আসন সমঝোতার বিষয়ে কাল-পরশুর মধ্যেই চুড়ান্ত ঘোষণা করা হবে বলে জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, আমরা সবার সামনে একসঙ্গে বসবো। এ বিষয়ে সাংবাদিকদের দাওয়াত দেওয়া হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সোমবার দুপুরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রধান পর্যবেক্ষক ও ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য ইভারস আইজাবসের নেতৃত্বে তিন সদস্যের প্রতিনিধি দলের সৌজন্য সাক্ষাৎ ও বৈঠক শেষে প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। রাজধানীর বসুন্ধরায় জামায়াত আমিরের কার্যালয়ে এই সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়।
প্রেস ব্রিফিংয়ে জামায়াত আমির বলেন, ঘণ্টাখানেক আলোচনায় প্রসঙ্গক্রমে ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন এবং গণভোট নিয়ে কথা হয়েছে। তারা জানতে চেয়েছেন, এই নির্বাচনে আমাদের দল এবং যাদের সঙ্গে সমঝোতা হয়েছে তাদের প্রস্তুতি কেমন, সমঝোতা সম্পন্ন হয়েছে কিনা, না হলে কবে হবে? আমরা তাদের বলেছি, আগামীকালের (মঙ্গলবার) মধ্যেই এটার একটার সেপ পাবে। নির্বাচন প্রক্রিয়া চলমান অবস্থায় আইনশৃংখলা পরিস্থিতি, সরকারের ভুমিকা, নির্বাচন কমিশনের ভুমিকা-আমরা কিভাবে দেখছি, এটা তারা জানতে চেয়েছেন।
সবার জন্য সমতল মাঠ তৈরিতে কোনো চ্যালেঞ্জ আছে কিনা, থাকলে সেগুলো কী? তারা জানতে চেয়েছেন যে, আমাদের নির্দিষ্ট কোনো কনসার্ন আছে কিনা? আমরা বলেছি-অবশ্যই আছে, তবে এটা যাদের সঙ্গে জড়িত তাদেরকে আগে জানাতে চাই। প্রধানত নির্বাচন কমিশন এবং কমিশনকে অর্থবহ সহযোগিতা দেওয়ার দায়িত্ব হচ্ছে সরকারের। আমরা এই দুই অথরিটিকে জানানোর পর সমাধান পেলে আর বাইরে কাউকে জানাবো না। আর সমাধান না পেলে জনগণের জানার অধিকার আছে, তাদের জানাবো। এরইমধ্যে কিছু বিষয়ে প্রতিকার পেয়েছি।
জামায়াত আমির বলেন, তারা আরো জানতে চেয়েছেন, আগামীতে আমরা যদি সরকার গঠন করি, তাহলে বিশ্বের সঙ্গে এবং প্রতিবেশিদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কেমন হবে? আমরা বলেছি, বিশ্বের সব সভ্য, শান্তিকামী এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকবে। প্রতিবেশিদের সঙ্গেও প্রতিবেশিসূলভ সম্পর্ক থাকবে। তারাও যেন আমাদের সঙ্গে প্রতিবেশিসূলভ আচরণ করেন। সেই আচরণ হলো-পারস্পারিক শ্রদ্ধা ও সমতার ভিত্তিতে। আমরা কোনো অবস্থাতেই অসমতা দেখতে চাই না। আমাদের পররাষ্ট্রনীতির ব্যাপারে বলেছি-আমরা কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকতে চাই না, বরঞ্চ সারাবিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে আমরা দেশকে এগিয়ে নিতে চাই।
তিনি বলেন, তারা জানতে চেয়েছে যে, সমাজের কোন সেকশন থেকে বেশি সাপোর্ট দিচ্ছে? আমরা বলেছি, কোনো আলাদা সেকশন নয়, তবে যুবকরা বিশ্বাস করে, তাদের চাওয়া পূর্ণ করতে জামায়াত যদি কোনো প্রতিশ্রুতি দেয় তা রক্ষা করবে। এই বিশ্বাসের জায়গা থেকে এ পর্যন্ত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্রসংসদ নির্বাচনে তার প্রতিফলন হয়েছে। যুবশক্তির সেখানে প্রতিফলন দেখা গেছে। আমরা মা-বোনদের নিরাপত্তার ব্যাপারে খুবই মনোযোগী। আমাদের বিশ্বাস তারা আমাদেরকে পছন্দ করবে। তার লক্ষণ ইতিমধ্যে দেখতে পাচ্ছি। আমাদের বোন-মায়েদের বিভিন্ন জায়গায় প্রচারণায় বাধা দেওয়া হচ্ছে। এমনকি হিজাব খুলে নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এদের দেখলে কোথাও তাড়িয়ে দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে। মা-বোন তো সবার আছে। শুধু রাজনৈতিক কারণে তাদের অপমান করার অধিকার রাখি না। ভাইদের মতো মায়েরা তাদের মতো করে ডিসিশন নেবে, আমি বাধা দেওয়ার কে? তারও প্রচারণার অধিকার আছে। এই সম্মানের জায়গাটা রক্ষা করতে হবে। আমরা বিশ্বাস করি, দেশের জনগণ সঠিক সিদ্ধান্ত নেবে এবং তারা দেশকে নিরাপদ, সন্ত্রাস ও দুর্নীতিমুক্ত করার জন্য, সুশাসন ও ন্যায়বিচার কায়েমের জন্য তারা সঠিক সিদ্ধান্ত নেবে বলে আমাদের শতভাগ আস্থা আছে।
