীর নিজস্ব স্বায়ত্তশাসন এবং পেশাদার মূল্যায়ন প্রক্রিয়াকে পঙ্গু ও কুক্ষিগত করা হয়েছিল।

বেনজীরের আগমন ও সেনাবাহিনীর অপারেশনাল ডমিনেশন ছিনতাই

জিয়া যখন র‍্যাবের ভেতর তার শিকড় শক্ত করছিলেন, ঠিক সেই সময়ে ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে র‍্যাবের মহাপরিচালক হিসেবে যোগ দেন বেনজীর আহমেদ। চতুর বেনজীর র‍্যাবে এসেই এই রাজনৈতিক সমীকরণের পূর্ণ সুযোগ নেন এবং পাঁচ বছরেরও বেশি সময় পদ আঁকড়ে ধরে রাজত্ব করেন।

র‍্যাবের জন্মলগ্ন থেকে ক্ষমতার যে একটি অলিখিত ভারসাম্য (Balance of Power) ছিল, যেখানে সেনাবাহিনী থেকে আসা এডিজি এবং তার টিমের অপারেশনাল ও ফিল্ড ডমিনেশন অক্ষুণ্ণ থাকার কথা ছিল, বেনজীর এসে সেই নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ নিজের মুঠোয় ছিনতাই করে নেন। তিনি এডিজির চেইন অব কমান্ডকে কার্যত অকেজো ও ঠুঁটো জগন্নাথে পরিণত করেন।

সেনাবাহিনী থেকে আসা চৌকস অফিসারদের সুকৌশলে সাইডলাইন করে, তিনি জিয়ার দীর্ঘস্থায়ী অবস্থান ও শক্তিশালী রাজনৈতিক কানেকশনকে নিজের স্বার্থে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন। বেনজীর এবং জিয়ার এই যৌথ ছত্রছায়ায় র‍্যাবে এক ভয়ংকর ও কলঙ্কিত চেইন অব কমান্ড তৈরি হয়, যার চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটে পরবর্তী বছরগুলোয় শত শত মানুষের গুম ও পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে।

ক্ষমতার মোহে অন্ধত্ব : রাষ্ট্রপ্রধানের চেয়েও ‘পরিচিত’ হওয়ার দম্ভ

ক্ষমতার মোহে বেনজীর আহমেদ এতটাই বেপরোয়া হয়ে উঠেছিলেন, তৎকালীন রাজনৈতিক মহলে একটি কথা সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল, রাষ্ট্রের যেকোনো বড় নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তের চেয়ে মাঠপর্যায়ে তার কথাই ছিল বেশি প্রভাবশালী। রাষ্ট্রীয় প্রচারযন্ত্র, গণমাধ্যম ও ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে তিনি এই কৃত্রিম দম্ভোক্তিপূর্ণ পরিচিতি তৈরি করেছিলেন।

প্রাতিষ্ঠানিক প্রোটোকল ব্যবস্থা তখন এতটাই নড়বড়ে হয়ে পড়েছিল, উচ্চপর্যায়ের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে একজন পুলিশপ্রধানের উপস্থিতিতে কিছু কিছু মন্ত্রী ও জনপ্রতিনিধিরাও সসম্ভ্রমে দাঁড়িয়ে যেতেন, যা প্রথাগত প্রশাসনিক রীতিনীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী ছিল। একজন প্রজাতন্ত্রের সাধারণ কর্মচারীর সামনে জনপ্রতিনিধি ও মন্ত্রীদের এই নতজানু অবস্থা প্রমাণ করে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নিজের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করতে গিয়ে বেনজীরকে আইনের ঊর্ধ্বে এমন এক দানবীয় জায়গায় বসিয়েছিলেন, যেখানে তিনি পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকে বুড়ো আঙুল দেখানোর সাহস পেয়েছিলেন।

