দেড় শতাধিক মামলায় চার্জশিট মাত্র একটিতে

জমির উদ্দিন, চট্টগ্রাম

দেড় শতাধিক মামলায় চার্জশিট মাত্র একটিতে

২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে চট্টগ্রামে সংঘটিত হত্যা ও সহিংসতার ঘটনায় দায়ের হওয়া ১৫১টি মামলার অধিকাংশ দুই বছর পরও তদন্তাধীন রয়ে গেছে। থানায় দায়ের হওয়া ৬৯টি মামলার মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র একটির চার্জশিট আদালতে জমা পড়েছে। অন্যদিকে পুলিশ বলছে, অধিকাংশ মামলার তদন্ত শেষ পর্যায়ে এবং শিগগির পর্যায়ক্রমে চার্জশিট দাখিল করা হবে। তবে ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, বিচারপ্রক্রিয়া প্রত্যাশিত গতিতে এগোচ্ছে না এবং নতুন সরকারের সময় তাদের সঙ্গে যোগাযোগও কমে গেছে।

পুলিশ ও আদালত সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রামে মোট ১৫১টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে নগর ও জেলার বিভিন্ন থানায় দায়ের হয়েছে ৬৯টি এবং বাকি মামলাগুলো আদালতে সরাসরি দায়ের করা নালিশি (সিআর) মামলা। থানায় দায়ের হওয়া ৬৯টি মামলায় আসামি করা হয়েছে ২১ হাজার ৯০৬ জনকে। এর মধ্যে হত্যা মামলা রয়েছে ১৫টি। তবে এতগুলো মামলার মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র একটি মামলার তদন্ত প্রতিবেদন (চার্জশিট) আদালতে জমা পড়েছে।

বিজ্ঞাপন

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী কমিশনার (মিডিয়া) আমিনুর রশিদ নিশ্চিত করেছেন, একটি মামলায় চার্জশিট জমা দেওয়া হয়েছে এবং বাকি সব মামলার তদন্ত চলমান। মামলাগুলোতে নাম উল্লেখ করে আসামি করা হয়েছে ১৩ হাজার ৪৫০ জনকে। এছাড়া অজ্ঞাত আসামি রয়েছেন অন্তত ৩০ হাজার। আসামিদের তালিকায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত নন এমন বিভিন্ন পেশার মানুষের নামও রয়েছে।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী এ বিষয়ে বলেন, জুলাই-আগস্টের ঘটনাসংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর তদন্তে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ তদন্তকাজ শেষ হয়েছে। প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে পর্যায়ক্রমে মামলাগুলোর চার্জশিট আদালতে দাখিল করা হবে।

তিনি বলেন, তদন্তে কোনো তাড়াহুড়ো করা হচ্ছে না। সাক্ষ্যপ্রমাণ, আলামত ও সংশ্লিষ্ট তথ্য যাচাই-বাছাই করেই প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হচ্ছে, যাতে বিচারিক প্রক্রিয়ায় কোনো দুর্বলতা না থাকে। তদন্ত শেষ হওয়া মামলাগুলোর চার্জশিট পর্যায়ক্রমে আদালতে জমা পড়লে বিচার প্রক্রিয়াও এগিয়ে যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

নতুন সরকারের সময় যোগাযোগও কমে গেছে

শহীদ পরিবারগুলোর অভিযোগ, বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে মামলার অগ্রগতি নিয়ে খোঁজখবর নেওয়াও কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিভিন্ন দপ্তর থেকে যোগাযোগ রাখা হতো। কিন্তু নতুন সরকার আসার পর সে যোগাযোগ আর নেই। তাদের দাবি, সাক্ষী হাজির, পুনর্বাসন ও আর্থিক সহায়তার ক্ষেত্রেও প্রত্যাশিত সহযোগিতা পাচ্ছেন না।

২০২৪ সালের ১৬ জুলাই চট্টগ্রামের মুরাদপুরে নিহত ছাত্রদল নেতা ওয়াসিম আকরামের মা জোৎস্না বেগম বলেন, নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর এসব বিষয়ে তাদের সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ হয়নি। ওয়াসিম হত্যার ঘটনায় ওই বছরের ১৯ আগস্ট পাঁচলাইশ থানায় মামলা হয়, যেখানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদসহ ২৫০ জনকে আসামি করা হয়।

বোয়ালখালীর ওমর নুরুল আবছারের মা রুবি আক্তারও অভিযোগ করেন, তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে তাদের কিছু জানানো হয় না। একই ধরনের অভিযোগ করেন ফেনীর মাহবুবুল আলম মাসুমের পরিবারের সদস্যরাও।

আর্থিক সংকটে শহীদ শান্তর পরিবার

২০২৪ সালের ১৬ জুলাই নগরের দুই নম্বর গেট এলাকায় কোটাবিরোধী আন্দোলনে গিয়ে পুলিশ ও ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন ওমর গণি এমইএস কলেজের ছাত্র ফয়সাল আহমেদ শান্ত (১৯)। তার বাবা জাকির হোসেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ২২ জনকে আসামি করে একটি মামলা করেন। প্রায় দুই বছর পর গত ৩০ জুন ট্রাইব্যুনাল মামলায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে এবং সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী ৬ আগস্ট দিন ধার্য করে।

বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে অনিশ্চয়তার পাশাপাশি পরিবারটি এখন চরম আর্থিক সংকটেও দিন কাটাচ্ছে। শান্তর বাবা বর্তমানে কর্মহীন, ছোট বোন দশম শ্রেণির ছাত্রী আর মা কহিনূর আক্তার একটি স্কুলে শিক্ষকতা করে সংসার চালাচ্ছেন। বারবার চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিসি কার্যালয় ও জেলা প্রশাসকের কাছে একটি বিনামূল্যের বাসার আবেদন জানালেও তা মেলেনি বলে জানায় পরিবারটি।

আমার দেশকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কহিনূর আক্তার বলেন, ছেলে হত্যার বিচার কবে হবে, সে বিষয়ে এখনো তারা নিশ্চিত নন। তিনি বলেন, ছেলের কাছে তিনি সব সময় একটি ভালো সার্টিফিকেটের প্রত্যাশা করতেন। অথচ ছেলে তাকে দিয়ে গেছে জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয়, জুলাই শহীদের মা।

তিনি অভিযোগ করেন, গত দুই বছরে বিএনপির কোনো নেতা বা স্থানীয় সংসদ সদস্য তাদের খোঁজ নেননি। তবে জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি, ছাত্রশিবির ও ছাত্রশক্তির নেতাকর্মীরা মাঝেমধ্যে তাদের খোঁজ নিয়েছেন বলে দাবি করেন। গত বছর জামায়াতে ইসলামীর আমির তাদের পরিবারকে দুই লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা দিয়েছিলেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...