২৩ জুন ঘিরে দেশজুড়ে অস্থিরতা তৈরির নীলনকশা আ.লীগের

Waich Quruni
ওয়াসিম সিদ্দিকী

২৩ জুন ঘিরে দেশজুড়ে অস্থিরতা তৈরির নীলনকশা আ.লীগের

ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত এবং পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ আসন্ন তাদের ২৩ জুনের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে এক ধরনের অস্থিরতা ও নাশকতা সৃষ্টির পরিকল্পনা করছে। মাঠপর্যায়ে হঠকারী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি, ঝটিকা মিছিল ও ককটেল বিস্ফোরণের মতো বেআইনি পন্থায় রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করার আওয়ামী ‘নীলনকশা’র তথ্য পেয়েছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।

ইতোমধ্যে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের কয়েকটি স্থানে চোরাগোপ্তা ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে, যা মূলত ২৩ জুনের মূল নাশকতার মহড়া বা ‘ট্রেইলার’ বলে জানাচ্ছেন নিরাপত্তা সংস্থা সংশ্লিষ্টরা। একই সময়ে নতুন উসকানি হিসেবে যুক্ত হয়েছে গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে ‘রামমন্দির’ ইস্যুর মতো আকস্মিক এজেন্ডা। এই ধর্মীয় সেন্টিমেন্টকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে পানি ঘোলা করার অপচেষ্টা চলছে বলে জানা গেছে।

বিজ্ঞাপন

গোয়েন্দা সূত্র বলছে, একদিকে নিষিদ্ধ সংগঠনটির নেতাকর্মীদের চোরাগোপ্তা হামলা ও নৈরাজ্য সৃষ্টির পাঁয়তারা, অন্যদিকে অপ্রাসঙ্গিক একটি ধর্মীয় ইস্যুকে সামনে এনে মাঠ গরম করার চেষ্টা—সবমিলিয়ে আগামী ২৩ জুনকে কেন্দ্র করে এক কৃত্রিম সংকট তৈরির অপকৌশল নেওয়া হয়েছে।

নেপথ্যে নাশকতার নীলনকশা

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, আগামী ২৩ জুনকে কেন্দ্র করে ঢাকা, সাভার ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে চোরাগোপ্তা মিছিল এবং হামলার ছক এঁকেছে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ। গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে, জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করতে তারা ককটেল বিস্ফোরণ ও গাড়ি ভাঙচুরের মতো হঠকারী পথ বেছে নিতে পারে। অন্যদিকে পুলিশ সদর দপ্তরের কনফিডেনসিয়াল শাখার এক চিঠিতে সতর্ক করা হয়েছে যে, ২৩ জুন কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া এই সংগঠনটির সদস্যরা দেশের বিভিন্ন জেলায় তাদের দলীয় কার্যালয়ে পতাকা উত্তোলন এবং ব্যানারসহ রাজপথে প্রকাশ্যে মিছিল বের করতে পারে। এই কর্মসূচির কারণে বিদ্যমান অন্যান্য রাজনৈতিক দল বিশেষ করে এনসিপি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের সঙ্গে সংঘর্ষ তৈরির আশঙ্কা রয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হিসেবে ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ডে বাধা দিলে ওরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর ক্ষুব্ধ হতে পারে।

রাজধানীর ১৫ পয়েন্টে নাশকতার ছক

নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, রাজধানী ঢাকার অন্তত ১৫টি স্পর্শকাতর পয়েন্টে একযোগে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ পয়েন্টগুলো হলোÑমতিঝিল এলাকা, আবরার ফাহাদ এভিনিউ (সাবেক ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউ), যাত্রাবাড়ী ও ডেমরা, টিএসসি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস এলাকা, পান্থপথের বসুন্ধরা সিটি থেকে ধানমণ্ডি-৩২ পর্যন্ত সড়ক, ধানমণ্ডি-৩২ ও ধানমণ্ডি-৩ নাম্বার, কুড়িল বিশ্বরোড, বিজয় সরণি ও আগারগাঁও, শের-এ-বাংলা নগর, মিরপুর-২ নাম্বার ও ৩০০ ফিট এলাকা ও গাবতলী। মূলত এই পয়েন্টগুলোতে হঠাৎ করে ২০-৩০ জনের গ্রুপে বিভক্ত হয়ে ঝটিকা মিছিল বের করা, পর পর ককটেল ফুটিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে তীব্র আতঙ্ক সৃষ্টি এবং অতর্কিত গাড়ি ভাঙচুরের মাধ্যমে পুরো ঢাকা সচল রাখার লাইফলাইনকে অচল করে দেওয়ার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে।

সমন্বয়ের দায়িত্বে ১৬ জন

এই অরাজকতা সৃষ্টির নেপথ্যে থেকে সমন্বয়ের জন্যে কাজ করছে ছাত্রলীগের সাবেক কয়েকজন নেতা, যুবলীগ, কৃষক লীগ, শ্রমিক লীগ ও আওয়ামী লীগের পদধারী নেতারা। সূত্র অনুযায়ী ১৬ জন ব্যক্তির নাম উঠে এসেছে যারা এই সম্ভাব্য মিছিল ও নাশকতার দেখভালো করবেন। তাদের মধ্যে অন্যতম হলেনÑঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জহিরুল হক জিল্লু, ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মতিউর রহমান মতি, মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগ কমিটির যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক আব্দুল গাফফার, কৃষক লীগ কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক নূরে আলম সিদ্দিকী, কেন্দ্রীয় যুবলীগের দপ্তর সম্পাদক মাসুদ, যুবলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি মোর্শেদ কামাল, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ কমিটির (সাবেক ছাত্রনেতা, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়) বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক শরিফুল ইসলাম, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক রবিউল ইসলাম জিকু, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের উপদপ্তর সম্পাদক খন্দকার আরিফুল ইসলাম আরিফ, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক গাজী সারওয়ার বাবু, যুবলীগ মহানগর দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক জাহাঙ্গীর হোসেন, মহানগর দক্ষিণ যুবলীগ মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক সম্পাদক আলতাফ হোসেন, মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক গোলাম সরোয়ার কবির, মহানগর দক্ষিণ শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক সেলিম সারোয়ার, শ্রমিক লীগ মহানগর দক্ষিণের সভাপতি ইব্রাহিম হোসেন।

এই ১৫ জনের পাশাপাশি এই পুরো ষড়যন্ত্রের অন্যতম প্রধান অর্থদাতা ও নেপথ্য চালিকাশক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে ৬২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও সাবেক শ্রমিক নেতা মোস্তাক আহমেদকে। অভিযোগ রয়েছে, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ক্যাডার সংগ্রহ, ককটেল ও দেশীয় অস্ত্র কেনা এবং ঝটিকা মিছিলের ব্যয়ভার বহনে মোটা অঙ্কের টাকা সরবরাহ করছেন এই মোস্তাক।

দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ককটেল বিস্ফোরণ

২৩ জুনের মূল কর্মসূচি সফল করতে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মনোযোগ ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে ইতোমধ্যে দেশজুড়ে চোরাগোপ্তা ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটাতে শুরু করেছে নিষিদ্ধ সংগঠনের ক্যাডাররা। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী বৃহস্পতিবার রাজধানীর মহাখালীতে ঝটিকা মিছিল থেকে ৪-৫টি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায় আওয়ামী লীগের সদস্যরা। গতকাল শুক্রবার উত্তরা সংলগ্ন আবদুল্লাহপুরে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। চট্টগ্রাম ও মেহেরপুরে ঝটিকা মিছিল থেকে ককটেল ছোড়ার খবর পাওয়া গেছে।

রামমন্দির ইস্যু ও ‘ইসকন’ কানেকশন

আওয়ামী লীগের এই নাশকতার সমান্তরালে হঠাৎ করেই দেশের ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি বিনষ্ট করতে দৃশ্যপটে হাজির করা হয়েছে গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে রামমন্দির ইস্যু। গতকাল শুক্রবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে একটি অতি ক্ষুদ্র গোষ্ঠী এই স্পর্শকাতর ইস্যুটি নিয়ে মাঠ গরম করার অপচেষ্টা শুরু করে। জানা গেছে, বাংলাদেশের মূলধারার এবং শান্তিপ্রিয় সনাতন ধর্মাবলম্বী বা হিন্দু সম্প্রদায়ের সঙ্গে এই উগ্রবাদী গোষ্ঠীর কোনো ন্যূনতম সম্পর্ক বা যোগসূত্র নেই। মূলত এই গোষ্ঠীর নেপথ্যে আন্তর্জাতিকভাবে নানা সময়ে বিতর্কিত সংগঠন ‘ইসকন’ (ISKCON)-এর একটি প্রচ্ছন্ন ও গভীর কালোছায়া কাজ করছে। গোয়েন্দারা তথ্য পেয়েছেন যে, আজ শনিবার রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে সমাবেশ ও মানববন্ধনের নামে রাজপথ দখলের যে কর্মসূচি এই গোষ্ঠীটি হাতে নিয়েছে, তা মূলত ২৩ জুনের আওয়ামী নাশকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি চক্রান্ত। একদিকে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ-যুবলীগের ঝটিকা মিছিল ও বিভিন্ন স্থানে ককটেল বিস্ফোরণ, অন্যদিকে রামমন্দিরের ধুয়া তুলে রাজপথে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি—এই দ্বিমুখী চাপের মাধ্যমে মূলত বর্তমান সরকারকে বেকায়দায় ফেলার এক প্রকাশ্য ও অভ্যন্তরীণ যৌথ চক্রান্ত চলছে বলে মনে করছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।

পদস্থ দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, পলাতক ফ্যাসিবাদের দোসররা রাজনৈতিকভাবে সম্পূর্ণ দেউলিয়া হয়ে এখন উগ্র ধর্মীয় কার্ড কিংবা চোরাগোপ্তা নাশকতার পথ বেছে নিয়েছে। এটি তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার শেষ মরিয়া চেষ্টা মাত্র। তবে গত আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের চেতনায় বলীয়ান ছাত্র-জনতা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যেভাবে সমন্বিতভাবে মাঠপর্যায়ে কড়া নজরদারি ও প্রতিরোধের প্রস্তুতি অব্যাহত রেখেছে, তাতে এই অশুভ নীলনকশা চূড়ান্তভাবে ভেস্তে যেতে বাধ্য। এ বিষয়ে তারা সরকারের কাছে মূল্যায়ন তুলে ধরছেন বলে জানা গেছে।

পুলিশের সতর্ক অবস্থান

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এসএন নজরুল ইসলাম জানিয়েছেন, ২৩ জুনকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলার সুযোগ দেওয়া হবে না। রাজধানীর প্রতিটি প্রবেশমুখে তল্লাশি চৌকি এবং স্পর্শকাতর স্থানে অতিরিক্ত ফোর্স মোতায়েন করা হয়েছে। কোনো নিষিদ্ধ সংগঠন যেন রাজপথে নামার দুঃসাহস দেখাতে না পারে, সে ব্যাপারে শূন্যসহনশীলতা (জিরো টলারেন্স) নীতি গ্রহণ করা হয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি-মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাত হোসেন বলেন, জনজীবনে নিরাপত্তা বিধানে পুলিশ সতর্ক রয়েছে। সব ধরনের বেআইনি কর্মকাণ্ড মোকাবিলায় সজাগ রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন