চাকরি নয়, সৌরভের চোখে উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন

শওকত জামান, জামালপুর

চাকরি নয়, সৌরভের চোখে উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন
জামালপুর শহরের পাঁচরাস্তা মোড়ে সৌরভের ভ্রাম্যমান দোকান। ছবি: আমার দেশ

বিকেলের আলো তখন ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসছে। জামালপুর শহরের ব্যস্ত সড়কে রঙিন টি-শার্ট, শার্ট আর জার্সি সাজানো একটি ছোট্ট ভ্রাম্যমাণ গাড়িকে ঘিরে ভিড় করছেন ক্রেতারা। কেউ পোশাকের দাম জিজ্ঞেস করছেন, কেউ আবার পছন্দের রঙ খুঁজছেন। হাসিমুখে সবার সঙ্গে কথা বলছেন এক তরুণ।

তিনি কোনো প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী নন, আবার চাকরির প্রস্তুতিতে ব্যস্ত কোনো শিক্ষার্থীও নন। তিনি সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজের এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আকিজুল ইসলাম সৌরভ। বয়স মাত্র ২১ বছর। তবে তার স্বপ্ন অনেক বড়, একদিন সফল উদ্যোক্তা হয়ে অন্যের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবেন।

বিজ্ঞাপন

জামালপুর সদর উপজেলার শরিফপুর ইউনিয়নের ব্যাপারীপাড়া গ্রামের বাসিন্দা সৌরভ। ব্যবসায়ী বাবা শফিকুল ইসলামের কাছ থেকেই ব্যবসার প্রতি আগ্রহ জন্মেছে তার। ছোটবেলা থেকেই বাবার ব্যবসা দেখেছেন, শিখেছেন মানুষের সঙ্গে লেনদেনের কৌশল। সেই অভিজ্ঞতাই তাকে নতুন পথ দেখিয়েছে।

চারপাশে শিক্ষিত তরুণদের দীর্ঘদিন চাকরির পেছনে ছুটতে দেখে ভিন্নভাবে ভাবতে শুরু করেন সৌরভ। তার বিশ্বাস, লেখাপড়ার লক্ষ্য শুধু চাকরি নয়; শিক্ষা মানুষকে নিজের পথ তৈরি করার সাহসও শেখায়।

সৌরভ বলেন, ‘আমি চাই না শুধু একটি চাকরির জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে। আমি চাই এমন একজন মানুষ হতে, যিনি একদিন অন্যদের চাকরির সুযোগ তৈরি করবেন। তাই পড়াশোনার পাশাপাশি ছোট পরিসরে ব্যবসা শুরু করেছি।’

স্বপ্নের শুরুটা সহজ ছিল না। বাবার কাছ থেকে ৭০ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে যাত্রা শুরু করেন তিনি। এর মধ্যে ৫০ হাজার টাকা ব্যয় করে তৈরি করেন একটি আকর্ষণীয় ও ব্যতিক্রমধর্মী ভ্রাম্যমাণ বিক্রয়গাড়ি। বাকি ২০ হাজার টাকায় কেনেন পোশাক। প্রায় ছয় মাস আগে সেই ছোট্ট উদ্যোগই আজ তার আত্মবিশ্বাসের সবচেয়ে বড় ভিত্তি।

প্রতিদিন প্রায় ৬ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে কলেজে যান সৌরভ। ক্লাস শেষ হলেই বদলে যায় তার পরিচয়। বই-খাতা গুছিয়ে হাতে তুলে নেন ব্যবসার দায়িত্ব। বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত শহরের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে পোশাক বিক্রি করেন। দিনের ব্যবসা শেষে ভ্রাম্যমাণ দোকানটি শহরের ইকবালপুর এলাকায় ফুপুর বাসায় রেখে বাড়ি ফেরেন।

ভ্রাম্যমাণ দোকানের বিশেষ সুবিধার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমার দোকান স্থির নয়, তাই ক্রেতার কাছেই যেতে পারি। যেখানে মানুষের ভিড় বেশি, সেখানেই দোকান নিয়ে যাই। এতে বিক্রি যেমন বাড়ে, তেমনি নতুন ক্রেতাও তৈরি হয়।’

এই ব্যবসা থেকেই নিজের লেখাপড়ার খরচ চালাচ্ছেন সৌরভ। শুধু তাই নয়, প্রতিমাসে কিছু অর্থ সঞ্চয়ও করছেন। সেই সঞ্চয় দিয়ে ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে ব্যবসা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে তার। একদিন নিজস্ব পোশাকের ব্র্যান্ড গড়ে তোলার স্বপ্নও দেখছেন তিনি।

সৌরভের এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ ইতোমধ্যেই অনেক তরুণকে অনুপ্রাণিত করেছে। তার দেখাদেখি জামালপুর শহরের আরও কয়েকজন শিক্ষার্থী পড়াশোনার পাশাপাশি ভ্রাম্যমাণ পোশাক ব্যবসা শুরু করেছেন। তারা বুঝতে শিখেছেন, আত্মনির্ভরশীল হওয়ার জন্য সব সময় বড় মূলধনের প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন সাহস, সততা ও পরিশ্রম।

উন্নয়ন কর্মী জাহাঙ্গীর সেলিম বলেন, ‘বর্তমান সময়ে তরুণদের জন্য আত্মকর্মসংস্থানই সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা। সৌরভের মতো উদ্যোগ শুধু একজন মানুষের জীবন বদলাবে না, ভবিষ্যতে স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং নতুন কর্মসংস্থানও সৃষ্টি করবে।’

যে বয়সে অনেক তরুণ শুধু চাকরির স্বপ্নে বিভোর, সেই বয়সেই আকিজুল ইসলাম সৌরভ নিজের হাতে গড়ে তুলছেন স্বপ্নের ভিত্তি। তার ভ্রাম্যমাণ দোকান শুধু পোশাক বিক্রির একটি মাধ্যম নয়; এটি আত্মবিশ্বাস, পরিশ্রম এবং আত্মনির্ভরশীলতার এক চলমান প্রতীক।

সৌরভের গল্প মনে করিয়ে দেয় স্বপ্ন পূরণে পথের দৈর্ঘ্য নয়, প্রয়োজন সাহসী পদক্ষেপ। আর সেই প্রথম পদক্ষেপটিই একদিন একজন সাধারণ শিক্ষার্থীকে সফল উদ্যোক্তায় পরিণত করতে পারে।

এমএইচ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন