সংসদে রফিকুল ইসলাম খান

প্রস্তাবিত বাজেট জনবান্ধব নয়, গরিব মারার বাজেট

সংসদ রিপোর্টার

প্রস্তাবিত বাজেট জনবান্ধব নয়, গরিব মারার বাজেট

প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে জনবান্ধব নয় বরং গরিব মারার বাজেট বলে মন্তব্য করেছেন সিরাজগঞ্জ-৪ আসনের বিরোধী দলের সংসদ সদস্য মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান।

তিনি শনিবার জাতীয় সংসদে বাজেট বিষয়ে আলোচনায় অংশ নিয়ে এ কথা বলেন। এ সময় অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, সরকারি দলের সদস্যরা এই বাজেটকে ভাল বাজেট, বাজেটের পর মিছিল হয়নি-বলছেন, যা আসলে সঠিক নয়। কারণ বিভিন্ন জিনিসের দামও বেড়েছে, মিছিলও হয়েছে। বাজেটের আগেই দাম বেড়েছে, মিছিলও তখন হয়েছে।

তিনি বিভিন্ন পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলেন, এলপিজির দাম ২৮ দশমিক ৯ শতাংশ, ডিজেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা, কেরোসিন লিটারে ১৮ টাকা, পেট্রোল ১৯ টাকা সহ বিভিন্ন দ্রব্যের দাম বেড়েছে। আসলে সরকারি দলের সদস্যরা বাজারে যান কিনা, জানি না। তাই এটা আসলে গরিব মারা বাজেট।

বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভ্যাট-ট্যাক্স বৃদ্ধির প্রসঙ্গে রফিকুল ইসলাম খান বলেন, মুদি পণ্যে ভ্যাট আরোপের কারণে দরিদ্র মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এমনকি ফকিরদেরও বাজার থেকে পণ্য কিনতে গিয়ে ভ্যাট দিতে হয়।

অর্থমন্ত্রীর বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্য তুলে ধরে তিনি বলেন, অর্থমন্ত্রী সত্যিই বলেছেন, দেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে চতুর্থ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। এতে স্পষ্ট হয়, বর্তমান বাজেট তাৎক্ষণিকভাবে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম নয় এবং আগামী তিন বছর দেশের মানুষকে কষ্টের মধ্য দিয়েই চলতে হবে।

তিনি বলেন, বাজেটে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পূর্বাভাস তার চেয়ে অনেক কম। একইভাবে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যও বাস্তবসম্মত নয়, কারণ সাম্প্রতিক সময়ে মূল্যস্ফীতি ইতোমধ্যে ৯ শতাংশের বেশি রয়েছে।

উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়নের চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, অর্থবছরের ১১ মাসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) মাত্র ৪৮ শতাংশের কিছু বেশি বাস্তবায়িত হয়েছে। অথচ বাকি বিপুল অর্থ এক মাসে ব্যয় করতে হলে তা অনিয়ম ও লুটপাটের ঝুঁকি বাড়াবে। কয়েকটি মন্ত্রণালয় বরাদ্দের এক-তৃতীয়াংশও ব্যয় করতে পারেনি বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তার মতে, বছরের শেষ মাসে বিপুল অর্থ ব্যয়ের চাপ সৃষ্টি হওয়ায় উন্নয়ন প্রকল্পে অপচয় ও দুর্নীতির আশঙ্কা বেড়ে যায়।

ব্যাংকিং খাতের অবস্থা তুলে ধরে তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা মোট ঋণের প্রায় ৩২ শতাংশ। অথচ ২০০৯ সালের শুরুতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল মাত্র ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। খেলাপি ঋণের লাগামহীন বৃদ্ধির কারণে দেশের ব্যাংকিং খাত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পৌঁছেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি বলেন, সরকার বিদেশি ঋণ পরিশোধেও নতুন ঋণের ওপর নির্ভর করছে এবং আগামী কয়েক বছরে প্রায় ৪ লাখ কোটি টাকা বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ তৈরি হবে, যা বাংলাদেশের মতো অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

বাজেট বাস্তবায়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি-এমন অভিযোগ করে রফিকুল ইসলাম খান বলেন, টিআইবির তথ্য অনুযায়ী বর্তমান সরকারের সময়ে এ পর্যন্ত ৬০৫ জন খুন হয়েছে, যারমধ্যে ২৮৮ জনই সরকারি দলের। যে সরকারের কাছে নিজ দলের লোকেরাই নিরাপদ নয়, সেই সরকারের কাছে দেশের মানুষ নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে কীভাবে। লক্ষ্মীপুরে মা ও তিন মেয়েকে হত্যার ঘটনা, ধর্ষণসহ বিভিন্ন সহিংসতার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন,

আসলে বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছেন।

মাদকের বিস্তার নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, দেশে প্রায় ৮৩ লাখ মাদকসেবী রয়েছে। মাদকের বিরুদ্ধে নতুন আইন প্রণয়নকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, শুধু আইন করলেই হবে না, মাদকের উৎস এবং সীমান্ত দিয়ে এর প্রবেশ বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। তাহলেই দেশের যুবসমাজকে মাদকের ভয়াল থাবা থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।

তিনি বলেন, প্রায় ৭০ ভাগ মানুষের দেয়া গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করা সরকারের নৈতিক দায়িত্ব। অতীতেও বিভিন্ন সময়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে, তাই এটিকে অসাংবিধানিক বলার সুযোগ নেই। সংস্কার প্রশ্নে জনগণের মতামতকে সম্মান জানিয়ে দ্রুত গণভোটের রায় বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানান তিনি।

রফিকুল ইসলাম খান কওমি মাদ্রাসার ১২ থেকে ১৪ লাখ শিক্ষার্থীর উন্নয়নে বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ রাখার দাবি জানান। একই সঙ্গে ইমাম, মুয়াজ্জিনের পাশাপাশি অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের জন্য সম্মানজনক ভাতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, জুলাইয়ের শহীদ পরিবারের পাশাপাশি গত ১৬ বছরে রাজনৈতিক সহিংসতা, গুম, অপহরণ ও নির্যাতনের শিকার পরিবারগুলোর জন্যও পুনর্বাসন ও ভাতার ব্যবস্থা করা উচিত। পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষাকে আর শক্তিশালী করার দাবিও জানান।

প্রশাসনে দলীয়করণের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জনপ্রশাসনসহ বিভিন্ন খাতে অতীতে নির্যাতিত কর্মকর্তাদের এখনও বঞ্চিত করা হচ্ছে, অন্যদিকে বিতর্কিত ব্যক্তিরা গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল রয়েছেন। এ ধরনের দলীয়করণ বন্ধে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ দাবি করেন তিনি।

পতিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বিদেশে অবস্থানরত অন্য মামলার আসামিদের দেশে ফিরিয়ে এনে দ্রুত বিচার সম্পন্ন করার আহ্বান জানান রফিকুল ইসলাম খান। একই সঙ্গে আলোচিত বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডের আসামিদেরও দেশে ফিরিয়ে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।

দুর্নীতি দমন কমিশন ও মানবাধিকার কমিশনের কার্যকারিতা জোরদারে পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নেয়ায় জনগণের আস্থা কমছে। তিনি অভিযোগ করেন, গত এক বছরে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশ থেকে ১২ হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থ পাচার হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যাংক থেকে বিপুল অর্থ লুটপাটের অভিযোগ তুলে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান।

জামায়াতের এই এমপি বলেন, এই দেশ সবার। দুর্নীতিবাজ কোনো দলের নয়, তারা দেশের শত্রু। তাই দলমত নির্বিশেষে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। আমাদের দলের শ্লোগান ‘চলো একসাথে গড়ি বাংলাদেশ’ গড়ে তোলার আহবান জানান তিনি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...