সামরিক ঐতিহ্যকে বৃদ্ধাঙ্গুলি : আইজিপি বনাম সেনাপ্রধানের বিতর্কিত যৌথ বিবৃতি

বেনজীরের এই ক্ষমতার দম্ভ শুধু বেসামরিক প্রশাসনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, তা সরাসরি আঘাত করেছিল দেশের সশস্ত্র বাহিনীর সুদীর্ঘ ঐতিহ্য ও শৃঙ্খলার ওপর। ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স অনুযায়ী, সশস্ত্র বাহিনীর তিন প্রধান ১২ নম্বর আর্টিকেলে উচ্চতর রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ভোগ করেন, যেখানে পুলিশের আইজিপি অবস্থান করেন ১৬ নম্বরে। পাশের দেশ ভারতেও সামরিক প্রধানরা প্রতিমন্ত্রীর সমতুল্য মর্যাদা পান, যা বেসামরিক প্রশাসনের চেয়ে জাতীয় প্রতিরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেয়। কিন্তু তৎকালীন নীতিনির্ধারকদের রাজনৈতিক সমীকরণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার অতি-ব্যবহারের সুযোগ নিয়ে বেনজীর নিজেকে সব নিয়মের ঊর্ধ্বে নিয়ে যান, যা সশস্ত্র বাহিনীর চিরাচরিত মর্যাদার সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক ছিল।

এর চূড়ান্ত ও বিতর্কিত রূপ দেখা যায় ২০২০ সালে টেকনাফে পুলিশের ওসি প্রদীপের হাতে সাবেক মেজর সিনহা হত্যাকাণ্ডের পর। এই নির্মম ঘটনায় সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার উচ্চপর্যায়ের কৌশলগত পদক্ষেপ নেয়। সেই পটভূমিতে, প্রোটোকল অনুযায়ী যেখানে আইজিপির সঙ্গে যৌথ বিবৃতিতে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ একজন মেজর জেনারেলের যাওয়ার কথা ছিল, সেখানে বেনজীর নিজের অবস্থানকে সেনাপ্রধানের সমকক্ষ জাহির করার সুযোগ নেন। সংবাদ সম্মেলনে স্বয়ং সেনাপ্রধানকে পাশে বসিয়ে বেনজীর এমন জঘন্য হত্যাকাণ্ডকে ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ বলে পার পাওয়ার চেষ্টা করেন। একটি সাধারণ অভ্যন্তরীণ বিভাগের প্রধান হয়েও বেনজীরের এমন ধৃষ্টতাপূর্ণ সমকক্ষতা জাহির করার চেষ্টা এবং সেনাপ্রধানকে সেই প্রোটোকল সংকটে ফেলা সশস্ত্র বাহিনীর পেশাদার অফিসারদের গভীরভাবে ক্ষুব্ধ ও অসন্তুষ্ট করেছিল।

প্রাতিষ্ঠানিক বিচ্যুতির খতিয়ান : ভাঙা সুরক্ষাকবচ ও প্রাতিষ্ঠানিক নৈতিকতা

ইন্টেলিজেন্স ফিল্ডের বাস্তব অভিজ্ঞতা শেষে আমি যখন আবার নৌবাহিনীতে ফিরে আসি, তখনই নীতিনির্ধারকদের গুরুত্বের সঙ্গে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলাম, কোনো চরম ব্যতিক্রমী বা বিশেষ কৌশলগত প্রয়োজন ছাড়া কোনো কর্মকর্তাকে যেন দুই বছরের বেশি র‍্যাবে প্রেষণে রাখা না হয়। জুনিয়র অফিসাররা র‍্যাবের অ্যাডভেঞ্চারাস পজিশন সাময়িকভাবে উপভোগ করলেও, দীর্ঘ মেয়াদে তা তাদের মূল পেশাদারিত্ব ও ক্যারিয়ার গঠনে মারাত্মক ক্ষতি করে। সামরিক বাহিনীর মতো একটি উচ্চ-সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানের নৈতিক মানদণ্ড এবং পেশাদার শৃঙ্খলা ধরে রাখতে এই দুই বছরের সময়সীমা কঠোরভাবে বজায় রাখা অপরিহার্য ছিল।

এনএসআইয়ের পক্ষ থেকে এই দূরদর্শী প্রেষণনীতিটি আমার হাত ধরেই আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপন ও ইনিশিয়েট করা হয়েছিল। সেদিন ফাইলের সেই ‘২ বছরের সুরক্ষাকবচকে’ বিন্দুমাত্র সম্মান জানানো হলে আজ ইতিহাস এতটা কলঙ্কিত হতো না এবং কোনো কর্মকর্তা দানব হওয়ার সুযোগ পেত না। এই একটিমাত্র পলিসি লেটার অনুসরণ করলে রাষ্ট্র এক মহাবিপর্যয় থেকে রক্ষা পেত। আগ্রহী পাঠকরা এই নীতির সুগভীর গুরুত্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োজনীয়তার বিবরণ আমার ‘জাতীয় দিশা’ গ্রন্থের ‘র‍্যাব কি পথ হারিয়েছে’ এবং ‘পুলিশ শুধু ঘুস খায় না, দেয়ও’ প্রভৃতি প্রবন্ধগুলো থেকে বিস্তারিত জানতে পারবেন। নীতিনির্ধারকদের এখন উচিত আন্তর্জাতিক উদাহরণ অনুসরণ করে একটি শক্তিশালী মনিটরিং সেল গঠন করা, যা নিয়মিত গোয়েন্দা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কাজ করবে।

নীতিনির্ধারকদের জন্য শিক্ষার ক্রান্তিকাল এবং তিন স্তম্ভের প্রতি নির্দেশনা

ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, কিন্তু ইতিহাসের পাতায় কর্মের দাগ থেকে যায় আজীবন। প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম ভাঙার চড়া মূল্য রাষ্ট্রকে কীভাবে দিতে হয়, বেনজীর ও জিয়ার পতন আজ তার জীবন্ত প্রমাণ। এই প্রবন্ধের মূল লক্ষ্য শুধু সমালোচনা নয়, বরং আন্তর্জাতিক ভালো উদাহরণগুলো অনুসরণ করে আমাদের নীতিনির্ধারক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনা।

এই অধ্যায় থেকে আমাদের রাজনীতিবিদ, সামরিক বাহিনী এবং বেসামরিক আমলাতন্ত্র, তিনটি স্তম্ভেরই গভীর নীতিগত শিক্ষা নেওয়া জরুরি। প্রথমত, রাজনীতিবিদদের বুঝতে হবে যে সাময়িক ফায়দা বা ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য পেশাদার কর্মকর্তাদের আইনের ঊর্ধ্বে তোলা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষাকবচ (Policy Letters) ভাঙার পরিণতি কত বিধ্বংসী হতে পারে। নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে যাদের ক্ষমতার শীর্ষে বসানো হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত তারাই পুরো ব্যবস্থাটিকে গ্রাস করেছিল। ইতিহাসের এক নির্মম পরিহাস যে, খোদ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীকে পর্যন্ত দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে হয়েছিল শুধু সেই প্রাজ্ঞ নীতিগত চিঠি এবং প্রাতিষ্ঠানিক চেইন অব কমান্ডকে অগ্রাহ্য করার কারণে। অন্য কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে, এমনকি আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতেও, নিয়মের এমন আত্মঘাতী লঙ্ঘন চিন্তাই করা যায় না।

দ্বিতীয়ত, সামরিক বাহিনীর জন্য নির্দেশনা হলো, জুনিয়র অফিসারদের সাময়িক রোমাঞ্চের চেয়ে বাহিনীর দীর্ঘমেয়াদি নৈতিকতা, ঐতিহ্য এবং কোর পেশাদারিত্ব রক্ষা করা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। প্রেষণনীতির সুরক্ষাকবচ কঠোরভাবে ধরে না রাখলে বাহিনীর অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে এবং তৃতীয়ত, সিভিল ও পুলিশ প্রশাসনের আগামী প্রজন্মের কর্মকর্তাদের মনে রাখতে হবে, আইনের শাসন, পেশাদারিত্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে মেরুদণ্ড সোজা রেখে সততার পথে চলাই একমাত্র মূলমন্ত্র। পদপদবি বা ক্ষমতার দম্ভ সময়ের স্রোতে একসময় বিলীন হয়ে যায়, কিন্তু নিয়মের আত্মঘাতী লঙ্ঘনের যে বিচার ইতিহাস করে তা এড়ানো অসম্ভব। রাষ্ট্র ও প্রশাসনের ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় আজ আমাদের গভীরভাবে শিক্ষা নিতেই হবে এই ‘বেনজীরের নজির’ থেকে।

লেখক : সাবেক সহকারী নৌবাহিনী প্রধান ও উপ-উপাচার্য বিইউপি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন