খাদের কিনারা থেকে ফিরল ইংল্যান্ড, জয়ের নায়ক অধিনায়ক হ্যারি কেইন

এম. এম. কায়সার

খাদের কিনারা থেকে ফিরল ইংল্যান্ড, জয়ের নায়ক অধিনায়ক হ্যারি কেইন

হারলেই বিশ্বকাপ শেষ। চার বছরের স্বপ্ন, কোটি সমর্থকের অপেক্ষা—সবকিছু ভেঙে পড়বে এক বিকেলের হতাশায়। ম্যাচের সাত মিনিটেই গোল হজম করায় ইংল্যান্ডের সেই দুঃস্বপ্নটা যেন সত্যি হয়ে উঠেছিল। ডিআর কঙ্গোর প্রথম আক্রমণেই গোল। স্কোরবোর্ডে ১-০। সেই গোলে পিছিয়ে থেকেই প্রথমার্ধ শেষ হল। দ্বিতীয়ার্ধেরও অনেক সময় কেটে গেল সেই স্কোরেই। ইংল্যান্ড তখন খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে। যে কিনারে লেখা ছিল বিশ্বকাপ থেকে বিদায়!

কিন্তু ইংল্যান্ডের ফুটবল ইতিহাসে একটা শব্দ বহুবার ফিরে এসেছে- নেভার সে ডাই! সেই লড়াকু মানসিকতার নতুন অধ্যায় লিখলেন অধিনায়ক হ্যারি কেইন। যখন সবাই দিশেহারা, তখন সামনে দাঁড়ালেন তিনিই। করলেন জোড়া গোল। শেষ দিকে কোচ টমাস টুখেলের সাহসী বদলি যেন ম্যাচের গতি পুরো উল্টে দিল। মৃত্যুফাঁদ থেকে ফিরে এসে ২-১ গোলের জয়ে শেষ ষোলোর টিকিট নিশ্চিত করল ইংল্যান্ড।

ম্যাচের সাত মিনিট। ডান দিক থেকে ভেসে আসা ক্রস। স্পেন্সের চোখ এড়িয়ে ফাঁকায় দাঁড়িয়ে ব্রায়ান সিপেঙ্গা। কাছের পোস্ট দিয়ে জর্ডান পিকফোর্ডকে পরাস্ত করতে একটুও ভুল করলেন না তিনি। বিশ্বকাপের নকআউটে এমন শুরু যেন ইংল্যান্ডের বুকের ভেতর শীতল স্রোত বইয়ে দিল। সিপেঙ্গার শটটা দারুণ ছিল। কিন্তু পিকফোর্ডের মতো গোলকিপারের অবশ্যই সেই গোল বাঁচানো উচিত ছিল। তিনি পারেননি। শুরুর ৪৫ মিনিটও ইংল্যান্ড শোধ করতে পারেনি।

গোল হজমের পর রক্ষণে দেখা দিল অস্থিরতা। পাসে ভুল, অবস্থানে ভুল, যোগাযোগে ভুল, শট নেওয়া ভুল। পুরো ইংল্যান্ড দলের খেলা দেখে মনে হচ্ছিল পড়াশোনা না করেই পরীক্ষা দিতে বসা ছাত্র যেন তারা! কোনো কিছুই যে কমন পড়ছে না। তাই খাতায় কিছু না লিখে কলম চিবুচ্ছে!

বল দখলে আধিপত্য ছিল ইংল্যান্ডের। সুযোগও তৈরি হয়েছে একের পর এক। কিন্তু গোল যেন কিছুতেই ধরা দিচ্ছিল না। রাশফোর্ড, জুড বেলিংহাম, বুকায়ো সাকা, ফিল ফোডেন—সবাই চেষ্টা করেছেন। কিন্তু প্রতিবারই সামনে দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছেন কঙ্গোর গোলরক্ষক লিওনেল এমপাসি। একাই তিনি হাত পা ছড়িয়ে দিয়ে পুরো গোলপোস্টে যেন দেয়াল হয়ে দাড়িয়েছিলেন। অন্তত নিশ্চিত গোল হতো ইংল্যান্ডের এমন চারটি চেষ্টা তিনি একাই ঠেকিয়ে দেন।

বিরতিতে স্কোর ১-০। আর ইতিহাসও তখন ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে। বিশ্বকাপে বিরতিতে পিছিয়ে থেকে কোনো ম্যাচ জেতার রেকর্ড তাদের ছিল না। কিন্তু সেই রেকর্ড বদলে দিল ইংল্যান্ড দ্বিতীয়ার্ধের শেষ ২০ মিনিটে।