শুধু আমাদের দাবি হলো-ভোটটা যাতে সুষ্ঠু হয়, ভোটাররা নির্বিঘ্নে গিয়ে তাদের ভোটটা নিজেই দিক। সেই ভোটের প্রতিফলন ফলাফলে উঠে আসুক। এই প্রক্রিয়ায় যদি জামায়াত তার সঙ্গীদের নিয়ে দেশ পরিচালনার সুযোগ পায় তাহলে আমরা দেশবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবো। আমরা দায়িত্বের আমানত রক্ষা করার চেষ্টা করবো। তবে জনগণ যদি অন্য কাউকে পছন্দ করে, সেক্ষেত্রে আমাদের অঙ্গীকার হবে-দেশের কল্যাণে গৃহীত সব সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সহযোগিতা করবো। একইভাবে অন্যরা যদি বিরোধীদলে বসে তাদের কাছ থেকেও একই জিনিস প্রত্যাশা করবো।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ৫৪ বছরে আমাদের দেশ কোনো সুন্দর, টেকসই ও স্থিতিশীল সমাজ পায়নি। একটি সমাজের এগিয়ে যাওয়া ও উন্নয়নের জন্য স্থিতিশীল সমাজ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা চিন্তা করছি, নির্বাচনের পরপরই অংশগ্রহণকারী সব দল যদি খোলামনে বসতে পারি, আগামী পাঁচটা বছর দেশের স্থিতিশীলতার জন্য আমরা সর্বোচ্চ কি করতে পারি, আমরা কি সমন্বিত চিন্তা করতে পারি? সবাই মিলে ভাল মনে করলে আমরা তাদের সঙ্গে একমত। আমরা তাদের সহযোগিতা করবো। তার অর্থ এই নয় যে, কেউ সরকারে গেলে আমরা তার হয়ে কাজ করবো।
তবে কিছু শর্ত আছে, প্রধান শর্ত হলো -প্রত্যেক দল বলবে যে, আমরা নিজে দুর্নীতি করবো না, কাউকে দুর্নীতি করার প্রশ্রয় দেবো না। দ্বিতীয় হলো -সবার জন্য ন্যায়বিচার এবং সমান বিচার। এতে কোনো দল বা রাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। বিচার বিভাগ পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করবে, তবে তাদেরও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয় শর্ত হলো -জাতি ৫৪ বছরের রাজনীতির পরিবর্তন চায়। এজন্য সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব বাস্তবায়নের প্রতিশ্রতি দিতে হবে।
তিনি বলেন, আমরা সংস্কারের পক্ষে, হ্যাঁ ভোটের পক্ষে। দেশবাসীকেও আহবান জানাই, যে দলকেই ভোট দেন না কেন, সংস্কারের জন্য হ্যাঁ ভোট দিবেন।
প্রশ্নের জবাবে জামায়াত আমির বলেন, আমরা সব গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছি। শুধু ২০১৮ সালের মধ্যরাতের নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলাম। আমরা মনে করি, এ ধরণের কোনো পরিবেশ এবার হবে না। এবার যেকোনো মূল্যে সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে হবে। এই নির্বাচন হাতছাড়া হলে জাতিকে কত মূল্য দিতে হবে জানি না।
আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা নিজেদেরকে দ্বিতীয় বা প্রথম করতে চাই না, এটাকে জনগণের হাতে তুলে দিতে চাই। এটা তারাই নির্ধারণ করবে। তিনি বলেন, কোনো কোনো গণমাধ্যম একটি দলের দিকে ঝুঁকে গেলেও কিছু হবে না ঠিক, তবে তাদের এ ধরণের অবস্থান আশা করি না। গণমাধ্যমকে দলীয় নয়, গণমানুষের মাধ্যম হিসেবে মাথায় রেখে কাজ করার প্রত্যাশা করি।
ইইউ গত নির্বাচনে কোনো প্রতিনিধি দল পাঠায়নি। এবার কি তারা কোনো প্রতিনিধি দল পাঠাবেন? জানতে চাইলে জামায়াত আমির বলেন, এবার তারা ২০০ প্রতিনিধি পাঠাবেন। তারা জেলা ও সিটি কর্পোরেশন এলাকা কাভার করবেন।
দেশের স্বার্থে নির্বাচনের পরে খোলা মনে বসতে চান। তবে এর সঙ্গে আবার শর্ত জুড়ে দিলেন। জানতে চাইলে জামায়াতে ইসলামীর আমির বলেন, নিঃশর্ত কেন হবে? আরেকজনের দায় জোর করে আমি কেন কাঁধে নেব। আমরা তো দেশকে স্বচ্ছ জবাবদিহিতার দিকে এগিয়ে নিতে চাই।
প্রশাসনের অনেকেই আওয়ামী লীগের দোসর হিসেবে কাজ করেছেন। এই প্রশাসনকে দিয়ে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব কিনা? জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা মনে করি তারা বদলাবেন। অন্যথায় তাদের বদলাতে বাধ্য করা হবে ইনশাআল্লাহ।
এ সময় জামায়াত আমিরের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. যুবায়ের আহমেদ, উন্নয়ন টিম লিড দেওয়ান আলমগীর এবং আমিরের পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মাহমুদুল হাসান।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

