তালা ঝুলছে বিদ্যালয়ে, কাগজে চলছে পাঠদান

৯ বছর ধরে বন্ধ শিক্ষা কার্যক্রম, তবুও মিলছে বেতন-ভাতা

উপজেলা প্রতিনিধি, মাদারগঞ্জ (জামালপুর)

৯ বছর ধরে বন্ধ শিক্ষা কার্যক্রম, তবুও মিলছে বেতন-ভাতা
ছবি: আমার দেশ

সরকারি নথিতে বিদ্যালয়টি পুরোপুরি সচল। শিক্ষার্থী রয়েছে ৬২ জন, শিক্ষক চারজন। নিয়মিত উত্তোলন হচ্ছে বেতন-ভাতা, মিলছে সরকারি অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাও। অথচ বাস্তবে বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ ও অফিসকক্ষে দিনের পর দিন ঝুলছে তালা। নেই কোনো পাঠদান, নেই শিক্ষক-শিক্ষার্থীর উপস্থিতি। প্রায় ৯ বছর ধরে এমন অবস্থাতেই চলছে জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম সুখনগরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

স্থানীয়দের ভাষায়, বিদ্যালয়টির বর্তমান অবস্থা যেন ‘কাজীর গরু কেতাবে আছে, গোয়ালে নেই’—প্রবাদটির বাস্তব প্রতিচ্ছবি। সরকারি নথিতে বিদ্যালয় সচল দেখানো হলেও বাস্তবে সেখানে শিক্ষা কার্যক্রম নেই।

বিজ্ঞাপন

পশ্চিম সুখনগরী এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ২০১৭ সালের পর থেকে বিদ্যালয়টিতে কার্যত নিয়মিত পাঠদান বন্ধ। বছরের শুরুতে নতুন বই বিতরণের সময় কয়েক দিনের জন্য বিদ্যালয় খোলা হয়। এরপর আবার তালা ঝুলিয়ে রাখা হয়। মাঝেমধ্যে অল্প সময়ের জন্য বিদ্যালয় খোলা হলেও সেখানে পাঠদান হয় না।

তাদের অভিযোগ, উপজেলা শিক্ষা অফিস থেকে বিদ্যালয়টির নিয়মিত তদারকি করা হয় না। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পরিদর্শনের সময় পাশের একটি কিন্ডারগার্টেন থেকে কয়েকজন শিশুকে এনে শিক্ষার্থী হিসেবে উপস্থিত দেখানো হয়।

অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে গত ২৪, ২৫, ২৮ ও ৩০ জুন চার কার্যদিবসে বিদ্যালয়ে গিয়ে একই চিত্র দেখা যায়। প্রতিদিনই শ্রেণিকক্ষ ও অফিসকক্ষে তালা ঝুলতে দেখা যায়। বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়নি। প্রতিষ্ঠানের কোনো সাইনবোর্ডও চোখে পড়েনি।

শিক্ষক বা শিক্ষার্থীর উপস্থিতি ছিল না। শ্রেণিকক্ষগুলোতে পাঠদানের কোনো পরিবেশ নেই; চারদিকে ময়লা-আবর্জনা। ভাঙা টিনের একটি কক্ষ স্থানীয় মাদকসেবীদের আড্ডাস্থলে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

স্থানীয়দের প্রশ্ন, যদি বিদ্যালয়ে নিয়মিত পাঠদান হয়, তাহলে দিনের পর দিন বিদ্যালয়ে তালা ঝুলছে কেন? তাদের ভাষ্য, একটি সরকারি বিদ্যালয়ের এমন করুণ অবস্থা উপজেলা শিক্ষা প্রশাসনের তদারকির অভাবেই হয়েছে। বছরের পর বছর এভাবে একটি বিদ্যালয় অচল থাকলেও কেন কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি—সে প্রশ্নও তুলেছেন তারা।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, সরকারি নথি অনুযায়ী বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে শিক্ষার্থী রয়েছে ৬২ জন। এর মধ্যে প্রাক্-প্রাথমিক শ্রেণিতে ১২ জন, প্রথম শ্রেণিতে ১০ জন, দ্বিতীয় শ্রেণিতে ১০ জন, তৃতীয় শ্রেণিতে ১০ জন, চতুর্থ শ্রেণিতে ১৩ জন এবং পঞ্চম শ্রেণিতে ৭ জন। তবে এসব শিক্ষার্থীর মধ্যে কতজন নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসে কিংবা কতজন উপবৃত্তি পাচ্ছে—সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেননি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মশিউর রহমান অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, বিদ্যালয়ের আশপাশে কয়েকটি কিন্ডারগার্টেন গড়ে ওঠায় শিক্ষার্থী কমে গেছে। সরকার পরিবর্তনের পর বিদ্যালয়টি প্রয়োজনীয় সরকারি সুযোগ-সুবিধা পায়নি। পাকা ভবন না থাকায় নিয়মিত পাঠদান পরিচালনায় সমস্যা হচ্ছে।

উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা (ক্লাস্টারের দায়িত্বপ্রাপ্ত) মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, তার কাছে থাকা প্রতিবেদনে বিদ্যালয়টির কার্যক্রম নিয়মিত চলছে বলে উল্লেখ রয়েছে। তিনি গত সাত মাস ধরে মাদারগঞ্জে কর্মরত থাকলেও এখনো বিদ্যালয়টি সরেজমিনে পরিদর্শন করেননি। প্রধান শিক্ষকের প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই বিদ্যালয়টি সচল রয়েছে।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. খলিলুর রহমান বলেন, তিনি সম্প্রতি যোগদান করেছেন। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুমন চৌধুরী বলেন, শিক্ষকরা নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকবেন, এটাই স্বাভাবিক। কোনো সরকারি বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন পাঠদান বন্ধ থাকার সুযোগ নেই। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হবে। সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এমএইচ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন