বিস্তীর্ণ এলাকা ডুবে আছে পানির নিচে

কক্সবাজারে বন্যায় ২৪ জনের প্রাণহানি

আনছার হোসেন, কক্সবাজার

কক্সবাজারে বন্যায় ২৪ জনের প্রাণহানি
ছবি: আমার দেশ

টানা ভারি বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলে কক্সবাজারের চকরিয়া, পেকুয়া, মাতামুহুরী উপজেলাসহ জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা এখনো পানির নিচে তলিয়ে আছে। কোথাও কোথাও কোমর পরিমাণ পানি ঢুকে গেছে বাড়িঘরে। যদিও শুক্রবার সকাল থেকে বৃষ্টিপাত কিছুটা কমে এসেছে। তবে বৃষ্টি কমলেও জেলার বিস্তীর্ণ এলাকার ৫ লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে আছে।

এদিকে বন্যার পানিতে ঘর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার সময় নৌকা ডুবে চকরিয়া হাসনাতুল জান্নাত ঝর্ণা ও শাওরিন মনি নামে দুই বোনের মৃত্যু হয়েছে। যদিও তাদের বাবা আব্দুল মালেক, তার স্ত্রী ও আরেক সন্তান প্রাণে বেঁচে গেছেন।

বিজ্ঞাপন

অপরদিকে টানা ছয় দিন ধরে পানির নিচে তলিয়ে থাকায় জেলার বন্যাকবলিত এলাকার সড়কের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। পানি নেমে গেলে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র ফুটে উঠবে বলে মনে করছেন স্থানীয় লোকজন।

শুক্রবার বৃষ্টি কম হওয়ায় পানির উচ্চতা কিছুটা কমে এলেও কক্সবাজারের দুই প্রধান নদী বাঁকখালী ও মাতামুহুরীর পানি দ্বিতীয় দিনের মতো বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

এই দুর্যোগে জেলায় অতিবৃষ্টিপাতে পাহাড়ধস, দেয়ালচাপা ও পানিতে ডুবে অন্তত ২৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। গেলো পাঁচ দিনের এ ঘটনায় শুধু রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরেই ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছে বিশজনের অধিক মানুষ।

গত রোববার থেকে টানা বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় জেলার বহু বসতবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গ্রামীণ সড়ক তলিয়ে গিয়ে জনজীবন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। কোনো কোনো সড়কে পানি উঠে পড়ায় যান চলাচলেও ব্যাঘাত ঘটছে।

স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, টানা বৃষ্টিপাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চকরিয়া ও পেকুয়া উপজেলার রাজাখালী, মগনামা ও উজানটিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামীণ এলাকা।

প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে জেলার ৩৫টি ইউনিয়নের শতাধিক গ্রামের মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মধ্যে রয়েছে টইটং ইউনিয়নের হাজীবাজার ও সোনাইছড়ি, শিলখালী ইউনিয়নের হেদায়াতাবাদ, মাঝেরঘোনা, কাছারীমোড়া ও পেঠান মাতবরপাড়া, রাজাখালীর বামুলাপাড়া, মৌলভীপাড়া, উলুডিয়াপাড়া, মগনামার শরৎঘোনা, পশ্চিম বাজারপাড়া, ধারিয়াখালী, ধরদরীঘোনা, মটকাভাঙা, চেরাংঘোনা, মরিচ্যাদিয়া, রঙ্গিয়াখালী, মগঘোনা, মাঝিরপাড়া ও মৌলভীপাড়া, উজানটিয়ার মিয়াপাড়া, সাবখালীপাড়া, ঘোষলপাড়া, পেকুয়ারচর ও পেরাসিংগাপাড়া, পেকুয়া সদর ইউনিয়নের মোরারপাড়া, সৈকতপাড়া, পূর্ব মেহেরনামা ও পশ্চিম গোয়াখালী এবং বারবাকিয়া ইউনিয়নের পাহাড়িয়াখালী গ্রাম।

স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, জেলার বিভিন্ন এলাকায় অনেক পরিবারে ঘরে পানি ঢুকে পড়েছে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি গ্রামীণ সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় যাতায়াতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। অনেক পরিবার নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে।

পেকুয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও পেকুয়া সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম বাহাদুর শাহ সাংবাদিকদের বলেন, নবগঠিত পেকুয়া পৌর এলাকায় জলাবদ্ধতা নিরসনে পেকুয়া বাজারের জেনারেল হাসপাতাল থেকে বাজারের পশ্চিম মাথা পর্যন্ত কহেলখালী খালের প্রয়োজনীয় জায়গায় ময়লা-আবর্জনা অপসারণ করে দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়াও খুলে দেয়া হয়েছে প্রবাহমান খালের ওয়াপদা সংলগ্ন স্লুইচ গেট।

পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রফিকুল ইসলাম বলেন, অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের ফলে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় ঝুকিপূর্ণ এলাকা পরিদর্শন করে উপজেলা প্রশাসন সার্বিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণের পাশাপাশি পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত নিম্নাঞ্চল ও পাহাড়সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।

অন্যদিকে চকরিয়া কাকারা ফাহাশিয়া খালী লক্ষেশ্বর করইয়া ঘোনা বমুবিলছড়ি চকরিয়া পৌরসভার বিভিন্ন ওয়ার্ড পানিতে তলিয়ে গেছে। এমনকি চকরিয়া সরকারি কলেজেও হাঁটু পরিমাণ পানি ঢুকে পড়েছে। এতে ক্লাসসহ দাপ্তরিক কাজ করতে পারছে না কলেজ কর্তৃপক্ষ।

আশ্রয়ে যাওয়া হলো না, নৌকা উল্টে দুই বোনের মৃত্যু

বন্যার পানিতে ঘর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার স্বপ্ন ছিল আবদুল মালেক পরিবারের। কিন্তু সেই পথই হয়ে উঠল মৃত্যুর ফাঁদ। ঝড়ো বাতাসে ডিঙি নৌকা উল্টে তার স্ত্রী ও দুই সন্তান প্রাণে বাঁচলেও নিখোঁজ হয় ১৩ বছরের মেয়ে হাসনাতুল জন্নাত ঝর্ণা ও ৭ বছর বয়সী শাওরিন মনি। টানা চার ঘণ্টার উদ্বেগ, কান্না আর অপেক্ষার পর অবশেষে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল তাদের নিথর দেহ উদ্ধার করে।

শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টায় কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নের রসুলাবাদ এলাকায় এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। দুপুর দেড়টার দিকে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল ঝর্ণার মরদেহ উদ্ধার করে। মুমুর্ষ অবস্থায় উদ্ধার হওয়া শাওরিন মনিকে হাসপাতালে নেয়া হলে সেখানে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়।

নিহত হাসনাতুল জন্নাত ঝর্ণা (১৩) ও শাওরিন মনি (৭) ওই এলাকার কৃষক আবদুল মালেকের মেয়ে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কয়েক দিনের টানা ভারী বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলে বাড়ির চারপাশ তলিয়ে যায়। পানি বাড়তে থাকায় স্ত্রী ও তিন মেয়েকে নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন আবদুল মালেক। প্রয়োজনীয় কিছু জিনিসপত্র নিয়ে একটি ছোট ডিঙি নৌকায় রওনা হন তারা। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই ঝড়ো বাতাসে নৌকাটি ডুবে যায়।

এদিকে মুমূর্ষ অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে নেয়া হলে তাকেও মৃত ঘোষণা করা হয়।

পরিবারের সদস্যরা প্রাণপণ চেষ্টা করে বাঁচতে সক্ষম হলেও স্রোতের পানিতে ভেসে যায় কিশোরী ঝর্ণা। তার মা লাকি আক্তার (৩১) এবং দুই বোন জেরিন মনি (৯) ও শাওরিন মনি (৭) সাঁতার কেটে তীরে উঠতে পারলেও ঝর্ণাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। খবর পেয়ে চকরিয়া ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। পরে চট্টগ্রাম থেকে ডুবুরি দল এনে পানির নিচে তল্লাশি চালানো হয়।

চকরিয়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের স্টেশন কর্মকর্তা দিদারুল হক সাংবাদিকদের বলেন, বন্যার পানিতে নৌকাডুবির ঘটনায় এক কিশোরী নিখোঁজ হওয়ার খবর পেয়ে উদ্ধার অভিযান শুরু করা হয়। পরে ডুবুরি দলের সহায়তায় প্রায় ৪ ঘণ্টা পর একজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারের পর হাসপাতালে নেয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

বরইতলী ইউনিয়ন পরিষদের ২ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য কাইছার উদ্দিন বলেন, পরিবারটি শুধু নিরাপদ জায়গায় যেতে চেয়েছিল। কিন্তু দুর্যোগের মধ্যে সেই যাত্রাই তাদের জীবনে সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তিনি বলেন, এ ঘটনায় আহত দুই বোন জেরিন মনি ও শাওরিন মনিকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।

পাহাড় ধস ও পানিতে ডুবে ২৪ জনের মৃত্যু

টানা বৃষ্টিপাতে কক্সবাজার জেলায় গত পাঁচদিনে পাহাড় ধস, দেয়াল চাপা পড়ে ও বন্যার পানিতে ডুবে ২৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে পাঁচ দফা পাহাড় ধসে ১৫ জনের মৃত্যু হয়। এছাড়া কক্সবাজার শহরে দুজন, চকরিয়া উপজেলায় তিনজন, পেকুয়া উপজেলায় একজন, উখিয়ার মরিচ্ছা এলাকায় একজন, মহেশখালী উপজেলায় একজন ও কুতুবদিয়া উপজেলায় একজনের মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে দুজন পাহাড় ধসে ঘরের দেয়াল চাপা পড়ে মারা যান।

রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে নিহতদের মধ্যে অধিকাংশই শিশু। যাদের মধ্যে গত বুধবার দুপুরে মাদ্রাসায় লেখাপড়া করার সময় পাহাড় ধসে ৫ শিশু শিক্ষার্থী মারা যায়।

এদিকে বৃহস্পতিবার দিনপূর্ব রাত দেড়টার চকরিয়া উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মছনিয়া কাটার ডবলতলী এলাকায় পাহাড় ধসের ঘটনায় দুই শিশু মারা যায়।

দুই নদীর পানি দুই দিন ধরে বিপৎসীমার উপরে

কক্সবাজার জেলার দুই প্রধান নদী বাঁকখালী ও মাতামুহুরী নদীর পানি অতিবৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলে দ্বিতীয় দিনের মতো বিপদসীমার উপর দিয়ে অতিক্রম করেছে।

কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম জানিয়েছেন, শুক্রবার বৃষ্টি কিছুটা কমে আসায় জেলার প্রধান দুই নদী বাঁকখালী ও মাতামুহুরীর দ্বিতীয় দিনের মতো বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

বাঁকখালী নদীর বিপদসীমা ৫ দশমিক ৭৯ মিটার ও মাতামুহুরী নদীর বিপদসীমা ৫ দশমিক ৮০ মিটার বলে জানিয়েছেন তিনি।

তিনি জানান, জেলার কোথাও বেড়িবাঁধ ভেঙে পানি ঢোকার ঘটনা ঘটেনি। শুধুমাত্র চকরিয়া উপজেলার কোনাখালী ইউনিয়নে বেড়িবাঁধ উপচে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করেছিল।

পাঁচ দিনে ৫৪৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড

কক্সবাজার আবহাওয়া অধিদপ্তরের সহকারী আবহাওয়াবিদ আব্দুল হান্নান জানিয়েছেন, শুক্রবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত গেলো ২৪ ঘন্টায় জেলায় ৭১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

ইতোপূর্বে গত রোববার থেকে টানা ৫ দিনে কক্সবাজার জেলায় ৫৪৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

আব্দুল হান্নান জানান, আগামী ১১ জুলাই পর্যন্ত এই বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকবে।

জেলা প্রশাসনের সতর্কতা

কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের জারি করা গণবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, কক্সবাজার সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত বহাল রয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী আগামী কয়েকদিন ভারী থেকে অতিভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে। এ অবস্থায় যে কোনো ধরনের প্রাণহানি এড়াতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের দ্রুত নিকটস্থ সাইক্লোন শেল্টার বা নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। জরুরি প্রয়োজনে জেলা প্রশাসনের কন্ট্রোল রুমের ০১৮৭২৬১৫১৩২ নম্বরে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানিয়েছেন, জেলার ৬৪৮টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। উদ্ধার, ত্রাণ ও জরুরি সহায়তা কার্যক্রম সময়ের জন্য জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে একটি কন্ট্রোল রুম চালু করা হয়েছে। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া কেটে না যাওয়া পর্যন্ত সবাইকে সতর্ক থাকার এবং সরকারি নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানান তিনি।

এমএইচ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...