ভিনি দ্য জিনিয়াস!

Picsart_26-06-04_12-40-53-266
এম. এম. কায়সার

ভিনি দ্য জিনিয়াস!

মাঠে ২২ জন খেলেন; কিন্তু সবাই সমান নন।

কেউ ম্যাচের অংশ হন, কেউ ম্যাচের গল্প লেখেন। আর খুব কম মানুষ আছেন, যারা পুরো ম্যাচটিকেই নিজের মতো করে, নিজের সম্পত্তি বানিয়ে ফেলেন। ২০২৬ বিশ্বকাপে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র এখন সেই বিরল ফুটবলারদের একজন। তিনি শুধু খেলছেন না, ম্যাচের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তকে নিজের নামে লিখে নিচ্ছেন। গোল করছেন, গোল করাচ্ছেন, প্রতিপক্ষের আক্রমণ ভেঙে দিচ্ছেন, ম্যাচ জিতছেন এবং দর্শকদের বিস্মিত করছেন। তিন ম্যাচ শেষে এখন ব্রাজিলের জার্সিতে বিশ্বকাপের সবচেয়ে উজ্জ্বল আলোর নাম ভিনিসিয়ুস।

বিজ্ঞাপন

স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে তার দুই গোলের গল্প সবাই জানে। সাত মিনিটে প্রতিপক্ষের ভুলে গোলকিপারকে কাটিয়ে নিখুঁত ফিনিশ। পরে দুর্দান্ত হেডে আরেকটি গোল; কিন্তু স্কোরলাইন পুরো গল্প বলে না। কারণ, আরেকটি গোলও করেছিলেন ভিনিÑযা ফাউলের কারণে বাতিল হয়ে যায়। রিপ্লে জানাচ্ছে, ওটা ছিল রেফারির ভুল সিদ্ধান্ত। যে অ্যাঙ্গেল থেকে রেফারি এটা দেখে ফাউল দেন, সেই অ্যাঙ্গেল থেকে বোঝা যাচ্ছিল এটা তার ফাউল। কিন্তু অন্য অ্যাঙ্গেল থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়, উল্টো স্কটল্যান্ডের ডিফেন্ডার এই ফাউল করেছেন ভিনির বিরুদ্ধেই! অবাক করার বিষয় হলো, এই ফাউলের জন্য স্কটল্যান্ড কিন্তু কোনো আবেদনও জানায়নি। রেফারি স্বইচ্ছায় এই ফাউলের বাঁশি বাজান এবং তার এই ভুল সিদ্ধান্ত ভিনিকে হ্যাটট্রিক-বঞ্চিত করে।

হ্যাটট্রিক হাতছাড়া; তবুও ম্যাচ শেষে সবচেয়ে আলোচিত নামটি ছিল তারই।

তিন ম্যাচে চার গোল এবং একটি অ্যাসিস্ট। তিন ম্যাচেই ম্যাচসেরা। এ বিশ্বকাপে প্রথম তিন ম্যাচে টানা ম্যাচসেরা হওয়া মেসির কীর্তিতে ভাগ বসিয়েছেন ভিনি। সে সঙ্গে বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের তিন ম্যাচেই গোল করা পঞ্চম ব্রাজিলিয়ান হিসেবে তার নাম এখন জর্জিনহো, রোমারিও, রোনালদো ও রিভালদোর পাশে। ভিনিও এখন এই এলিট ক্লাবের সদস্য। মজার তথ্য হলো, এই ক্লাবের শুরুর চারজনই বিশ্বকাপ জিতেছেন। ভিনিও কি সেই আনন্দযাত্রার সঙ্গী হতে এমন শুরু করেছেন?

ভিনি খেলেন উইঙ্গার পজিশনে। একাই বল পায়ে প্রতিপক্ষকে ধসাতে দক্ষ। বাম প্রান্তের উইং তার প্রিয় জায়গা; কিন্তু প্রয়োজনে ডানদিকে সেকেন্ড স্ট্রাইকার হিসেবে কিংবা ফলস নাইন হিসেবেও খেলতে পারেন। তার সবচেয়ে বড় শক্তি গতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সমন্বয়। কখন ড্রিবল করবেন, কখন পাস দেবেন, কখন শট নেবেন এবং সিদ্ধান্তগুলো নেন চোখের পলকে, অবিশ্বাস্য গতিতে। বল পায়ে তার গতি যেন ১০০ মিটারের স্প্রিন্ট!

আধুনিক ফুটবলে ‘ক্যাওয়াজ ক্রিয়েটর’ নামে এক ঘরানার খেলোয়াড় আছেন, যারা প্রতিপক্ষের রক্ষণকে ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলে হতভম্ব করে দেন আর ম্যাচ বাঁচাতে তখন ডিফেন্ডারদের কোনো পরিকল্পনাই কাজে আসে না!

ভিনিসিয়ুস হলেন সেই ক্যাটাগরির সবচেয়ে বিপজ্জনকদের একজন।

তার স্প্রিন্ট, দিক পরিবর্তন কিংবা একেকটি ওয়ান টু ওয়ান লড়াই পুরো ডিফেন্সের কাঠামো ভেঙে দেয়, ম্যাচের বাঁক বদলে দেয়। পাশে থাকা মার্কারকে গতিতে হারানো, ড্রিবলিং জাদুতে প্রতিপক্ষকে মোহিত করে রাখা, স্পেস খুঁজে নেওয়া, বডি ডজ, দুরূহ অ্যাঙ্গেল থেকে গোলপোস্টে নিখুঁত নিশানা, ভলি শটে বুলেটের গতি, হেডের জন্য স্বতঃস্ফূর্ত ভঙিতে শূন্যে লাফিয়ে ওঠাসহ একজন গোলশিকারির জন্য ঠিক যেসব গুণ থাকা উচিত, তার সবকিছু্ই রয়েছে ভিনির ফুটবলে।

বিস্ফোরক গতি, বিশ্বমানের ড্রিবলিং এবং চাপের মুহূর্তে গোল করার অসাধারণ ক্ষমতা তাকে বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর ফরোয়ার্ডদের একজন করে তুলেছে। মুহূর্তের মধ্যে ডিফেন্ডারকে পেছনে ফেলে তিনি আক্রমণ শানাতে ওস্তাদি দেখাতে পারেন। আবার ডি বক্সে ঢুকে কাটব্যাক করে মাপা অ্যাঙ্গেল তৈরি করে বল জালে জড়ান। মরক্কোর বিরুদ্ধে ম্যাচে তার গোলের রিপ্লে সেই পারফেক্ট অ্যাঙ্গেল তৈরিরই গল্প।

ছোটবেলায় ফুটসালে বেড়ে ওঠার কারণে বলের ওপর তার রয়েছে অসাধারণ নিয়ন্ত্রণ। দুই পায়ে বলকে যেন কথা বলান ভিনি! ছোট জায়গায় বল ধরে রাখা, দ্রুত দিক পরিবর্তন এবং একাধিক ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে এগিয়ে যাওয়ার দক্ষতা তাকে আলাদা করেছে। বলের ওপর তার অগাধ নিয়ন্ত্রণ ব্রাজিলের আরেক সুপারস্টার রোনালদিনহোর চমকপ্রদ সেই ফুটবল ছন্দের কথা মনে করিয়ে দেয়। পায়ের ওপর বলকে তিনি যে কায়দায় ঘোরান, মনে হয় হাতের তালুতে লাটিম নাচাচ্ছেন! এমনই জাদু তার ওই ফুটবল বুটে!

ব্রাজিল কোচ কার্লো আনচেলত্তি রিয়াল মাদ্রিদে ভিনির বিকাশের সবচেয়ে বড় সাক্ষী। জাতীয় দলের দায়িত্ব নেওয়ার পরও তিনি জানতেন, সমালোচকরা যা দেখছেন, তারচেয়ে অনেক বেশি কিছু লুকিয়ে আছে এই ছেলেটির মধ্যে। আনচেলত্তি বলেছেন, ‘তাকে নিয়ে আমার কখনো সন্দেহ ছিল না। বড় ম্যাচের জন্যই সে জন্মেছে।’

এক সময় ব্রাজিলের হয়ে ৩৯ ম্যাচে মাত্র ছয় গোল ছিল ভিনির নামের পাশে। সমালোচকরা বলতেন, ক্লাবের ভিনি আর জাতীয় দলের ভিনি এক নয়। আজ সে সমালোচনার জবাব ভিনি মাঠেই লিখছেন। আনচেলত্তির অধীনে তার গোলসংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। স্কটল্যান্ড ম্যাচের দুই গোলের পর ব্রাজিলের হয়ে এখন তার আন্তর্জাতিক গোলসংখ্যা পৌঁছেছে ১৩-তে।

গোল্ডেন বুটের দৌড়ে তিনি এখন শীর্ষদের একজন। কিন্তু আরো বড় পুরস্কারের দাবিদার হয়ে উঠছেন গোল্ডেন বলের লড়াইয়ে। কারণ, বিশ্বকাপে শেষ পর্যন্ত শুধু গোল নয়, প্রভাবটাই আসল। আর এ মুহূর্তে পুরো টুর্নামেন্টে আর্জেন্টিনার মেসি ছাড়া খুব কম খেলোয়াড়ই আছেন, যাদের প্রভাব ভিনিসিয়ুসের সমান।

ব্রাজিল নকআউটে উঠেছে। বিশ্বকাপ এখন আরো কঠিন হবে। ব্রাজিলের সাফল্যের গ্যারান্টির ভারও এখন তার কাঁধে। আত্মবিশ্বাস, পরিণত সিদ্ধান্ত এবং ধারাবাহিক পারফরম্যান্সে আপাত এটা প্রমাণিত সত্য যে, এ বিশ্বকাপে ব্রাজিল দলের কেন্দ্রীয় চরিত্র এখন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, দ্য জিনিয়াস!

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...