নিউ ইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণ

চীনের সঙ্গে ইউরোপের বাণিজ্যযুদ্ধের শঙ্কা, নেপথ্যে কী

আমার দেশ অনলাইন
আমার দেশ অনলাইন

চীনের সঙ্গে ইউরোপের বাণিজ্যযুদ্ধের শঙ্কা, নেপথ্যে কী
ছবি: সংগৃহীত

ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ কূটনীতিক কাজা কাল্লাস সম্প্রতি বলেছেন, চীনের ওপর মহাদেশটির নির্ভরশীলতা শেষ করে আনা অনেকটা রোগ সারানোর চেষ্টা করার মতো। তিনি বলেন, এর জন্য ‘কেমোথেরাপি’ লাগতে পারে এবং তা সম্ভবত যন্ত্রণাদায়ক হবে।

এই মন্তব্য চীনের প্রতি ইউরোপের ক্রমবর্ধমান মনোভাবের একটি উদাহরণ। যুক্তরাষ্ট্রর পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের দ্বিতীয় বৃহত্তম পণ্য বাণিজ্যের অংশীদার হলো চীন।

বিজ্ঞাপন

বেইজিং আগ্রাসী বাণিজ্যনীতি গ্রহণ করায় এবং ইউরোপে চীন থেকে আমদানি বেড়ে যাওয়ায়, ইউরোপীয় নেতারা ও কোম্পানিগুলো চীনা পণ্যের ওপর তাদের নির্ভরতা নিয়ে উদ্বিগ্ন। কীভাবে এই নির্ভরশীলতা কমানো যায়, তা নিয়ে আলোচনা করছেন ইউরোপীয় নেতারা। উৎপাদন ক্ষেত্রে চীনের আধিপত্য বাড়তে থাকায়, ইউরোপ তার নিজস্ব শিল্পের জন্য অস্তিত্বের সংকট দেখতে পাচ্ছে।

ব্রাসেলসের অর্থনৈতিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ব্রুয়েগেলের পরিচালক জেরোমিন জেটেলমেয়ার বলেন, ‘সুরটা মূলত আতঙ্কের। শিল্পের আসন্ন পতন, আসন্ন বিপদের একটি অনুভূতি রয়েছে।’

ব্রাসেলসের উদ্বেগের জবাবে বেইজিংয়ে বৈরী মনোভাব দেখা যাচ্ছে। চীনের কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, যেকোনো প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে পাল্টা পদক্ষেপ নেওয়া হবে। আগামী সপ্তাহগুলোতে এই বাণিজ্য সংঘাত আরো তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

আগামী মাসে ফ্রান্সের এভিয়ানে অনুষ্ঠেয় গ্রুপ অব সেভেন (জি-৭) বৈঠকে বিশ্ব নেতারা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতা নিয়ে আলোচনা করবেন। এর পরপরই ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭ শীর্ষ নেতার বৈঠকে চীন আলোচ্যসূচিতে থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।

শুক্রবার, ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাহী শাখা চীনের প্রতি নীতিমালা নিয়ে একটি প্রাথমিক বিতর্কে অংশ নেবে বলে আশা করা হচ্ছে, যা আসন্ন আলোচনার গতিপথ নির্ধারণে সহায়ক হতে পারে।

ইউরোপীয় কর্মকর্তারা এখনো আশা করছেন যে, চীনের সাথে সহযোগিতামূলকভাবে কাজ করে তারা বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা পরিবর্তন করতে সক্ষম হতে পারেন। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে রপ্তানি বাড়িয়েছে বেইজিং। এরফলে এই ভারসাম্যহীনতা আরো প্রকট হয়েছে। কিন্তু সংবেদনশীল ক্ষেত্রগুলোতে চীনের ক্রমবর্ধমান আধিপত্য রোধ করতে তারা আরো শক্তিশালী বাণিজ্য ও শিল্প সংক্রান্ত পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও ভাবছেন।