বড় কোচদের পরিচয় বড় ম্যাচেই। দলের বিপদের সময়ে। ইংল্যান্ড কোচ সেই সাহসের পরিচয় দিলেন। ঝুঁকি নিলেন এবং জিতলেন। দ্বিতীয়ার্ধে শুধু খেলোয়াড় বদলের সঙ্গে বদলে দিয়েছেন ম্যাচের ছন্দ। শেষ দিকে ডিহাইড্রেশন বিরতির সুযোগটাকে যেন টাইম-আউট বানিয়ে ফেললেন তিনি। নতুন খেলোয়াড়, নতুন গতি আর নতুন পরিকল্পনায় ইংল্যান্ডের আক্রমণ হঠাৎ করেই হয়ে উঠল অনেক বেশি ধারালো। গর্ডনের পাস এবং হ্যারি কেইনের ফিনিসিং খাদের কিনারা থেকে ইংল্যান্ডকে ফিরিয়ে আনল। ১ গোলে পিছিয়ে থাকা ম্যাচ জিতল ইংল্যান্ড ২-১ এ। কঙ্গো, যারা এতক্ষণ পর্যন্ত স্বস্তিতে ছিল, তারা আচমকাই ম্যাচের শেষদিকে নিজেদের অর্ধে বন্দি হয়ে পড়ল।

বড় ম্যাচে বড় খেলোয়াড়রা অপেক্ষা করেন না। তারা মুহূর্ত তৈরি করেন। ৭৫ মিনিটে উঁচু হয়ে আসা বলটাকে নিখুঁত হেডে জালে পাঠালেন হ্যারি কেইন। গোল করার সঙ্গে সঙ্গে শুধু স্কোরলাইনই বদলায়নি, বদলে গেছে পুরো ম্যাচের মানসিকতা।

ইংল্যান্ড বিশ্বাস ফিরে পেল। আর কঙ্গো প্রথমবারের মতো ভয় পেতে শুরু করল। খেলেয়াড়দের হতাশ হওয়া চেহারা সেটাই জানান দিচ্ছিল। সমতা আনার মাত্র এগারো মিনিট পর, অ্যান্থনি গর্ডনের পাস থেকে বক্সের বাইরে বল পেলেন হ্যারি কেইন। এক টাচে জায়গা বানিয়ে ডান পায়ের এমন এক শট নিলেন, যা গোলরক্ষক শুধু চোখ দিয়ে অনুসরণই করতে পারলেন। হাত দিয়ে ঠেকানোর কোনো উপায় ছিল না তার। বল জালে। ব্যাস সেই সঙ্গে স্টেডিয়াম যেন বিস্ফোরিত হলো। ইংল্যান্ড ফিরে এল মৃত্যুকূপ থেকে। চলতি বিশ্বকাপে এটি হ্যারি কেইনের পঞ্চম গোল। বিশ্বকাপে তার মোট গোলসংখ্যা এখন ১৩। কিন্তু সংখ্যার চেয়েও বড় হয়ে থাকবে এই ম্যাচ।

কারণ এই গোল দুটি শুধু জয় এনে দেয়নি। ইংল্যান্ডকে ফিরিয়ে এনেছে টুর্নামেন্টে। অধিনায়কত্ব মানে শুধু আর্মব্যান্ড নয়, সবচেয়ে অন্ধকার মুহূর্তে সামনে দাঁড়ানো। হ্যারি কেইন সেটাই করে দেখালেন।

আর টুখেল দেখিয়ে দিলেন, ম্যাচ শুধু খেলোয়াড়রা জেতেন না; কখনো কখনো বেঞ্চ থেকেও জয় লেখা হয়। বিশ্বকাপের ইতিহাসে অনেক প্রত্যাবর্তনের গল্প আছে। ইংল্যান্ডের এই জয় হয়তো তাদের পাশে জায়গা করে নেবে না। কিন্তু যারা ম্যাচটা দেখেছেন, তারা জানবেন—সাত মিনিটে যে দল খাদের কিনারায় পৌঁছে গিয়েছিল, নব্বই মিনিট শেষে তারাই বিজয়ীর হাসি হেসেছে।

ইংল্যান্ডের এই জয় জানিয়ে দিল, যতক্ষণ আক্রমণে হ্যারি কেইন আছেন, শেষ বাঁশি বাজার আগ পর্যন্ত ইংল্যান্ডকে হারিয়ে দেওয়া যায় না।

গুড শো থ্রি লায়ন্স!

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...