রাজনগরে আশুরার জারিগান ও লাঠিখেলা বিলুপ্তপ্রায়

উপজেলা প্রতিনিধি, রাজনগর (মৌলভীবাজার)

রাজনগরে আশুরার জারিগান ও লাঠিখেলা বিলুপ্তপ্রায়
ছবি: আমার দেশ

রাজনগর থেকে আধুনিকতার ছোঁয়ায় অনেকটা হারিয়ে যাচ্ছে ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি । আশুরা বা মহররম উপলক্ষে আবহমান বাংলার ঐতিহ্যবাহী জারিগান ও লাঠিখেলা—তাও হারিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন দিকে আধুনিকায়ন এবং তরুণ প্রজন্মের অনাগ্রহের কারণে আজ সত্যিই বিলুপ্তির পথে লাঠি খেলার সংস্কৃতি ।

কারবালার শোকাবহ ঘটনাকে কেন্দ্র করে একসময় মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার সদর ইউনিয়নের দক্ষিণ খারপাড়া মোকামবাড়ি জাঁকজমকভাবে ১০ মহরম পবিত্র আশুরা পালিত হতো। দিনব্যাপী নানা আয়োজনে থাকত শিয়া-সুন্নি অনুসারীদের তাজিয়া মিছিল, জারিগান ও ঐতিহ্যবাহী লাঠিখেলা।

বিজ্ঞাপন

কালের বিবর্তনে চার দশক থেকে একেবারেই হারিয়ে গেছে এ সংস্কৃতি । এক সময় উপজেলার আইয়ুব মিয়া, তৈমুছ মিয়া, তছলিম মিয়া, আব্দুল জলিল, আব্দুর রহিম, ছুফিয়ান মিয়া, মখলিছ মিয়া, আখলিছ মিয়া, আত্তর মিয়া, কাশেম মিয়া ও কুদ্দুস মিয়া জারিগান ও লাঠিখেলা প্রবর্তন করেছিলেন।

প্রতি বছর পবিত্র আশুরা উপলক্ষে দূরদূরান্ত থেকে বিনা আমন্ত্রণে জারিগানের দল ও লাঠিখেলায় দক্ষ লাটিয়াল বাহিনী আল্লাদ ও সাল্লাদশাহ মোকামবাড়িতে সকাল থেকে জড় হতেন। সেখানে মহররমের জারির মাধ্যমে বিষাদ ও বেদনায় ভারাক্রান্ত মানুষের আর্তনাদে শোকের মাতম সৃষ্টি হতো।

হাসান-হোসেনের বীরত্ব, জয়নবের বিলাপ, ইয়াজিদ বাহিনীর চক্রান্তের কারবালার প্রান্তরে ইমাম হোসেন কীভাবে শহীদ হয়েছিলেন- জারি গানের মাধ্যমে সেই নিষ্ঠুরতার বর্ণনা হতো। এছাড়া গ্রাম-বাংলার প্রতিটি মানুষের কাছে খুব জনপ্রিয় লাঠিখেলা । খেলার শুরুতে ঢাক ও ঢোলের তালে বিভিন্ন ভঙ্গিতে খেলোয়াড়রা দৌড়ে দৌড়ে একে অপরের সঙ্গে লাঠিযুদ্ধে নামতেন। খেলার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত চলত ঢোল আর লাঠির তালে তালে নাচ।

অন্যদিকে প্রতিপক্ষে লাঠির আঘাত হতে আত্মরক্ষার কৌশল অবলম্বনের প্রচেষ্টায় টান টান উত্তেজনা বিরাজ করত খেলোয়াড় ও দর্শকদের মাঝে। দর্শকদের হাততালি আর মুখের জয়ধ্বনি খেলোয়াড়দের আনন্দ জোগাত। এই খেলার জন্য সাড়ে চার থেকে পাঁচ ফুট লম্বা টেটুয়া বাঁশের লাঠি ব্যবহার হতো।

নিজেদের নিত্যদিনের কাজ দ্রুত সমাপ্ত করে গ্রামের নারী-পুরুষেরা ছুটে যেত খেলা দেখার জন্য। বাড়ির আঙিনায়, ঘরের চালে, গাছের ডালে ভিড় জমাতো যুবকরা। আর বেড়ার ফাঁকে, জানালা খুলে খেলা দেখত মা-বোনেরা। আর সে দিনের সেই কাঠের টুল ও জালিবেতের পিঁড়িতে বসে খেলা দেখত বৃদ্ধরা।

কিন্তু লাটিখেলা ও জারিগানের এ মানুষগুলোর মধ্যে অনেকেই এখন আর এ দুনিয়াতে নেই। কালের আবর্তে স্মার্টফোন, ইন্টারনেট এবং স্যাটেলাইট টিবির যুগে মানুষের বিনোদনের মাধ্যম বদলে গেছে। তরুণ প্রজন্ম ঐতিহ্যবাহী জারিগান ও লাঠিখেলার পরিবর্তে আধুনিক ডিজিটাল মাধ্যম ও ভার্চুয়াল গেমসে বেশি অভ্যস্ত। সেই লাঠিখেলার স্থান আজ দখল করে নিয়েছে ক্রিকেট, ফুটবল, ভলিবল ও ব্যাডমিন্টন। তাছাড়া মোবাইলে চলা পাবজি, ফ্রি-ফায়ারসহ বিভিন্ন ধরনের খেলা। অতীতের লোকসংস্কৃতি বিনোদন বর্তমান প্রজন্মের কাছে রূপকথার গল্প।

স্থানীয় ব্যক্তি খালিছ মিয়া, আইয়ুব মিয়া বলেন, ঐতিহ্য রক্ষায় সরকারি, বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও জাতীয় দিবসে নানা আয়োজনে লাঠিখেলা জারিগানের ঐতিহ্যকে দিনের কর্মসূচির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করতে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে উদ্যোগ গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি।

তারা আরো বলেন, এই ঐতিহ্যবাহী লোকশিল্প পুরোপুরি সংরক্ষণ করতে নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও সরকারি প্রণোদনা প্রদান করা প্রয়োজন। দক্ষিণ খারপাড়া মোকামবাড়ির ইদ্রিস মিয়া অতীতের স্মৃতিচারণ করে বলেন, আগে দেখতাম গ্রামের সাধারণ মানুষরা বাংলা বর্ষবরণ, বিবাহ, চড়কপূজা, সুন্নতে খৎনা উপলক্ষ্যে লাঠিখেলা, মহরম মাসে জারিগানের আয়োজন করতেন। আগের দিনগুলো এখন আর নেই।

এমএইচ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...