ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর ধ্বংসস্তূপ থেকে বেঁচে যাওয়া মানুষদের উদ্ধারে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছেন উদ্ধারকর্মীরা। দীর্ঘ নিখোঁজের তালিকায় মাঝে মাঝে জীবনের সন্ধান মেলায় উদ্ধারকারীদের মাঝে কিছুটা স্বস্তি ফিরছে।
দীর্ঘদিন ধরে গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটে নিমজ্জিত দেশটিতে গত বুধবারের জোড়া ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা ১ হাজার ৫০০ জনের কাছাকাছি পৌঁছেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত লা গুয়াইরা রাজ্যে ইতোমধ্যেই বিদেশি উদ্ধারকারী দলগুলো এসে পৌঁছেছে। কারাকাস থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত এই উপকূলীয় রাজ্যে অসংখ্য ভবন ধসে বালু ও ধ্বংসস্তূপের স্তূপে পরিণত হয়েছে।
অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ একটি প্রেসিডেন্সিয়াল কমিশন ঘোষণার পর বলেন, ‘উদ্ধার ও পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
গতকাল রোববার আমরা জীবিত মানুষদের উদ্ধার করেছি, তাই অভিযান স্থগিত করা হচ্ছে না। আমরা সবসময় আশা বজায় রাখি।’
এই কমিশন ভবনগুলোর বাসযোগ্যতা নির্ধারণ করবে। বেশ কয়েকজন মন্ত্রীকে সাথে নিয়ে রদ্রিগেজ জানান, স্কুলগুলোর ক্লাস আরও এক সপ্তাহ স্থগিত থাকবে এবং লা গুয়াইরায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ৭৫ শতাংশ পুনরুদ্ধার করা হয়েছে।
গত জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের এক অভিযানের মাধ্যমে পূর্বসূরি অপসারিত হওয়ার পর থেকে রদ্রিগেজ সরকারের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। সরকার প্রথমে লা গুয়াইরায় ত্রাণ সহায়তাকারী বেসামরিক স্বেচ্ছাসেবকদের ধন্যবাদ জানালেও পরে সড়কে যাতায়াত সীমিত করে দেয়।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, অতিরিক্ত ট্রাফিকের কারণে জরুরি যানবাহনের দক্ষ চলাচলে ব্যাঘাত ঘটছে।
এর আগে, অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্টের ভাই এবং ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির প্রেসিডেন্ট জর্জ রদ্রিগেজ জানান, রোববার নিহতের সংখ্যা ২০ জন বেড়ে ১ হাজার ৪৫০ জনে দাঁড়িয়েছে।
তিনি আরো বলেন, ৩ হাজার ১৫০ জন আহত রয়েছেন, ১২ হাজার ৭২১ জন বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং ৭৭৪টি ভবন ধসে পড়েছে।
তিনি বলেন, ‘জীবিতদের উদ্ধার করতে এবং যারা বাড়িঘর হারিয়েছেন বা নিজ বাসস্থানে ফিরতে পারছেন না, তাদের জন্য ক্যাম্প তৈরি করতে আমরা এখন অত্যন্ত সংকটময় ও গুরুত্বপূর্ণ সময় পার করছি।’
২ হাজার ৬০০-এরও বেশি বিদেশি উদ্ধারকর্মী আসার আগে পরিবার ও স্বেচ্ছাসেবকরা ধ্বংসস্তূপ থেকে বেঁচে যাওয়া এবং লাশ টেনে তুলতে দিন পার করেছেন। তারা প্রায়ই ভারী সরঞ্জামের অভাব এবং সরকারি উপস্থিতির সীমাবদ্ধতার কথা অভিযোগ করেছেন। এর মধ্যে শত শত আফটারশক ক্ষতি আরো বাড়িয়েছে এবং বাসিন্দাদের আতঙ্কে রেখেছে।
সরকার জানিয়েছে, এই সপ্তাহের শেষ নাগাদ শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত বেশ কয়েকজন শিশুসহ অন্তত ৩৩ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে, তবে ১০ হাজারেরও বেশি মানুষ এখনও নিখোঁজ রয়েছেন।
উদ্ধারকর্মীরা যখন সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে আরো জীবিতদের খুঁজছেন, তখন রোববার ধসে পড়া একটি ভবনের ধ্বংসস্তূপ থেকে এক বাবা ও তার ছেলেকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। যদিও সরকার নিখোঁজ বা আটকে পড়াদের সংখ্যা শত শত বলে জানিয়েছে, তবে দেশের রাজনৈতিক বিরোধীদের প্রচারিত একটি ওয়েবসাইটে রোববার প্রায় ৫০ হাজার মানুষকে নিখোঁজ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে, যা আগের দিনের ৫৫ হাজার থেকে কিছুটা কম।
সময় সীমিত
ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভে অনুমান করেছে যে, ৭.২ এবং ৭.৫ মাত্রার এই ভূমিকম্পে ১০ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হতে পারে। এটি হলে তা হবে গত শতাব্দীর লাতিন আমেরিকার অন্যতম প্রাণঘাতী ভূমিকম্প।
সুইস উদ্ধারকারী দলের নেতা সেবাস্তিয়ান ইউগস্টার বলেন, ‘সাধারণত প্রায় তিন দিন বা ৭২ ঘণ্টার একটি সময়সীমা থাকে, যার পরে মানুষকে জীবিত বাঁচানোর সম্ভাবনা কমে যায়।’
তিনি আরো জানান, তাদের ৮০ সদস্যের দল আটটি অনুসন্ধানকারী কুকুরের সতর্কবার্তার সাহায্যে ধ্বংসস্তূপের নিচে একাধিক জীবিত মানুষের সন্ধান পেয়েছিল, কিন্তু সময়মতো তাদের টেনে বের করা সম্ভব হয়নি। শনিবার সন্ধ্যায় ভূমিকম্পের পর ৭২ ঘণ্টা পূর্ণ হয়েছে।
উদ্ধারকৃত শিশুরা
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের উদ্ধারকারী দলের মাধ্যমে একটি শিশুকে উদ্ধারের ঘটনাকে স্বাগত জানিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ পোস্ট করা একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, হেলমেট পরা উদ্ধারকারীরা ধ্বংসস্তূপ থেকে কম্বলে জড়ানো এবং ক্রন্দনরত একটি শিশুকে বের করে আনছেন।
রয়টার্স টিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, একটি কলম্বিয়ান উদ্ধারকারী দল স্ক্যানার দিয়ে অবস্থান শনাক্ত করার পর ধ্বংসস্তূপের প্রায় ৩ মিটার গভীরে আটকে থাকা মোইসেস নামের ১১ বছর বয়সি এক ছেলেকে উদ্ধার করেছে। ভাঙা হাত নিয়ে স্ট্রেচারে করে তাকে বের করে আনা হয় এবং দিনের আলোর ধাক্কা থেকে রক্ষা করতে তার চোখ কাপড়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছিল। এই ঘটনায় তার মা ও বোন মারা গেছেন।
কারাবালেদা শহরে ধসে পড়া একটি ভবনে কর্মরত মেক্সিকান উদ্ধারকারীরা আরেকটি ১১ বছর বয়সি ছেলেকে উদ্ধার করেছেন বলে শনিবার শেষ রাতে রদ্রিগেজ এক্স-এ পোস্ট করে জানান। সেখানে দেখা যায় কর্মীরা ধ্বংসস্তূপ থেকে স্ট্রেচারে করে একটি ছোট শিশুকে নিয়ে আসছেন।
বিরোধীদলীয় নেত্রী এবং নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী মারিয়া করিনা মাচাদো গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, তিনি দেশে ফেরার পরিকল্পনা করছেন। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর থেকে তিনি দেশে আত্মগোপনে ছিলেন, যে নির্বাচনে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে বিরোধীরা জয়ী হয়েছিল। পরবর্তীতে গত ডিসেম্বরে নোবেল পুরস্কার গ্রহণের জন্য তিনি দেশ ছাড়েন।
হোয়াইট হাউসের একজন কর্মকর্তা শনিবার রয়টার্সকে জানিয়েছেন, তার দেশে ফেরার বিষয়টি ওয়াশিংটনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অসন্তুষ্ট করছে, কারণ তাদের মতে এই দুর্যোগের পর এটি অত্যন্ত দ্রুত হয়ে যাচ্ছে।
ভেনেজুয়েলার পশ্চিমাঞ্চলীয় ফ্যালকন রাজ্যে একটি বড় বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের পর রোববার দেশটির বৃহত্তম শোধনাগার ৬ লাখ ৪৫ হাজার ব্যারেল উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন 'আমোয়াই' তাদের কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে বলে ওই প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা জানিয়েছেন।
সূত্র: রয়টার্স
এএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


