ইরান–যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ বন্ধের সম্ভাবনা আবারও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে গতকাল মঙ্গলবার সমুদ্রপথে দুটি পৃথক হামলার ঘটনা ঘটেছে। ইয়েমেনের ইরানপন্থি হুথি বিদ্রোহীরা লোহিতসাগরের বাব এল–মান্দেব প্রণালিতে একটি জাহাজে হামলা চালিয়েছে। একই দিনে ইরানের বন্দরগুলোর নৌ অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করা একটি জাহাজে হামলা চালিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী।
ইয়েমেনের পরিবহন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বাব এল–মান্দেব প্রণালিতে মিসরীয় মালিকানাধীন পণ্যবাহী জাহাজ তিহামাহতে সন্দেহভাজন হুথি হামলায় চার নাবিক নিহত হয়েছেন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে তিনজন পাকিস্তানি ও একজন ইন্দোনেশীয়।
রয়টার্স জানিয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর পর জাহাজে হুথিদের হামলায় প্রাণহানির ঘটনা এবারই প্রথম।
হুথিদের নিয়ন্ত্রিত বার্তা সংস্থা সাবা জানিয়েছে, তিহামাহ জাহাজটি সৌদি আরবের জন্য সামরিক সরঞ্জাম বহন করছিল। তবে এ হামলার বিষয়ে সৌদি সরকারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, উপসাগরীয় ওমান সাগরে পানামার পতাকাবাহী একটি পণ্যবাহী জাহাজে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
মার্কিন সামরিক বাহিনী বলেছে, জাহাজটি ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত নৌ অবরোধ লঙ্ঘন করছিল। বারবার সতর্ক করার পরও জাহাজটি থামেনি।
পরে মার্কিন নৌবাহিনীর একটি হেলিকপ্টার থেকে জাহাজটিতে দুটি হেলফায়ার ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়। এতে জাহাজটির দিক পরিবর্তনের যন্ত্র অকার্যকর করে দেওয়া হয়।
পাঁচ মাস ধরে চলা ইরান যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা যখন আবারও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে, তখন এসব হামলার ঘটনা ঘটল। যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কমে যাওয়ায় গতকাল বিশ্ববাজারে তেলের দামও আরেক দফা বেড়েছে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক শেয়ারবাজারে দরপতন হয়েছে।
ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোহসেন রেজাই গতকাল বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের শর্ত মেনে না নিলে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি জাহাজ চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হবে না।
ইরানের আধা সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিমকে দেওয়া বক্তব্যে রেজাই বলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের জব্দ করা সম্পদ ছেড়ে দিতে হবে। পাশাপাশি লেবানন ও গাজাসহ পুরো অঞ্চলে যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে। এসব শর্ত মেনে নেওয়া না হলে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকবে।
যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো। ফলে এই পথ দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ ও দামের ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে মাত্র ছয়টি জাহাজ চলাচল করেছে। যুদ্ধের আগে প্রতিদিন এই পথে সাধারণত ১৩০ থেকে ১৪০টি জাহাজ চলাচল করত।
ইরানের এই অবস্থানের আগে সোমবার নতুন একটি দাবি তুলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, গত ৫০ বছরের যুদ্ধ, হামলা ও বিক্ষোভে নিহত ব্যক্তিদের জন্য ইরানকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
যুদ্ধের পুরো সময়জুড়েই ট্রাম্প কখনো সংঘাত আরো বাড়ানোর হুমকি দিয়েছেন। আবার কখনো বলেছেন, শান্তিচুক্তি শিগগিরই হতে পারে।
সোমবার রাতে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, বর্তমান অনিশ্চয়তা আরও কিছুদিন চলতে পারে।
ইরানের সঙ্গে আলোচনার প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, তিনি একধরনের আলোচনা চালাচ্ছেন। ইরানিরা আলোচনার ক্ষেত্রে খুবই ধূর্ত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
রেজাইয়ের বক্তব্যকে হরমুজ প্রণালি খোলার বিষয়ে এখন পর্যন্ত ইরানের সবচেয়ে কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। তাঁর বক্তব্যের বিষয়ে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) কমান্ডারের উপদেষ্টা মোহাম্মদ রেজা নাকদি আরও সংঘাতের ইঙ্গিত দিয়েছেন। গতকাল ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, বিপ্লবী গার্ড এমন সক্ষমতা তৈরি করছে, যাতে প্রয়োজন হলে এবং নির্দেশ দেওয়া হলে শত্রুর ভূখণ্ডে অভিযান চালানো যায়।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা শুরুর পর থেকে সংঘাতে হাজারো মানুষ নিহত হয়েছেন। পাল্টা হামলায় ওমান, জর্ডান, কুয়েত, ইসরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে মার্কিন স্থাপনা ও অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছে ইরান।
এদিকে লোহিত সাগরের বাব এল–মান্দাব ও হরমুজ—দুটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথেই জাহাজ চলাচল কমে গেছে। যুদ্ধ থামানোর কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে আরো বড় ধরনের চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
এএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

