হরমুজে ইরানের ড্রোন হামলা, আটকে পড়া নাবিকদের উদ্ধার অভিযান স্থগিত

আমার দেশ অনলাইন
আমার দেশ অনলাইন

হরমুজে ইরানের ড্রোন হামলা, আটকে পড়া নাবিকদের উদ্ধার অভিযান স্থগিত
হরমুজ প্রণালিতে আটকে থাকা কিছু জাহাজ। ওমানের মুসান্দাম থেকে তোলা ছবি। ছবি: রয়টার্স

গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চুক্তি হওয়া সত্ত্বেও বৃহস্পতিবার হরমুজ প্রণালিতে একটি পণ্যবাহী জাহাজে ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। এই হামলার কারণে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে আটকে পড়া হাজার হাজার নাবিক ও শত শত জাহাজ নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কাজ স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে জাতিসংঘ। এই ঘটনাটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথে ইরানের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার সক্ষমতাকে আবারও প্রমাণ করেছে।

একজন মার্কিন কর্মকর্তা সিএনএন-কে জানিয়েছেন, একটি ইরানি ড্রোন দিয়ে জাহাজটিতে হামলা চালানো হয়েছে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত আর কিছু জানাননি তিনি। ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে এই হামলার দায় স্বীকার করেনি। তবে শক্তিশালী ইরানি রেভল্যুশনারি গার্ডস (আইআরজিসি) তাদের অনুমোদিত রুট ছাড়া অন্য কোনো রুটে জাহাজগুলোকে নিরাপদ যাতায়াত করতে দেওয়া হবে না বলে হুঁশিয়ারি দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এই হামলাটি ঘটে। ট্রাম্প প্রশাসনের দাবিকে চ্যালেঞ্জ করে ইরান এই হুঁশিয়ারি দিয়েছিল। ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করেছিল, হরমুজ প্রণালি আবারও সবার জন্য উন্মুক্ত ও মুক্ত করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি চুক্তির বিষয়ে একমত হওয়ার পর এটিই প্রথম হামলার ঘটনা। এই হামলার পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম কিছুটা বেড়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও যখন চুক্তিটি নিয়ে সন্দিহান উপসাগরীয় দেশগুলোকে বোঝানোর চেষ্টা করছেন, ঠিক তখনই এই হামলাটি ঘটল।

যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) জানিয়েছে, পণ্যবাহী জাহাজটির ডান দিকে একটি অজানা প্রজেক্টাইল বা গোলা আঘাত হেনেছে। এতে জাহাজের ব্রিজ বা নিয়ন্ত্রণ কক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে এতে কোনো হতাহত বা পরিবেশগত ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। ওই এলাকায় চলাচলকারী বাকি জাহাজগুলোকে সতর্কতার সাথে যাতায়াত করতে এবং যেকোনো সন্দেহজনক কার্যকলাপের রিপোর্ট করতে বলা হয়েছে।

জাতিসংঘের উদ্ধার অভিযান স্থগিত

এই হামলার কারণে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা (আইএমও) তাদের উদ্ধার অভিযান স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে আটকে পড়া শত শত জাহাজ এবং ১১ হাজারেরও বেশি নাবিককে সরিয়ে নেওয়ার কাজ করছিল সংস্থাটি।

আইএমও-এর মহাসচিব আর্সেনিও ডোমিঙ্গো এক বিবৃতিতে বলেন, ‘আমি সব সময়ই পুনর্ব্যক্ত করেছি যে নাবিকদের নিরাপত্তা সবার আগে। তাই একটি সমন্বিত পদ্ধতি এবং নিরাপদ নৌচলাচল নিশ্চিত করতে পরিস্থিতি পুরোপুরি স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত এই উদ্ধার পরিকল্পনা স্থগিত থাকবে।’

ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর মাত্র কয়েক দিন আগে এই উদ্ধার অভিযান শুরু হয়েছিল। ডোমিঙ্গো স্পষ্ট করেছেন, আক্রান্ত জাহাজটি আইএমও-এর উদ্ধার কাঠামোর অধীনে চলাচল করছিল না। তবে এই ঘটনাটি নাবিকদের ঝুঁকিতে না ফেলে উদ্ধার অভিযান চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তাকে তুলে ধরেছে।

মেরিন ট্রাফিক-এর তথ্য অনুযায়ী, চলতি সপ্তাহে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। গত বুধবার এই সমুদ্রপথ দিয়ে ৭০টি জাহাজ পারাপার হয়েছে, যার অধিকাংশ ওমান উপকূলের রুট ব্যবহার করেছিল। ইরান এই সমুদ্রপথের নিয়ন্ত্রণকে আলোচনার টেবিলে একটি বড় হাতিয়ার হিসেবে মনে করে।

হামলার পর তেহরানের নবপ্রতিষ্ঠিত সংস্থা 'পারস্য উপসাগরীয় সিওয়েজ ম্যানেজমেন্ট অর্গানাইজেশন' সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ জানিয়েছে, অননুমোদিত রুটে যাতায়াতের কোনো নিরাপত্তা গ্যারান্টি দেওয়া হবে না। অননুমোদিত রুটে ভ্রমণের সমস্ত পরিণতির দায় জাহাজের মালিক, অপারেটর এবং কমান্ডারের ওপর বর্তাবে।

শুল্ক বিতর্ক তেলের বাজার

ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার বর্তমান চুক্তিতে ৬০ দিনের জন্য কোনো শুল্ক ছাড়াই এই সমুদ্রপথটি পুনরায় খুলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। এর বিনিময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে ইরানি বন্দরের ওপর থেকে অবরোধ তুলে নিয়েছে। তবে ১৪ দফার এই সমঝোতা স্মারকে ওমানের পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক ট্রাফিক তদারকি করার ক্ষেত্রে ইরানকে একটি আনুষ্ঠানিক ভূমিকা দেওয়া হয়েছে।

যুদ্ধ চলাকালীন এই প্রণালি ব্যবহার করতে চাওয়া জাহাজগুলোর ওপর কর বা শুল্ক আরোপ শুরু করেছিল তেহরান। ট্রাম্প প্রশাসন দীর্ঘমেয়াদি শান্তি চুক্তিতে এটি কোনোভাবেই মেনে না নেওয়ার অঙ্গীকার করেছে।

বৃহস্পতিবার বাহরাইনে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) এক বৈঠকে মার্কো রুবিও বলেন, ‘বাস্তবতা হলো, আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথ ব্যবহারের জন্য কর নেওয়ার অধিকার পৃথিবীর কোনো দেশের নেই। এটি কোনো চুক্তির শর্ত হিসেবে কখনোই গ্রহণযোগ্য হবে না।’

ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী চলতি সপ্তাহের শুরুতে ইরানের সংসদ স্পিকারের সাথে বৈঠকের পর জানিয়েছিলেন, উভয় পক্ষই আন্তর্জাতিক আইন এবং শুল্কমুক্ত নিরাপদ যাতায়াতের বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে ইরান এই সমুদ্রপথটিকে আন্তর্জাতিক জলসীমা হিসেবে স্বীকার করে না। তারা ওমানের পাশাপাশি ভবিষ্যতে শুল্কের পরিবর্তে এক ধরণের 'সার্ভিস ফি' বা সেবা মূল্য নেওয়ার প্রস্তাব তুলেছে। রুবিও একে শব্দের খেলা বলে অভিহিত করেছেন।

গত সপ্তাহে চুক্তি স্বাক্ষরের পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সর্বনিম্ন স্তরে নেমে এসেছিল। তবে বৃহস্পতিবারের এই হামলার পর আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ২ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ৭৪ ডলারে গিয়ে ঠেকেছে।

চুক্তির ভবিষ্যৎ আঞ্চলিক জটিলতা

এই সমঝোতা স্মারকের লক্ষ্য হলো যুদ্ধ বন্ধ করা, হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করা এবং পরমাণু অস্ত্র তৈরি না করার শর্তে ইরানকে অর্থনৈতিক স্বস্তি দেওয়া। তবে তেহরানের পরমাণু কর্মসূচি এবং সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুতের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো ৬০ দিনের উচ্চ-পর্যায়ের আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করার জন্য বাকি রাখা হয়েছে।

রুবিও জানিয়েছেন, আগামী ৩০ জুন থেকে পরমাণু শক্তি এবং নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের ওয়ার্কিং গ্রুপের প্রযুক্তিগত আলোচনা শুরু হবে।

তবে এই প্রক্রিয়াটি নানা প্রতিবন্ধকতায় জর্জরিত। বিশেষ করে ইসরাইল এবং হিজবুল্লাহর মধ্যে চলমান লড়াই গত সপ্তাহে ইউএস-ইরান আলোচনাকে লাইনচ্যুত করার হুমকি দিয়েছিল। ইরান বারবার এই দুটি বিষয়কে একসূত্রে গাঁথা বলে দাবি করলেও রুবিও ইসরাইল-লেবানন আলোচনাকে ইউএস-ইরান আলোচনা থেকে আলাদা রাখার চেষ্টা করছেন। সমঝোতা চুক্তিতে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধ শেষ করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল।

লেবাননে ইসরাইলের সামরিক অভিযানের কারণে ট্রাম্প প্রশাসন ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। রুবিও তার বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য সফরে ইসরাইলকে বাদ দিয়েছেন, যাকে কিছু বিশ্লেষক ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রতি অবজ্ঞা বা অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

সূত্র: সিএনএন

এএম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন