সোহরাওয়ার্দী অ্যাভিনিউয়ের নাম পাল্টানো নিয়ে বিরক্ত গোপাল পাঁঠার নাতি

বিশেষ প্রতিনিধি, কলকাতা

সোহরাওয়ার্দী অ্যাভিনিউয়ের নাম পাল্টানো নিয়ে বিরক্ত গোপাল পাঁঠার নাতি

শতাব্দী প্রাচীন কলকাতা শহরে মুঘল-পাঠানরা সশরীরে উপস্থিত না থাকলেও মিশে রয়েছে ইতিহাসের ধুলোয়, পুরোনো স্থাপত্যে আর বইয়ের পাতায়। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সাম্প্রতিক মন্তব্য শুনলে মনে হতে পারে, মুঘল আর পাঠানরা যেন শহরের অলিগলিতে ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং তাদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সম্মুখ সমরের প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।

পার্ক সার্কাসের ‘সোহরাওয়ার্দী অ্যাভিনিউ’-এর নাম বদলে ‘গোপাল মুখার্জি রোড’ করার মধ্য দিয়ে যে বিতর্কের সূত্রপাত, তা বিধানসভার অন্দরে এসে সুস্পষ্ট মেরূকরণের রাজনীতিতে রূপ নিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর সাফ কথা—কলকাতায় মুঘল, পাঠান বা বিদেশি কারো নাম থাকবে না। এই মন্তব্য নিছকই শহরের রাস্তাঘাটকে ‘দেশীয়করণ’ করার প্রয়াস নয়, বরং এর গভীরে লুকিয়ে আছে সুচিন্তিত রাজনৈতিক কৌশল, যা সাম্প্রদায়িক উসকানি ও বিভাজনের পথকেই প্রশস্ত করে।

বিজ্ঞাপন

ইতিহাসকে বর্তমানের রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার এই প্রবণতা বাংলার বুকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কলকাতা এমন এক শহর, যার পরতে পরতে জড়িয়ে আছে নানা ভাষা, ধর্ম ও সংস্কৃতির ইতিহাস। সেখানে যখন মুঘল-পাঠানদের নাম মুছে ফেলার ডাক দেওয়া হয়, তখন তা আসলে ধর্মীয় আবেগকে সুড়সুড়ি দিয়ে নির্দিষ্ট ভোট ব্যাংককে সুসংহত করার মরিয়া চেষ্টা হিসেবেই ধরা পড়ে।

বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় বা বিধায়ক সাবিনা ইয়াসমিন যখন বিধানসভায় এই নামবদলের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, তখন মুখ্যমন্ত্রী তাদের কার্ল মার্কস, লেনিন বা মাও সে তুংয়ের প্রসঙ্গ টেনে আক্রমণ করেছেন। স্বামী প্রদীপ্তানন্দ (কার্তিক) মহারাজের মতো সন্ন্যাসীর নেতৃত্বে নামবদলের নতুন কমিটি গঠনের ঘোষণাও এই রাজনৈতিক মেরূকরণেরই সুস্পষ্ট প্রমাণ। বিশেষজ্ঞ বা ইতিহাসবিদদের বদলে একজন ধর্মীয় ব্যক্তিত্বকে এমন গুরুদায়িত্ব দেওয়া চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, এই পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য ইতিহাসের বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন নয়, বরং ধর্মীয় বিভাজনকে উসকে দেওয়া।

