কৃত্রিম মেধা বা এআই প্রযুক্তি নিয়ে ২৯টি দেশের নতুন সংগঠনের নেতৃত্ব দিচ্ছে চীন। সংগঠনটির নাম ‘ওয়ার্ল্ড আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কো-অপারেশন অর্গানাইজ়েশন’ বা ওয়াইকো। সম্প্রতি এই জোটের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। জল্পনা বাড়ছে—এর জেরে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দ্বিধাবিভক্ত হবে এআই বিশ্ব।
চলতি বছরের জুলাইয়ের তৃতীয় সপ্তাহে কৃত্রিম মেধার শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজন করে চীন। সাংহাইতে হওয়া সেই অনুষ্ঠানে গঠিত হয় ওয়াইকো জোট। সেখানে হাজির ছিলেন জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস। সংশ্লিষ্ট সংগঠনের জন্ম হতেই এআই নিয়ে তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেন প্রেসিডেন্ট শি। একে অত্যন্ত বাস্তব ভূ-রাজনৈতিক বার্তা হিসাবেই দেখা হচ্ছে।
সাংহাইয়ের সম্মেলনে জিনপিং বলেন, ‘ওয়াইকোর উদ্দেশ্য হলো কৃত্রিম মেধার ক্ষেত্রে সহযোগিতা। এই প্রযুক্তির উপর সুনির্দিষ্ট কোনো রাষ্ট্রের আধিপত্য থাকা উচিত নয়।’ বিশেষজ্ঞদের দাবি, এই বক্তব্যের মধ্যে দিয়ে নাম না করে যুক্তরাষ্ট্রকে খোঁচা দিয়েছেন তিনি। অনুষ্ঠানে নিজেদের শক্তি দেখাতে বেশ কিছু অত্যাধুনিক প্রযুক্তি প্রদর্শনও করতে দেখা যায় বেইজিংকে।
গত কয়েক বছর ধরেই কৃত্রিম মেধার লড়াইতে একে অপরকে টেক্কা দেওয়ার চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন। সাম্প্রতিক সময়ে বেইজিংয়ের এআই মডেলগুলো বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। আর তাই কৃত্রিম মেধার ক্ষেত্রে নিজেকে বিশ্বনেতা হিসাবে তুলে ধরার মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে চীন। সেখানে এখনও এক নম্বর স্থানটি ধরে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র।
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের কৃত্রিম মেধা মডেলগুলির মধ্যে মূল পার্থক্য হলো খরচ। যে এআই প্রযুক্তি তৈরিতে কোটি কোটি ডলার ব্যয় করেছে যুক্তরাষ্ট্র, অত্যন্ত সস্তায় সেটা বাজারে আনতে দেখা যাচ্ছে বেইজিংয়ের সংস্থাকে। সব ক্ষেত্রে এই যুক্তি যে প্রযোজ্য, তা একেবারেই নয়। তবে বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে ওয়াশিংটনের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন এটাই।
আর তাই সাংহাইয়ের অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট শি বলেন, ‘চীন এআইয়ের ব্যাপারে ঐতিহাসিক অবিচার বন্ধ করার পক্ষপাতী। ওপেন সোর্স থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে আমাদের কৃত্রিম মেধার মডেলগুলি চলছে। সেই সুযোগ গ্রহণের জন্য ওয়াইকোর সদস্যদের আহ্বান জানাচ্ছি। এই প্রযুক্তির উন্নতি এবং তাতে সবার ন্যায়সঙ্গত অধিকার নিশ্চিত করতে বেইজিং বদ্ধপরিকর।’
বর্তমানে আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা এবং এশিয়ার বেশ কিছু দেশে চালু আছে চীনের কৃত্রিম মেধা প্রযুক্তি। আপাতত সেই সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে বলে ঘোষণা করেছে জিনপিং প্রশাসন। প্রেসিডেন্ট শি-র কথায়, ‘উন্নত এআই প্রযুক্তির বিকাশ কোনো একটি দেশের একক কৃতিত্ব হওয়া উচিত নয়। বরং একাধিক রাষ্ট্রের যোগদানের মাধ্যমে তাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই ভালো।’
চীনের অভিযোগ, এআই মডেল সবার সঙ্গে সমানভাবে ভাগ করে নিতে নারাজ যুক্তরাষ্ট্র। মাঝেমধ্যেই জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাত দিয়ে বহু রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিটি ব্যবহারে বাধা সৃষ্টি করে থাকে ওয়াশিংটন। যুক্তরাষ্ট্রের এমন স্বার্থপর নীতির প্রবল বিরোধী বেইজিং। সেই কারণেই ২৯টি বন্ধুরাষ্ট্রকে নিয়ে গঠিত ওয়াইকো জোটকে শক্তিশালী করার মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে চীন।
গত বছরের জুলাইতে প্রথম বার ওয়াইকো গঠনের নকশা প্রকাশ্যে আনেন চীনা প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং। বর্তমানে সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীটিতে রয়েছে রাশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ব্রাজ়িল, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, সেনেগাল এবং পাকিস্তান। মূলত দক্ষিণ গোলার্ধের প্রায় সমস্ত দেশকে এর অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা নিয়েছে বেইজিং।
