চট্টগ্রাম মহানগর যুবদলের কমিটি নেই ২১ মাস

এম কে মনির, চট্টগ্রাম

চট্টগ্রাম মহানগর যুবদলের কমিটি নেই ২১ মাস

দীর্ঘ ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে চট্টগ্রাম মহানগর যুবদলের নেতাকর্মীদের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। আন্দোলন করতে গিয়ে কেউ পুলিশের গুলিতে আহত হয়ে স্থায়ী পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন, কেউ কারাবন্দি অবস্থায় হারিয়েছেন পরিবারের আপনজন। আবার কেউ মামলা, হামলা ও নির্যাতনের কারণে হারিয়েছেন ব্যবসা-ক্যারিয়ার। তবে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর দলের সুসময়ে সাংগঠনিক পরিচয়হীনতায় হতাশ হয়ে পড়েছেন সংগঠনের অনেক নেতাকর্মী।

কারণ, গত ২১ মাস ধরে কমিটিহীন অবস্থায় রয়েছে চট্টগ্রাম মহানগর যুবদল। জুলাই বিপ্লবের পর একটি হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে মহানগর যুবদলের অধীন সব কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। এরপর দীর্ঘ সময় পার হলেও নতুন কমিটি ঘোষণা হয়নি।

বিজ্ঞাপন

দলীয় সূত্র জানায়, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থাকা বিএনপির অনেক নেতা বর্তমানে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন। কেউ সংসদ সদস্য, কেউ মন্ত্রী বা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে দায়িত্ব পেয়েছেন। কিন্তু দীর্ঘদিন রাজপথে থাকা যুবদলের নেতাকর্মীদের খোঁজ নেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে তৃণমূল পর্যায়ে হতাশা বাড়ছে । একই সঙ্গে সাংগঠনিক স্থবিরতাও কাটছে না।

জানা যায়, ২০১৮ সালে দুই বছরের জন্য গঠিত চট্টগ্রাম মহানগর যুবদলের কমিটি প্রায় সাত বছর দায়িত্ব পালন করে। ২৩১ সদস্যের ওই কমিটি ২০২৪ সালের ২১ সেপ্টেম্বর বিলুপ্ত করা হয়। তবে এখন পর্যন্ত নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়নি।

যুবদল সূত্রে জানা গেছে, জুলাই বিপ্লবের পর নগরীতে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে এক যুবদল কর্মী নিহতের ঘটনার পর মহানগর যুবদল, ১৫টি থানা ও ৪১টি ওয়ার্ড কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়। এরপর থেকে সংগঠনটি কার্যত অভিভাবকহীন হয়ে পড়ে বলে দাবি তৃণমূল নেতাকর্মীদের।

তাদের অভিযোগ, কমিটি না থাকায় নতুন নেতৃত্ব তৈরি হচ্ছে না। একই সঙ্গে দলীয় কর্মসূচিতে অংশগ্রহণও আগের তুলনায় কমেছে। নেই কার্যকর জবাবদিহিতা ও সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ। ফলে কেউ কেউ পদ-পদবির অপব্যবহার, চাঁদাবাজি ও দখলসহ নানা অনিয়মে জড়িয়ে পড়ার সুযোগ পাচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

নেতাকর্মীরা জানান, ২১ মাস ধরে মহানগর যুবদল থেকে উল্লেখযোগ্য কোনো সাংগঠনিক বিবৃতি আসেনি। স্থানীয় পর্যায়ের অনেক সমস্যাও কেন্দ্র পর্যন্ত পৌঁছাতে দেরি হচ্ছে। এতে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা দুর্বল হয়ে পড়ছে।

জানা যায়, ২০১৮ সালে মোশাররফ হোসেন দীপ্তিকে সভাপতি এবং মো. সাহেদকে সাধারণ সম্পাদক করে পাঁচ সদস্যের আংশিক কমিটি ঘোষণা করেছিল কেন্দ্রীয় যুবদল। পরে ২৩১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হয়। এরপর আর নতুন কমিটি হয়নি।

আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে এই কমিটিই নেতৃত্ব দেয়। নেতাকর্মীদের দাবি, ওই সময়ে মামলা, হামলা ও গ্রেপ্তারের মধ্যেও তারা সংগঠনকে সক্রিয় রেখেছিলেন। তবে বর্তমানে কমিটি না থাকায় দীর্ঘদিনের ত্যাগী নেতাকর্মীরা সাংগঠনিক মূল্যায়ন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