চীনের ওপর নির্ভরশীলতা কমানো ইউরোপের জন্য অত্যন্ত কঠিন একটি কাজ হতে পারে। রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা প্রতিশোধের ভয়ে ভীত এবং ভোক্তারা চীনের পণ্যের প্রতি আসক্ত। সস্তা চীনা পণ্য, বিশেষ করে বৈদ্যুতিক যানবাহন ক্রমাগত কিনছে ইউরোপীয়রা। এসব চীনা পণ্য তাদের বাজারে ছেয়ে যাওয়া ঠেকাতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইতোমধ্যেই ব্যর্থ চেষ্টা করেছে।

ব্রাসেলসে অবস্থিত থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ‘মার্কেটর ইনস্টিটিউট ফর চায়না স্টাডিজেন কর্মকর্তা রেবেকা আর্সেসাটি বলেন, ‘আমরা সুবিধাজনক অবস্থানে নেই।’

তিনি বলেন, চীনা পণ্যের ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য আমাদের ব্যবস্থাগুলো তৈরি করা হয়নি।

চীনে সরকারি ভর্তুকি ও বিভিন্ন কর্মসূচি রয়েছে যা দেশটির কারখানা ও কোম্পানিগুলোর অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে। যেহেতু মার্কিন শুল্ক চীনা উৎপাদকদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানিকে জটিল করে তুলেছিল, তাই সেই কারখানাগুলো ইউরোপের মতো বাজারে তাদের রপ্তানি বাড়িয়েছে।

এই বছরের প্রথম ত্রৈমাসিকে, চীন থেকে ইউরোপে আমদানি তীব্রভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। অনলাইন নিউজলেটার সোপবক্স এবং মারকেটর ইনস্টিটিউট ফর চায়না স্টাডিজের করা ২০২৬ সালের শুল্ক তথ্যের এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাপক আগমনের ফলে এই বছরের শুরুতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে চীনের বাণিজ্য ঘাটতি রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে।

এই উল্লম্ফনটি এমন সময়ে ঘটেছে যখন চীনা গাড়ি নির্মাতারা দেশে চাহিদা হ্রাসের সম্মুখীন হয়ে ইউরোপের দিকে ঝুঁকেছে। একই সময়ে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় ইউরোপীয় ভোক্তারা পরিবেশবান্ধব বিকল্পের দিকে ঝুঁকেছে।

এই সম্মিলিত পরিস্থিতি ইউরোপীয় উৎপাদক এবং তাদের কর্মীদের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে, বিশেষ করে জার্মানির মতো দেশগুলোতে। গাড়ি ও রাসায়নিক উৎপাদনে জার্মানির আধিপত্য রয়েছে, তবে দেশটি এখন প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছে।

উদ্বেগ বাড়ার সাথে সাথে ইউরোপ আরো কঠোর ভাষা এবং সাহসী ধারণার দিকে ঝুঁকেছে।

ফরাসি প্রেসিডেন্ট এবং চীনের দীর্ঘদিনের সমালোচক এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ইউরোপীয় ইউনিয়নকে কৌশলগত শিল্পগুলোকে রক্ষা করার জন্য এমন ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন, যা যুক্তরাষ্ট্রের গৃহীত ও ব্যবহৃত ব্যবস্থার অনুরূপ হবে।

স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ, যাকে প্রায়শই ইউরোপের অন্যতম চীন বান্ধব নেতা হিসেবে দেখা হয়, তিনি সম্প্রতি বেইজিং সফরকালে বলেছেন যে চীনে ইউরোপের বাজার উন্মুক্ত হওয়া প্রয়োজন।

স্পেন সম্প্রতি ফ্রান্স, ইতালি, লিথুয়ানিয়া এবং নেদারল্যান্ডসের সাথে যোগ দিয়ে একটি নথি প্রস্তুত করেছে, যেখানে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে। যদিও গবেষণাপত্রটিতে সরাসরি চীনের নাম উল্লেখ করা হয়নি, তবে এতে ‘পদ্ধতিগত ও কাঠামোগত শিল্প অতিরিক্ত উৎপাদনে সক্ষম’ বাণিজ্য অংশীদারদের সমালোচনা করা হয়েছে।

থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ‘কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস’-এর অর্থনীতিবিদ ব্র্যাড সেটসার বলেছেন, প্রতিশোধের ভয়ে অনেক ইউরোপীয় নেতাকে চীনের সাথে সাবধানে চলতে হচ্ছে। কিন্তু তার মতে, জার্মানির মতো জায়গায় উৎপাদন ক্ষতির ভয় হয়তো সেই আশঙ্কাকে ছাপিয়ে যেতে পারে।

ইউরোপ ইতোমধ্যেই নিজেদের সুরক্ষার জন্য কিছু পদক্ষেপ নিচ্ছে, যার মধ্যে রয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রস্তাবিত ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাক্সিলারেটর অ্যাক্ট’—একটি ব্যাপক নীতি যা জোটটির উৎপাদন ভিত্তি পুনর্গঠনের উদ্দেশ্যে তৈরি।

এই নীতির বিরুদ্ধে বেইজিং তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে এই পরিকল্পনাকে সংরক্ষণবাদী বলে নিন্দা করেছে এবং প্রতিশোধের হুঁশিয়ারি দিয়েছে।

কিন্তু বাণিজ্য ক্ষেত্রে চীনের নিজস্ব ক্রমবর্ধমান আগ্রাসী মনোভাব ইউরোপীয় প্রতিক্রিয়াকে আরো তীব্র করতে সাহায্য করেছে।

গত বছর, মার্কিন শুল্কের প্রতিশোধ হিসেবে চীন দুইবার বিরল খনিজ এবং চুম্বকের রপ্তানি নিষিদ্ধ করেছিল। এই নিষেধাজ্ঞাগুলো ইউরোপে আঘাত হেনেছে। এসব বিরল খনিজ উচ্চ-প্রযুক্তি পণ্য উৎপাদনে ব্যবহার করা হয়।

সরবরাহে এই বিপর্যয় ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর কাছে স্পষ্ট করে দিয়েছে যে তারা কতটা নির্ভরশীল ছিল।

এপ্রিলে, বেইজিং এমন নিয়মকানুন প্রকাশ করেছে যা কর্মকর্তাদের কর্পোরেট নথি পরীক্ষা করা, কর্মচারীদের জিজ্ঞাসাবাদ করা এবং এমনকি নির্বাহীদের চীন ত্যাগ করতে বাধা দেওয়ার ক্ষমতা দেয়, যদি প্রমাণিত হয় যে তারা দেশের বাইরে সরবরাহ শৃঙ্খল স্থানান্তরে সহায়তা করছে।

চীনে অবস্থিত ইউরোপীয় চেম্বার অব কমার্সের সাম্প্রতিক পর্যালোচনা অনুযায়ী, এই পদক্ষেপটি ইউরোপের অর্থনীতিকে অভূতপূর্ব মাত্রার ক্ষতি করতে পারে।

গবেষণা সংস্থা রোডিয়াম গ্রুপের ইউরোপীয়-চীনা সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ নোয়া বার্কিন বলেছেন, চীনের এই পাল্টা পদক্ষেপের আংশিক কারণ হলো, ওয়াশিংটন ও ব্রাসেলসের মধ্যে বিরোধের ফলে বেইজিং তার বাণিজ্য নীতির বিরুদ্ধে একটি দুর্বল ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের আভাস পাচ্ছে।

বার্কিন বলেন, ইউরোপের প্রতি বেইজিংয়ের বার্তা হলো, ‘তোমাদের চিরকালের সেরা বন্ধু চলে গেছে এবং এমনকি আমেরিকানরাও আমাদের সাথে স্থিতিশীলতা খুঁজছে, তাই আমাদের পরীক্ষা করতে এসো না।’

আরএ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...