রাজধানীর যান্ত্রিক জীবনের ব্যস্ততা আর ইট-পাথরের ধূসর চার দেয়ালের মাঝে এক চিলতে সবুজের ছোঁয়া যেন পরম স্বস্তি। সেই স্বস্তির খোঁজে শেরেবাংলা নগরে আয়োজিত মাসব্যাপী জাতীয় বৃক্ষমেলা নগরবাসীর মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।
প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত চলা এই মেলায় বিকাল গড়াতেই নামতে শুরু করে বৃক্ষপ্রেমীদের ঢল। কেউ হাতে পছন্দের চারা নিয়ে ফিরছেন, কেউবা মাথায় করে গাছের ঝুড়ি গাড়িতে তুলছেন, আবার কেউ গভীর মনোযোগে জেনে নিচ্ছেন গাছ ও গাছের যত্ন নেওয়ার পদ্ধতি সম্পর্কে।
মেলা প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখা যায়, বৈরী আবহাওয়া কিংবা যান্ত্রিক শহরের যানজট উপেক্ষা করেই সবুজের খোঁজে ছুটে আসছেন সব বয়সের মানুষ।
সরেজমিনে বৃক্ষপ্রেমী মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নগরবাসীর এই ভিড়ের পেছনে কাজ করছে গভীর মনস্তাত্ত্বিক তাগিদ। যান্ত্রিক শহরে মানসিক প্রশান্তি আর পরিবারের জন্য বিষমুক্ত টাটকা খাবারের নিশ্চয়তা পেতে এখন অনেকেই নিজেদের ছোট্ট বারান্দা কিংবা ছাদকে সাজিয়ে তুলছেন অরণ্যের আদলে। নিকেতন থেকে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে আসা শামিম হোসেন ৪০০ টাকায় একটি লেবু গাছ কিনেছেন। সঙ্গে নিয়েছেন হাসনাহেনা গাছ। তিনি আমার দেশকে বলেন, আমরা যেরকম মাছে ভাতে বাঙালি, তেমনি গাছের সঙ্গেও আমাদের সম্পর্ক আছে। বাসায় বা বাসার সামনে গাছ না থাকলে দেখতেও ভালো লাগে না। ঘরের সামনে গাছ না থাকলে প্রাণের স্পন্দন অনুভূত হয় না।
মিরপুর থেকে আসা সিভিল ইঞ্জিনিয়ার রাফিদ আল জহুরের মতে, এই সবুজায়ন কেবল শৌখিনতা নয়, বরং সন্তানদের প্রকৃতির সান্নিধ্যে বড় করার একটি প্রয়াস। তিনি মূলত তার ছোট সন্তানের কথা চিন্তা করে এবং পরিবারের জন্য বিষমুক্ত সামান্য কিছু টাটকা খাবার নিশ্চিত করতে বাগান শুরু করেন। তিনি চেয়েছিলেন তার সন্তান যেন সবুজের সান্নিধ্যে বড় হতে পারে। সেজন্য তার বারান্দায় রঙ্গন, হাসনাহেনা, মাধবীলতা, পুঁইশাক ও কচু গাছ রেখেছেন। এছাড়া তিনি টমেটো চাষের চেষ্টাও করছেন। তিনি প্রায় ৮-৯ মাস ধরে বাগান করছেন। তিনি লক্ষ করেছেন যে, ঢাকার মানুষের মধ্যে বাগান করার ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে এবং তার আশপাশের অনেক ভবনের ছাদে আম, পেয়ারা, লেবু ও মরিচের চমৎকার বাগান রয়েছে।
গৃহসজ্জার পাশাপাশি ঘরের ভেতরে এক চিলতে সবুজ কোণ তৈরিতেও নগরবাসীর ব্যাপক আগ্রহের কথা জানা গেছে। নিকেতন থেকে কিশোরী মেয়েকে নিয়ে আসা বৃক্ষপ্রেমী শাম্মী আক্তার জানান, তার বারান্দায় ড্রাগন, বাগানবিলাস আর নয়নতারার মতো গাছের সমারোহ তাকে মানসিক প্রশান্তি দেয়। সেখানে কেবল গাছই নয়, তিনি পাখিও পালন করেন। তার মতে, গাছগাছালি আর পাখির কলকাকলি তাকে প্রকৃতির কাছাকাছি থাকার অনুভূতি দেয়। তার বিশ্বাস, কংক্রিটের এই শহরে ছোট্ট এই বাগানই শিশুদের ও তার সন্তানদের গাছ ও প্রকৃতিকে ভালোবাসতে শেখাবে।
মেলায় আসা অনেক ক্রেতাই ঘরের ভেতর রাখার উপযোগী ইনডোর প্ল্যান্টের খোঁজে স্টলে স্টলে ভিড় করছেন। তারা বলছেন, ঘরে ও ঘরের বাইরে গাছ থাকলে, রুমের ভেতরের বাতাস নির্মল রাখার পাশাপাশি নান্দনিকতাও বৃদ্ধি করে। মেলার নার্সারিগুলোয় এবার দেখা গেছে দেশি-বিদেশি প্রজাতির গাছের বিশাল সমাহার। থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, চীন, ভারত, পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আসা চারাগুলোর প্রতি মানুষের বিশেষ আকর্ষণ রয়েছে।
মহানন্দা নার্সারির আবু তাহের জানান, কলম করা ফলের গাছের চাহিদা সবচেয়ে বেশি, যার মধ্যে আম গাছ বিক্রির শীর্ষে রয়েছে। এছাড়া বিদেশি ফলের মধ্যে রাম্বুতান, এভোকাডো, পারসিমন ও ভিয়েতনামি কাঁঠালের প্রতি মানুষের প্রবল আগ্রহ লক্ষ করা গেছে। ইনডোর প্ল্যান্টের মধ্যে থাইল্যান্ডের এগলোনিমা, মনস্টেরা, এনথোরিয়াম ও বিভিন্ন প্রজাতির অর্কিড শৌখিন ক্রেতারা বেশি পছন্দ করছেন। শুধু ফল বা ফুল নয়, কোয়ান্টাম বেম্বোরিয়ানের মতো স্টলগুলোয় ভুদুম ও ব্লু-পাইনের মতো বিরল প্রজাতির বাঁশ এবং বৈলামের মতো বিলুপ্তপ্রায় বনজ গাছের চারারও বেশ বিক্রি হচ্ছে।
ক্রেতাদের কেউ নিজের বাড়ির জন্য, আবার কেউবা গ্রামের বাড়িতে থাকা প্রিয়জনদের জন্য গাছ কিনছেন। পুলিশ কর্মকর্তা মাবিয়ান নিজের জন্য থাই পেয়ারা কিনেছেন। তিনি আমার দেশকে বলেন, গাছ আমার খুবই ভালো লাগে। তাই ব্যক্তিগত কেনাকাটার জন্য সময় বের করে আসলাম বৃক্ষমেলায় গাছ কেনার জন্য।
রনি সরদার মতিঝিল থেকে এসে মালয়েশিয়ান নারকেল ও লটকন গাছ কিনেছেন গ্রামে মায়ের কাছে পাঠানোর জন্য। উত্তরা থেকে আসা তাইফুর রহমান মুসা তার সন্তানদের নিয়ে এসেছেন ছাদ বাগানটিকে আরো সমৃদ্ধ করতে। তিনি আমার দেশকে বলেন, আমার ছাদ বাগান আছে। বাচ্চাদের নিয়েই এটি করেছি। ড্রাগন, গোলাপ, পেয়ারাসহ অনেক গাছ আছে। এখন বৃক্ষমেলায় আসলাম ওদের নিয়ে বাগানটাকে আরো বড় করব, তাই। আর ঘুরাও হবে আমাদের।
তবে বিদেশি শোপিস জাতীয় গাছের উচ্চমূল্য নিয়ে কোনো কোনো ক্রেতার মনে সংশয় থাকলেও সবুজের প্রতি টান তাদের বারবার মেলায় টেনে আনছে। বিক্রেতারাও এবারের মেলার সাড়া দেখে দারুণ আশাবাদী।
মহানন্দা নার্সারির হেড অব প্রোগ্রাম আবু তাহের আমার দেশকে বলেন, ফল গাছের চাহিদা বেশি। আমগাছই বেশি বিক্রি হয়। এগুলো সবই কলমের গাছ। কলম গাছের চাহিদাই বেশি। যেহেতু মানুষ ছাদে লাগাবেন বা বারান্দায় লাগাবেন, সেজন্য এ ধরনের গাছই বেশি পছন্দ করেন।
আবু তাহের বলেন, অধিকাংশ ফলের গাছ ভারত থেকে আসে। রাম্বুতান, পারসিমন, আপেল ও ভিয়েতনামি কাঁঠালসহ এসব গাছের প্রতি মানুষের আগ্রহ বেশি। ইনডোরের জন্য থাইল্যান্ড থেকে আসা এগলোনিমা, মনস্ট্রিয়া, এনথোরিয়াম ও বিভিন্ন ধরনের অর্কিডেরও আগ্রহ রয়েছে মানুষের মাঝে।
কোয়ান্টাম ব্যাম্বোরিয়ান বৃক্ষমেলায় প্রায় ৬০ প্রজাতির বাঁশ এনেছে। এছাড়া তাদের কাছে বৈলামের মতো বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু ও বিলুপ্তপ্রায় বনজ গাছসহ প্রায় ১২০ প্রজাতির বনজ এবং মোট ৫০০ প্রজাতির গাছ রয়েছে বলে আমার দেশকে জানিয়েছেন কোয়ান্টাম ব্যাম্বোরিয়ানের কিউরেটর সাইফুদ্দিন সাইফ। তিনি বলেন, ভুদুম, ব্লু-পাইন, ভেরিগেটেড প্রজাতির বাঁশের চারা বেশি বিক্রি হচ্ছে। মেলা বেশ জমে উঠেছে। এবার মেলা বেশ ভালো হবে বলে তিনি আশাবাদী।
বুকভরে নির্মল শ্বাস আর চোখের প্রশান্তিতে নিজের বাগানের জন্য গাছ সংগ্রহ করতে এই বৃক্ষমেলা এখন রাজধানীবাসীর অন্যতম প্রধান আশ্রয়ে পরিণত হয়েছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

