চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা-ভূমিধস

পাহাড় কেটে ডেকে আনা দুর্যোগ

জমির উদ্দিন, চট্টগ্রাম

পাহাড় কেটে ডেকে আনা দুর্যোগ

এক রাতের ৪১২ মিলিমিটার বৃষ্টি ডুবিয়ে দিয়েছে বন্দরনগরী চট্টগ্রামকে। গত ৭ জুলাই এমনই টানা বৃষ্টিতে কার্যত অচল হয়ে পড়ে দেশের গুরুত্বপূর্ণ এ শহর। পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের তথ্যানুযায়ী, ওই ২৪ ঘণ্টায় সেখানে গত ৪০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। নগরীর অধিকাংশ এলাকা কোমরসমান পানিতে তলিয়ে যায়। দোকানপাট ও বাসাবাড়িতে পানি ঢুকে পড়ে। বায়েজিদ, টাইগারপাসসহ বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের কাছাকাছি বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে মাইকিং করে জেলা প্রশাসন।

তবে এ দৃশ্য চট্টগ্রামের জন্য নতুন নয়, প্রতি বর্ষায় একই চিত্রের পুনরাবৃত্তি ঘটে। আবহাওয়াবিদরা একে রেকর্ড বৃষ্টিপাতের ফল বললেও নগর পরিকল্পনাবিদ ও পরিবেশবিদদের মতে, সমস্যাটা শুধু আকাশের পানি নয়; গত কয়েক দশকের নির্বিচারে পাহাড় কাটা, জলাধার ধ্বংস ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ এ সমস্যার প্রধান কারণ, যার প্রায় পুরোটাই মানবসৃষ্ট।

বিজ্ঞাপন

অর্ধেকের বেশি পাহাড় হারিয়েছে

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশবিদ্যা ইনস্টিটিউটের সাবেক অধ্যাপক এসএম সিরাজুল হকের নেতৃত্বে ২০১১ সালে পরিচালিত ‘হিল কাটিং ইন অ্যান্ড অ্যারাউন্ড চিটাগং সিটি’ শীর্ষক গবেষণায় উঠে আসে উদ্বেগজনক চিত্র। গবেষণা অনুযায়ী, ১৯৭৬ সালে বায়েজিদ, খুলশী, পাঁচলাইশ, কোতোয়ালি ও পাহাড়তলী এলাকায় মোট পাহাড়ি ভূমি ছিল ৩২ দশমিক ৩৭ বর্গকিলোমিটার। ২০০৮ সালে তা কমে দাঁড়ায় ১৪ দশমিক ০২ বর্গকিলোমিটারে। অর্থাৎ ৩২ বছরে বিলুপ্ত হয় ১৮ দশমিক ৩৪৪ বর্গকিলোমিটার পাহাড়ি ভূমি, যা মোট ভূমির প্রায় ৫৭ শতাংশ।

পরিবেশবিদদের মতে, বর্তমানে এ পরিমাণ আরো কমে মোট পাহাড়ি ভূমির মাত্র ৭ শতাংশের কাছাকাছি নেমে এসেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পাঁচলাইশ এলাকা, যেখানে প্রায় ৭৪ শতাংশ পাহাড় কাটা হয়েছে।

একই গবেষণায় স্যাটেলাইট ও গুগল আর্থের চিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০০০ সালে পাহাড় কাটার এলাকা ছিল ৬৭৯ হেক্টর, যা ২০১২ সালে বেড়ে দাঁড়ায় এক হাজার ২৯৫ হেক্টরে। এরপর আনুষ্ঠানিক জরিপ না হলেও পরিবেশবাদীদের ধারণা, বর্তমানে এ পরিমাণ দুই হাজার হেক্টর অতিক্রম করেছে।

বিভিন্ন প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, চার দশক আগে চট্টগ্রামে ২০০টির বেশি পাহাড় ছিল। বর্তমানে সে সংখ্যা এক-তৃতীয়াংশের নিচে নেমে এসেছে। ইতোমধ্যে ১২০টির বেশি পাহাড় সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়েছে। গত ১৫ বছরে অন্তত ৮৮টি পাহাড় ও টিলা কাটা হয়েছে, যার বড় অংশ বায়েজিদ ও আকবর শাহ এলাকায়।

থামছে না পাহাড় কাটা

পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম মহানগর কার্যালয়ের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত নিয়মিত মামলা, এনফোর্সমেন্ট অভিযান এবং মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পরও থেমে নেই পাহাড় কাটা। এ সময়ে অবৈধ পাহাড় ও টিলা কাটার অভিযোগে সাতটি নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়। অভিযানে দুটি এক্সকাভেটরসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি জব্দ করা হয়।

এ সময় ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রায় ৬৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ আরোপ করা হয়। জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় সাতটি মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে নাগিন পাহাড়, বায়েজিদ লিংক রোড, আকবর শাহ, লেক সিটি ও জালালাবাদ এলাকায় অভিযান পরিচালনা করা হয়। ওই সব অভিযানে এক লাখ ২০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় এবং পাহাড় কেটে নির্মিত অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয় বলে জানান পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মুক্তাদির হাসান।

গড়ে উঠছে আবাসন, সড়ক ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান

সংশ্লিষ্টদের মতে, পাহাড় কাটার পেছনে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বারবার উঠে এসেছে তিনটি খাত—আবাসন ব্যবসা, সড়ক নির্মাণ ও শিল্প-বাণিজ্যিক স্থাপনা।

বায়েজিদ বোস্তামী এলাকার প্রায় দেড় লাখ বর্গফুট আয়তনের নাগিন পাহাড়ের দুই-তৃতীয়াংশ কেটে সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে শাপলা ও রূপনগরসহ একাধিক আবাসিক এলাকা। জামালখানের আসকার দীঘির পাড়ে ‘গ্রিনলেজ ব্যাংক পাহাড়’ নামে পরিচিত ১২৭ ফুট উঁচু একটি পাহাড় কেটে বহুতল ভবন নির্মাণের ঘটনাও আলোচনায় আসে, যেখানে চার বছর ধরে নির্মাণকাজ চলার পর সিটি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) টনক নড়ে। অভিযোগ রয়েছে, ভূমিদস্যু ও আবাসন ব্যবসায়ীরা কম দামে পাহাড় বা জমি কিনে তা কেটে প্লট হিসেবে উচ্চমূল্যে বিক্রি করছেন।

উন্নয়ন প্রকল্পেও পরিবেশের ক্ষতি

বায়েজিদ-ফৌজদারহাট লিংক রোড নির্মাণে সিডিএ ১৬টি পাহাড় প্রায় ৯০ ডিগ্রি খাড়া করে কাটে। যদিও পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্দেশনা ছিল সর্বোচ্চ ২৬ ডিগ্রি কোণে কাটার। এ অনিয়মের জন্য সিডিএকে ১০ কোটির বেশি টাকা জরিমানা করা হলেও আপিলে তা কমিয়ে পাঁচ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়।

সড়কটি চালুর পর থেকেই বর্ষায় বারবার ধসের ঘটনা ঘটছে। ২০২২ সালের পর সাম্প্রতিক ভারী বর্ষণেও নতুন করে ধস নেমেছে। ফলে একপর্যায়ে সড়কের একটি লেন প্রায় এক মাস বন্ধ রাখতে হয়। পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছেন, বৈজ্ঞানিক কোনো পদ্ধতি অনুসরণ না করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান খুশিমতো পাহাড় কেটেছে।

অন্যদিকে দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ নির্মাণেও পরিবেশের বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। বন বিভাগের তথ্যানুযায়ী, এ প্রকল্পে সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে ছয় লাখ ৬৯ হাজারের বেশি গাছ কাটা হয়। প্রকল্পে দুটি ওভারপাস নির্মাণের কথা থাকলেও বাস্তবে হয়েছে একটি। ফলে বন্যহাতির চলাচলের পথও বাধাগ্রস্ত হয়েছে। বনভূমি ব্যবহারের শর্তানুযায়ী ক্ষতিপূরণ ও তিনগুণ গাছ লাগানোর কথা থাকলেও বন বিভাগ এখনো প্রাপ্য অর্থ পায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। একই করিডোরে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সম্প্রসারণেও কাটা পড়ছে সাড়ে ছয় হাজারের বেশি গাছ।

কেন বাড়ছে জলাবদ্ধতা

পরিবেশবিদ ইদ্রিস আলীর ভাষ্য, পাহাড় ও তার আশপাশের গাছপালা প্রাকৃতিকভাবে বৃষ্টির পানি শুষে নেয় এবং ধীরে ধীরে ছেড়ে দেয়, যা বন্যা ও জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু পাহাড় কাটার ফলে ওই পানি সরাসরি নিচু এলাকায় নেমে আসে। একই সঙ্গে কাটা পাহাড়ের মাটি বৃষ্টির পানির সঙ্গে নেমে খাল-নালা ভরাট করে। ফলে পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা আরো দুর্বল হয়ে পড়ে।

চট্টগ্রাম ওয়াসার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, পাহাড় কাটা, দ্রুত নগরায়ণ এবং জলাধার ও প্রাকৃতিক জলাশয় ভরাট একসঙ্গে মিলে নগরীর ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ও সুপেয় পানির প্রাপ্যতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। নগর পরিকল্পনাবিদরা মনে করেন, চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা কোনো বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়; বরং এটি পাহাড়, খাল, জলাধার, নদী ও জোয়ার-ভাটার সমন্বিত প্রাকৃতিক ব্যবস্থার ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ফল।

বাড়ছে প্রাণহানির ঝুঁকিও

পাহাড় কাটার পরিণতি শুধু জলাবদ্ধতায় সীমাবদ্ধ নয়, এটি প্রাণহানিরও কারণ হয়ে উঠেছে। সবশেষ গত দুদিনে পাহাড়ধসে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

বিভিন্ন তথ্যানুযায়ী, গত দুই দশকে চট্টগ্রামে পাহাড়ধসে অন্তত ২০০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ২০০৭ সালের ১১ জুনের ভয়াবহ ধসে প্রাণ হারান ১২৯ জন। এছাড়া ২০১১ সালে বাটালী হিলে ১১ জন এবং ২০১২ সালে একই এলাকায় প্রতিরক্ষা দেয়াল ধসে ১৭ জন নিহত হন।

জেলা প্রশাসনের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে নগরীর ১৩টি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশে দেড় হাজারের বেশি পরিবার বসবাস করছে। প্রকৃত সংখ্যা এরচেয়ে বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আইন থাকলেও প্রয়োগ নেই

১৯৯৬ সালের ইমারত নির্মাণ বিধিমালা এবং পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে পাহাড় সংরক্ষণের স্পষ্ট বিধান রয়েছে। পাহাড় কাটতে হলে পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি নিতে হয় এবং নির্ধারিত কোণ অনুসরণ করতে হয়। কিন্তু বাস্তবে সরকারি সংস্থাসহ অনেকেই এ বিধান মানছে না।

গত এক বছরে পাহাড় কাটার অভিযোগে পরিবেশ অধিদপ্তর ১২টি মামলা করেছে। আগের বছর ছিল ২২টি। গত দুই দশকে মামলা হয়েছে শতাধিক। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কার্যকর বিচার বা স্থায়ী প্রতিরোধ নিশ্চিত করা যায়নি।

নগরবিদ প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেন মজুমদারের মতে, জলাবদ্ধতা নিরসনে ১৪ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প শুরু থেকেই ত্রুটিপূর্ণ পরিকল্পনার ওপর ভিত্তি করে নেওয়া হয়। মাস্টারপ্ল্যানে যে পরিমাণ জলাধার ও জোয়ার নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা থাকার কথা ছিল, বাস্তবে তার সামান্যই বাস্তবায়িত হয়েছে।

তিনি বলেন, সিডিএ, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড পৃথকভাবে কাজ করায় প্রকল্পগুলোর মধ্যে সমন্বয় নেই। ফলে হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের পরও কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলছে না। টেকসই সমাধানের জন্য মেয়রের নেতৃত্বে সমন্বিত নগর সরকার গঠনের পাশাপাশি খাল-নালা দখলমুক্ত রাখা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং পাহাড় সংরক্ষণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন