চট্টগ্রামের চকবাজার থানাধীন কাতালগঞ্জের বাসিন্দা ৭০ বছর বয়সি আকরামুল ইসলাম। নিজের বাড়ির দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, বুদ্ধি হওয়ার পর থেকেই এ এলাকায় পানি উঠতে দেখছি। অন্তত ৫৫ বছরেও পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি।
শুধু কাতালগঞ্জ নয়, খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চট্টগ্রাম নগরের অন্তত ২৫ এলাকায় প্রতি বর্ষায় নিয়মিত জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। প্রতি বছরের মতো এবারও সবচেয়ে আলোচিত এলাকার তালিকায় রয়েছে আগ্রাবাদ। নগরের বাণিজ্যিক কেন্দ্র ও অফিসপাড়া হিসেবে পরিচিত এ এলাকায় ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের সামনের সড়কসহ বিস্তীর্ণ অংশ পানিতে তলিয়ে যায়।
এছাড়া মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, চকবাজার, বাকলিয়া, হালিশহর, চান্দগাঁও, ষোলশহর ও পাহাড়তলীসহ নিচু ও খালঘেঁষা এলাকাগুলো প্রায় প্রতি বর্ষাতেই জলাবদ্ধতার শিকার হয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, এগুলো নগরীর নিচু ও খালঘেঁষা অংশে অবস্থিত। দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে এসব এলাকার পানি দ্রুত নামতে পারে না।
গত কয়েক দিনের বৃষ্টিতে চট্টগ্রামে মোট প্রায় ৮৫০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। সোমবার-মঙ্গলবার ৩৩০ দশমিক ৮ মিমি, মঙ্গলবার-বুধবার ২৩৭ দশমিক ৫ মিমি, আর তার আগের-পরের হালকা বৃষ্টি মিলিয়ে এই পরিমাণ বৃষ্টি হয়। এই ভারী বর্ষণের পাশাপাশি পাহাড়ি ঢল ও কর্ণফুলী নদীর জোয়ার মিলিয়ে নগরের বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল পানিতে তলিয়ে যায়। কোথাও কোথাও হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে যায়। গত বুধবার পাহাড়ধসে দুই শিশুর মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বিশেষজ্ঞদের মতে, চট্টগ্রামের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য, নিম্নাঞ্চল ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপের কারণে অতিবৃষ্টির সময় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়। এক্ষেত্রে তিনটি কারণ একসঙ্গে কাজ করে—অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও কর্ণফুলী নদীর জোয়ার। এই তিনটি একসঙ্গে ঘটলেই পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়, যেমনটা হয়েছে গত দুদিনে।
পরিবেশবিদ ও গবেষক ইদ্রিস আলী বলেন, চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতার জন্য শুধু অতিবৃষ্টিকে দায়ী করলে চলবে না। দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত নগরায়ণ, পাহাড় কাটা, নির্বিচারে গাছ নিধন, খাল-নালা ভরাট এবং প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনের পথ সংকুচিত হওয়ার কারণে অল্প সময়ের ভারী বৃষ্টিতেই পানি আটকে যাচ্ছে। দ্রুত নামতে পারছে না।
তিনি আরো বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টির প্রবণতা বেড়েছে। তবে স্থানীয় পরিবেশের ক্ষতি ও অপরিকল্পিত উন্নয়ন এই বৃষ্টির প্রভাবকে আরো তীব্র করে তুলছে। ফলে নিচু এলাকাগুলোয় দীর্ঘ সময় পানি আটকে থাকছে এবং নগরবাসীর দুর্ভোগ বাড়ছে।
অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে পরিস্থিতির উন্নতির দাবি করা হয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের ভাষ্যমতে, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে নগরের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধান হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের স্লুইস গেটগুলো সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ার ব্রিগেড তদারকি করছে এবং বন্দর কর্তৃপক্ষ নিয়মিত খালের মুখ ড্রেজিং করছে। জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের আওতায় ৩৬টি খালের মধ্যে ৩০টির কাজ শেষ হয়েছে। বাকি ছয়টির মধ্যে পাঁচটির কাজ ৯৮ শতাংশ এবং হিজড়া খালের কাজ ৬৮ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে।
তবে এত অগ্রগতি সত্ত্বেও সাম্প্রতিক ভারী বর্ষণে আবারও নগরের বিভিন্ন এলাকা তলিয়ে যাওয়ায় প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
যেসব এলাকা সবচেয়ে বেশি ডুবছে
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ৪১টি ওয়ার্ডের মধ্যে মুরাদপুর সবচেয়ে বেশি জলাবদ্ধতার শিকার হয়। ২০২৪, ২০২৫ ও ২০২৬ সালের প্রায় প্রতিটি বড় বৃষ্টির সময় এখানকার প্রধান সড়কে কোমরসমান পানি জমেছে।
এর পরেই রয়েছে বহদ্দারহাট। আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভারের সংযোগস্থল হওয়ায় এখানে পানি জমলে পুরো নগরের যান চলাচলে বড় ধরনের প্রভাব পড়ে। চকবাজারের কাঁচাবাজার, ডিসি রোড ও রহমতগঞ্জ এলাকা প্রায় প্রতিটি জলাবদ্ধতার ঘটনায় আলোচনায় থাকে।
আগ্রাবাদ নগরীর বাণিজ্যিক/অফিসপাড়া হওয়ায় এটি ডুবলে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়। এখানকার সিডিএ আবাসিক এলাকা, ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের সামনের সড়ক এবং কমার্স কলেজসংলগ্ন এলাকাও নিয়মিত পানিতে তলিয়ে যায়। হালিশহর ডুবে বৃষ্টি ও জোয়ার—এই দুই কারণে, তাই প্রায় প্রতিটি বৃষ্টির মৌসুমে এটি ডুবছে। কাতালগঞ্জ এলাকাটি নিয়মিত তালিকায় থাকা আরেকটি এলাকা। এছাড়া চান্দগাঁও (আবাসিক এলাকাসহ) বারবার ডুবে যাচ্ছে।
বাকলিয়ার ডিসি রোড প্রায় প্রতিবারই ডুবছে। ২ নম্বর গেট মুরাদপুর-বহদ্দারহাটের মতোই ঘনঘন পানি জমে যাওয়ার একটি প্রধান পয়েন্ট। এছাড়া ষোলশহর (দুই নম্বর গেট এলাকা), ওয়াসা মোড়, জিইসি মোড়, প্রবর্তক মোড়, রহমতগঞ্জ, শুলকবহর, পতেঙ্গা, মোহরা ও বড়পোল, কাপাসগোলা, পাঁচলাইশ (পাসপোর্ট অফিসের সামনে), মেহেদীবাগ ও মির্জাপুল, বাদুরতলা, রিয়াজউদ্দিন বাজার/তিন পোলের মাথা এবং লালখান বাজারও নিয়মিত ডুবছে।
সিডিএ ও সেনাবাহিনী জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়ন করলেও ভারী বর্ষণের সময় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনকেও তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে হচ্ছে। সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন জানান, মির্জা খালের প্রায় ৩০ শতাংশ কাজ এখনো বাকি। এ কারণে ভারী বৃষ্টিতে নগরের কিছু এলাকায় পানি জমেছে।
অন্যদিকে জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের পরিচালক ও সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের লেফটেন্যান্ট কর্নেল মহসিনুল হক চৌধুরীর দাবি, সাম্প্রতিক বৃষ্টিতে কোথাও স্থায়ী জলাবদ্ধতা হয়নি; মাত্র তিনটি স্থানে সাময়িক জলজট সৃষ্টি হয়েছিল। দুই থেকে তিন ঘণ্টা পানি জমে থাকাকে জলাবদ্ধতা বলা যায় না উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, প্রকল্পের অগ্রগতির ফলে আগের বছরের ১৭টি জলজটপ্রবণ স্থান কমে এবার তিনটিতে নেমে এসেছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