ওয়াইকো গঠনে চীনের উদ্যোগী হওয়ার নেপথ্যে একাধিক কারণ রয়েছে। প্রথমত, আগামী দিনে কৃত্রিম মেধা প্রযুক্তি নিয়ে বেশ কিছু আন্তর্জাতিক আইন তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে জাতিসংঘের। তাতে মার্কিন প্রভাব থাকার সম্ভাবনা ষোলো আনা। ২৯ রাষ্ট্রের এই জোটকে সামনে রেখে সেটাকে আপাতত আটকাতে চাইছে বেইজিং। পাশাপাশি, নিয়মকানুনও নিজেদের মতো করার ইচ্ছা আছে তাদের।
দ্বিতীয়ত, বেইজিংয়ের শিল্পনীতির বড় অংশ জুড়ে আছে কৃত্রিম মেধা। এই প্রযুক্তির জন্য চাই বিপুল পরিমাণের র্যাম ও স্টোরেজ চিপ। এর সিংহভাগ বর্তমানে তৈরি হয় চীনে। তাছাড়া চিপ নির্মাণের অন্যতম কাঁচামাল বিরল খনিজের উপরও শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ রয়েছে চীনের। সেই অবস্থা অক্ষত রাখতেই ২৯ রাষ্ট্রের জোট গঠন করেছেন প্রেসিডেন্ট শি, দাবি বিশ্লেষকদের একাংশের।
তবে কৃত্রিম মেধা প্রযুক্তির লড়াইতে চীনের থেকে এখনও অনেকটাই এগিয়ে আছে যুক্তরাষ্ট্র। এআই-ভিত্তিক হাতিয়ার নির্মাণে জোর দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এর জেরে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে তীব্র হচ্ছে চিপ-যুদ্ধ। কৃত্রিম মেধা প্রযুক্তি চালাতে চাই বিশাল বিশাল তথ্যভান্ডার বা ডেটা সেন্টার। এর জন্য বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধিরও প্রয়োজন রয়েছে। সেখানে আবার মার্কিন সরকারের থেকে এগিয়ে আছে জিনপিং প্রশাসন।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের থেকে দ্বিগুণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে চীন। শুধু তা-ই নয়, দামের নিরিখে বেইজিংয়ের তড়িৎশক্তি অনেক সস্তা। তবে জটিল প্রযুক্তি রফতানিতে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা জারি করায় এআই উন্নয়নের সূচক চীনে কিছুটা থমকে গিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে নতুন জোট তৈরি করে কৃত্রিম মেধায় প্রেসিডেন্ট শি যে আধিপত্য চাইছেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
বিষয়টি নিয়ে এরইমধ্যে গণমাধ্যমে মুখ খুলেছেন মার্কিন থিঙ্ক ট্যাঙ্ক কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের গবেষক অরিন্দ্রজিৎ বসু। তার কথায়, ‘কৃত্রিম মেধা ও সাইবার সুরক্ষা নীতির ক্ষেত্রে বিশ্বকে কোনো একটা দিক বেছে নিতে হবে। হয় তারা আমেরিকার দিকে যাবেন, নয়তো চীন। তৃতীয় পক্ষ হিসাবে থাকা বেশ কঠিন। ওয়াইকো তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।’
গত বছরের ডিসেম্বরে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে চীনা নিয়ন্ত্রণ কমাতে কৌশলগত অংশীদারদের নিয়ে ‘প্যাক্স সিলিকা’ গঠনের কথা ঘোষণা করে আমেরিকা। গোড়ায় এই জোটের সদস্য ছিল না ভারত। কিন্তু, এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে নয়াদিল্লিতে চলা কৃত্রিম মেধাভিত্তিক সম্মেলনে সংশ্লিষ্ট চুক্তিতে সই করে মোদী প্রশাসন।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, সিলিকন উপত্যকার সরবরাহ শৃঙ্খলকে সমৃদ্ধশালী, নিরাপদ এবং উদ্ভাবনী শক্তিসম্পন্ন হিসাবে গড়ে তুলতে এই জোট গঠন করা হয়েছে। মূলত বিরল খনিজ এবং এআই-এর সরবরাহ শৃঙ্খলকে প্রসারিত করতেই এই উদ্যোগ। শুধু তা-ই নয়, এই জোটে থাকা সদস্য দেশগুলোর মধ্যে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর বা চিপের সরবরাহ নিশ্চিত করাও লক্ষ্য।
চুক্তি স্বাক্ষরের পর ভারতের কেন্দ্রীয় তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব বলেন, ‘ভারত ‘প্যাক্স সিলিকা’র অংশ হয়েছে উঠল। এর ফলে ভারতের বৈদ্যুতিক এবং সেমিকন্ডাক্টর ক্ষেত্রে ভালো উন্নতি হবে। ভারতে এরইমধ্যে সেমিকন্ডার প্লান্ট তৈরি হয়েছে। খুব শীঘ্রই সেখানে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হবে। প্যাক্স সিলিকার জন্য সেটা গুরুত্বপূর্ণ। এতে উপকৃত হবে ভারতের যুবসমাজ।’
মার্কিন নেতৃত্বাধীন ‘প্যাক্স সিলিকা’য় ভারত ছাড়াও রয়েছে অস্ট্রেলিয়া, গ্রিস, ইসরাইল, জাপান, কাতার, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, ব্রিটেন ও সংযুক্ত আবর আমিরাত। আগামী দিনে চীনের ওয়াইকো একে কতটা কড়া টক্কর দিতে পারে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
সূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