কলকাতার সাবেক মেয়র বিকাশ ভট্টাচার্য যথার্থই বলেছেন, আগে রাস্তার নাম বদল করতে হলে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করে কমিটি সিদ্ধান্ত নিত। কিন্তু এখন সেই গণতান্ত্রিক রীতির তোয়াক্কা না করে ইচ্ছামতো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। হাসান সোহরাওয়ার্দী ও গোপাল মুখার্জি উভয়েরই ইতিহাসের পাতায় নিজস্ব অবস্থান রয়েছে, যা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। কিন্তু মুঘল বা পাঠানদের প্রতি অহেতুক ক্ষোভ উগরে দেওয়ার মাধ্যমে শুভেন্দু অধিকারী মূলত বিদ্বেষের রাজনীতিকেই মূল স্রোতে নিয়ে আসতে চাইছেন। যারা শত শত বছর আগে গত হয়েছেন, তাদের কাল্পনিক ছায়াকে শত্রু বানিয়ে এই ধরনের বিভাজনের রাজনীতি আখেরে বাংলার দীর্ঘদিনের সম্প্রীতি ও সহনশীলতার সংস্কৃতির মূলেই আঘাত হানছে।

বিরক্ত গোপাল পাঁঠার নাতি শান্তনু

এদিকে ‘সোহরাওয়ার্দী অ্যাভিনিউ’-এর নাম পাল্টানো নিয়ে বিরক্ত প্রকাশ করেছেন গোপাল পাঁঠার (গোপাল মুখার্জি) নাতি শান্তনু মুখোপাধ্যায়। পরিবারের দীর্ঘদিনের মাংসের ব্যবসার সূত্র ধরেই মানুষের কাছে গোপাল পাঁঠা জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন, তার স্মৃতিবিজড়িত মলঙ্গা লেনের আশপাশেই যদি তার নামে রাস্তার নামকরণ হতো, তবে তা পরিবারের জন্য বেশি স্বস্তিদায়ক হতো বলে মনে করছেন খোদ গোপালের নাতি শান্তনু মুখোপাধ্যায়। পাশাপাশি একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদের নাম সরিয়ে এই নামকরণে খানিকটা অস্বস্তিও যেন লুকিয়ে রয়েছে তার কথায়।

রাস্তার এই নতুন নামকরণের খবর সরকারিভাবে গোপাল পাঁঠার পরিবারের কাছে পৌঁছায়নি। বন্ধুবান্ধব এবং সংবাদমাধ্যমে প্রথম বিষয়টি জানতে পারেন শান্তনু। তাতেও তিনি দুঃখ প্রকাশ করেছেন যে, সরকার জানানোর প্রয়োজনবোধ করল না।

৬৫ নম্বর ওয়ার্ডের পার্ক সার্কাস এলাকায় স্যার হাসান সোহরাওয়ার্দীর বাড়ি-সংলগ্ন রাস্তার নামই ছিল সোহরাওয়ার্দী অ্যাভিনিউ। তিনি যে একজন প্রখ্যাত শল্যচিকিৎসক এবং ১৯৩২ সালে নাইট উপাধিপ্রাপ্ত এক বিরাট মাপের মানুষ ছিলেন, তা জানতেন না শান্তনু। পরে তিনি এই বিষয়ে জানতে পারেন।

এ প্রসঙ্গে তার স্পষ্ট মত, রাস্তার নাম পরিবর্তনের পুরো সিদ্ধান্তটিই সরকারের। তাদের মতামত বা সম্মতি নিয়ে এই কাজ করা হয়নি। আর এমন কোনো নিয়ম আছে বলেও তার জানা নেই।

শান্তনুর আক্ষেপের সুরটি ধরা পড়ে অন্য জায়গায়। পার্ক সার্কাসের বদলে তাদের নিজেদের এলাকা মলঙ্গা লেনের কাছাকাছি কোথাও দাদুর নামে রাস্তা হলে তারা সবচেয়ে বেশি খুশি হতেন। চোখের সামনে প্রতিদিন দাদুর নামের রাস্তা দেখা এবং সেই রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করাটা পরিবারের কাছে নিঃসন্দেহে বিরাট গর্বের ও আনন্দের বিষয় হতো।

ভবিষ্যতে রাজনৈতিক পালাবদলের জেরে অন্য কোনো সরকার যদি ফের এই নাম বাতিল করে দেয়, তবে তা অত্যন্ত কষ্টদায়ক হবে বলে স্বীকার করে নিয়েছেন শান্তনু।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন