ব্যাংকিংয়ের ১৪ সেবায় নতুন ফি আদায়ের প্রস্তাব

রোহান রাজিব

ব্যাংকিংয়ের ১৪ সেবায় নতুন ফি আদায়ের প্রস্তাব

দেশের ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের কাছ থেকে ১৪টি নতুন খাতে ফি বা চার্জ নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। বর্তমানে যেসব সেবা বিনামূল্যে দেওয়া হয় বা কোনো ধরনের চার্জ নেই, সেসব সেবাতেও ফি আরোপ করতে চায় ব্যাংকগুলোর সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশ (এবিবি)। একই সঙ্গে বিভিন্ন সেবায় বিদ্যমান চার্জও বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি এবিবি এ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দিয়েছে। প্রস্তাব অনুমোদন হলে আমানতকারী, ব্যবসায়ী, আমদানিকারক, রপ্তানিকারক ও ঋণগ্রহীতাদের ব্যাংকিং ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যাবে।

এবিবির প্রস্তাবে দেখা গেছে, বর্তমানে ১৪টি সেবায় কোনো ধরনের চার্জ নেই, সেসব সেবায় নতুন করে ফি আরোপের সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে হিসাব রক্ষণাবেক্ষণ, ঋণ প্রক্রিয়াকরণ, ঋণপত্র (এলসি), ব্যাংক গ্যারান্টি, ডিমান্ড ড্রাফট, পে-অর্ডার, সলভেন্সি সার্টিফিকেটসহ বিভিন্ন সেবার বিদ্যমান চার্জও বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

১৪ খাতে চার্জ আরোপের প্রস্তাব

প্রস্তাবে বলা হয়েছে, বর্তমানে নিষ্ক্রিয় (ডরম্যান্ট) ব্যাংক হিসাব পুনরায় চালু করতে কোনো ফি নেওয়া হয় না। এ সেবার জন্য ৫০০ টাকা ফি নির্ধারণের প্রস্তাব করেছে এবিবি। চলমান ঋণের ক্ষেত্রে প্রতি বছর বকেয়া ঋণের সর্বোচ্চ ১ শতাংশ, তবে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ ব্যবস্থাপনা বা মনিটরিং ফি নেওয়ার সুযোগ চাওয়া হয়েছে। আমদানিকারকদের জন্য বায়ার্স ক্রেডিটের ব্যবস্থা করে দেওয়ার বিপরীতে ১ শতাংশ ফি, বড় করপোরেট ঋণ ও ট্রেড ফাইন্যান্সে ডিল স্ট্রাকচারিং ফি হিসেবে ১ শতাংশ এবং ঋণের সুদের বাইরে অতিরিক্ত ঝুঁকি প্রিমিয়াম বাবদ আরো ১ শতাংশ ফি নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি নগদ বৈদেশিক মুদ্রা বিক্রির ক্ষেত্রে ২ শতাংশ কমিশন আরোপের সুপারিশ করা হয়েছে।

বর্তমানে ব্যাংক কাউন্টার থেকে যতবার ইচ্ছা নগদ অর্থ উত্তোলনে কোনো চার্জ নেই। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, মাসে তিনবার পর্যন্ত উত্তোলন বিনামূল্যে করা যাবে। চতুর্থ থেকে দশমবার পর্যন্ত প্রতিবার ১০০ টাকা এবং দশমবারের বেশি উত্তোলনে প্রতিবার ৩০০ টাকা ফি প্রস্তাব করা হয়। ব্যবসায়িক হিসাব থেকেও বর্তমানে নগদ উত্তোলনে কোনো সীমা বা চার্জ নেই। এবিবির প্রস্তাব অনুযায়ী, মাসে ২০ বার পর্যন্ত উত্তোলন বিনামূল্যে করা যাবে। ২১ থেকে ৫০ বার পর্যন্ত প্রতিবার ১০০ টাকা এবং ৫০ বারের বেশি উত্তোলনে প্রতিবার ১৫০ টাকা ফি প্রস্তাব দেওয়া হয়। এতে ব্যবসায়ীদের লেনদেন ব্যয় বাড়বে।

এছাড়া ঋণপত্র (এলসি) খোলার আবেদন গ্রহণে ১০০ টাকা, বিদেশি ঋণপত্রের নথি প্রক্রিয়াকরণে সর্বোচ্চ ২০ মার্কিন ডলার এবং স্থানীয় ঋণপত্রে সর্বোচ্চ ১ হাজার টাকা চার্জ নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। নথি অনুমোদন বা সত্যায়নের জন্য সর্বোচ্চ ১ হাজার টাকা এবং সক্রিয় ঋণপত্র বাতিল করতে ৫০০ টাকা ফি নেওয়ারও সুপারিশ করা হয়েছে। বর্তমানে বছরে একটি ও ছয় মাসে একটি ব্যালেন্স কনফারমেশন সার্টিফিকেট বিনামূল্যে দেওয়া হয়। নতুন প্রস্তাবে এ সেবার জন্য ৩০০ টাকা ফি নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে। বর্তমানে ডিমান্ড লোন ও কন্টিনিউয়াস লোন মেয়াদপূর্তির আগেই পরিশোধ করলে কোনো চার্জ দিতে হয় না। এবিবি এ ক্ষেত্রে অবশিষ্ট ঋণের ১ শতাংশ হারে আগাম নিষ্পত্তি ফি আরোপের প্রস্তাব করেছে।

এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে কোনো গ্রাহকের অনুকূলে ফাইল অনুমোদনের ক্ষেত্রে খরচ আদায়ের সুযোগও চাওয়া হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, রিটেইল গ্রাহকের কাছ থেকে সর্বোচ্চ দেড় হাজার টাকা এবং করপোরেট গ্রাহকের কাছ থেকে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত চার্জ নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়।

যেসব খাতে বিদ্যমান চার্জ বাড়ানোর প্রস্তাব

নতুন চার্জ আরোপের পাশাপাশি বর্তমানে যেসব সেবায় ফি রয়েছে, সেগুলোর হারও বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে এবিবি। বর্তমানে সঞ্চয়ী হিসাবে গড় স্থিতি ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত হলে কোনো হিসাব রক্ষণাবেক্ষণ ফি দিতে হয় না। এবিবি এ সীমা কমিয়ে ৫ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করেছে। একই সঙ্গে ৫ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত গড় স্থিতির ক্ষেত্রে মাসে ১৫০ টাকা এবং ২৫ হাজার টাকার বেশি হলে ৩০০ টাকা ফি নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে।

ঋণ খাতে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ঋণ প্রক্রিয়াকরণ ফি সর্বোচ্চ শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ। তা বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ২ শতাংশ করার সুপারিশ করা হয়েছে। একইভাবে ঋণ পুনঃতফসিল বা পুনর্গঠনের ফি বর্তমান শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ১ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তবে সিএমএসএমই ও কৃষি ঋণকে এ সীমার বাইরে রাখার সুপারিশ রয়েছে। ঋণ আগাম পরিশোধের ক্ষেত্রেও চার্জ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমানে অবশিষ্ট ঋণের শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ হারে চার্জ নেওয়া হলেও তা বাড়িয়ে ২ শতাংশ করার সুপারিশ করা হয়েছে।

এছাড়া ঋণপত্র (এলসি) সংশোধন ফি সর্বোচ্চ ৭৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে দেড় হাজার টাকা, ব্যাংক গ্যারান্টি কমিশনের সর্বোচ্চ হার শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ থেকে শূন্য দশমিক ৭৫ শতাংশ এবং ন্যূনতম কমিশন ১ হাজার টাকা থেকে ২ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। তাছাড়া সলভেন্সি সার্টিফিকেটের ফি ২০০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা, চেক রিটার্ন ফি ৫০ টাকা থেকে ১০০ টাকা, স্টপ পেমেন্ট ফি ১০০ টাকা থেকে ১৫০ টাকা এবং পে-অর্ডার ইস্যু ফি সর্বোচ্চ ৩০০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে। ব্যালেন্স কনফারমেশন সার্টিফিকেটের জন্যও ৩০০ টাকা ফি নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।

যা বলছে এবিবি

বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো চিঠিতে এবিবি বলেছে, ব্যাংকিং সেবার পরিধি বৃদ্ধি, পরিচালন ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি, প্রযুক্তিনির্ভর সেবার সম্প্রসারণ এবং গ্রাহকসেবা বজায় রাখার ক্রমবর্ধমান ব্যয় বিবেচনায় বর্তমান চার্জ কাঠামো পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন। তাই প্রস্তাবিত ‘শিডিউল অব চার্জেস’ দেশের সব ব্যাংকের জন্য সর্বোচ্চ চার্জসীমা হিসেবে অনুমোদনের অনুরোধ জানিয়েছে সংগঠনটি। একই সঙ্গে পরিচালন ব্যয়, প্রযুক্তি ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রতি বছর সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ পর্যন্ত চার্জ সমন্বয়ের সুযোগ রাখার প্রস্তাবও দিয়েছে এবিবি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...