তৃণমূল নেতারা বলছেন, নগর ছাত্রদলের কমিটি ২০২০ সালে ঘোষণা হওয়ায় আগের অনেক নেতা সাংগঠনিকভাবে জায়গা পাননি। কেউ কেউ স্বেচ্ছাসেবক দলে গেলেও অনেকে যুবদলে যুক্ত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন। কিন্তু নতুন কমিটি না হওয়ায় সেই প্রক্রিয়াও আটকে আছে।

নতুন কমিটির অপেক্ষায় পদপ্রত্যাশীরা

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে মহানগর যুবদলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে আগ্রহীদের কাছ থেকে জীবনবৃত্তান্ত নেয় কেন্দ্রীয় কমিটি। পরে ফেব্রুয়ারিতে ৮৫ জন নেতার সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়।

সভাপতি পদে আলোচনায় রয়েছেন বিলুপ্ত কমিটির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ সাহেদ, ইকবাল হোসেন, এইচ এম রাশেদ খান ও সাহেদ আকবর। সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় রয়েছেন বিলুপ্ত কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক এমদাদুল হক বাদশা, সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোশাররফ হোসেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম শহিদ এবং মহানগর যুবদলের সাবেক সহ-সভাপতি ফজলুল হক সুমন। এছাড়া নগর ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি গাজী সিরাজ উল্লাহর নামও আলোচনায় রয়েছে।

সভাপতি পদপ্রত্যাশী সাহেদ আকবর বলেন, অন্য সংগঠন থেকে এসে কেউ যেন যুবদলের নেতৃত্বে না আসে। দীর্ঘদিন দলের জন্য যারা কাজ করেছেন, তাদের ত্যাগ ও সাংগঠনিক ভূমিকা বিবেচনায় নিয়ে কমিটি গঠন করা উচিত। তিনি বলেন, বর্তমানে অনেক নেতা সাংগঠনিক পরিচয় না থাকায় বিব্রত হচ্ছেন। তাই দ্রুত একটি শক্তিশালী কমিটি প্রয়োজন।

বিলুপ্ত কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক এমদাদুল হক বাদশা বলেন, ৫ আগস্টের আগের ভূমিকা বিবেচনায় নিয়ে কমিটি করা হলে বিতর্ক থাকবে না। তার দাবি, আন্দোলনের সময় যারা সক্রিয় ছিলেন তাদের বাদ দিয়ে নতুন করে কেউ নেতৃত্বে এলে দলের মধ্যে অসন্তোষ বাড়বে। তিনি বলেন, দ্রুত কমিটি হলে চট্টগ্রাম মহানগর যুবদল আবার সংগঠিত হতে পারবে।

বিলুপ্ত কমিটির সভাপতি মোশাররফ হোসেন দীপ্তি বলেন, আন্দোলনের সময়ে অনেক নেতাকর্মী ব্যক্তিগত ও পারিবারিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাই কমিটিতে ত্যাগী, গ্রহণযোগ্য ও আদর্শিক নেতাদের মূল্যায়ন করা জরুরি। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন কমিটি না থাকায় অনেক নেতাকর্মী হতাশায় ভুগছেন।

যে কোনো সময় কমিটি : কেন্দ্র

এ বিষয়ে জাতীয়তাবাদী যুবদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি আব্দুল মোনায়েম মুন্না ও সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম নয়নের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের পাওয়া যায়নি।

তবে কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-দপ্তর সম্পাদক মিনহাজুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, চট্টগ্রাম মহানগর যুবদলের কমিটি নিয়ে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক কাজ করছেন।

সুবিধাজনক সময়ে কমিটি ঘোষণা করা হবে। তিনি বলেন, আগের কমিটি সক্রিয় থাকায় কিছুটা স্থবিরতা থাকলেও সাংগঠনিক কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

তবে তৃণমূল নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা, দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটাতে দ্রুত একটি শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য কমিটি ঘোষণা করা হবে। তাদের মতে, আসন্ন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনসহ ভবিষ্যতের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হলে মহানগর যুবদলের সাংগঠনিক কাঠামো দ্রুত পুনর্গঠন করা প্রয়োজন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...