ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের ইকুরিয়ায় অবস্থিত বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) ঢাকা মেট্রো-২ সার্কেলে অবাধে চলছে ঘুস বাণিজ্য। বর্তমানে পতিত আওয়ামী লীগ ও ক্ষমতাসীন বিএনপি নেতাদের মিলিত সিন্ডিকেট গুরুত্বপূর্ণ এ প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ করছে। এ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে রুট পারমিট, গাড়ির রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট, ফিটনেসবিহীন গাড়ির ছাড়পত্রসহ প্রায় সব সেক্টরেই সেবাগ্রহীতাদের হয়রানি করে প্রতি মাসে অবৈধভাবে কোটি টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। যদিও এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিআরটিএ-সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, ইকুরিয়া বিআরটিএ অফিস দুর্নীতির আঁতুড়ঘর। শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে নিম্নপদস্থ কর্মচারীদের একটি অংশ অবৈধ অর্থ লেনদেনের সঙ্গে জড়িত। অফিসটি যেন টাকার মেশিন, যার নিয়ন্ত্রক আওয়ামী চালক লীগের সহসভাপতি আবু বক্কর সিদ্দিক, বিএনপির জামাই সেলিম ওরফে লেংড়া সেলিমসহ অন্তত ৫০ জনের একটি সিন্ডিকেট। অফিসে গেট থেকে শুরু করে বের হওয়া পর্যন্ত সব সেক্টর চলে সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে। বিআরটিএ অফিস ছাড়াও সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বিআরটিএর সামনে অবৈধভাবে গড়ে তোলা ৪৫টি দোকান ও ট্রাকস্ট্যান্ড। দোকানপ্রতি মাসিক পাঁচ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া নেওয়া হয়। অন্যদিকে ট্রাকস্ট্যান্ড ও বিআরটিএতে সেবা নিতে আসা ট্রাক থেকে ‘মালিক শ্রমিক ঐক্য সংগঠন’-এর নামে ১০০ থেকে ৫০০ টাকা করে চাঁদা আদায় করা হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ভুক্তভোগী জানান, ড্রাইভিং লাইসেন্স পরীক্ষায় অনিয়ম হচ্ছে। নিয়মানুযায়ী পরীক্ষা দিয়েও অনেক আবেদনকারী লাইসেন্স পাচ্ছেন না। ঘুস না দিলে পরীক্ষায় ফেল দেখানো হয়। অন্যদিকে নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ দালালের মাধ্যমে দিলে পরীক্ষা ছাড়াই পাস করিয়ে দেওয়ার নিশ্চয়তা পাওয়া যায়।
সূত্রগুলোর দাবি, অনলাইনে আবেদন করার পর বায়োমেট্রিক, লিখিত, মৌখিক ও ফিল্ড টেস্ট সম্পন্ন করে ড্রাইভিং লাইসেন্সের আবেদন নিষ্পত্তির জন্য তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুস দিতে হয়। ফিটনেস সনদের ক্ষেত্রে গাড়িভেদে এক থেকে পাঁচ হাজার পর্যন্ত, মালিকানা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে তিন থেকে ১০ হাজার, গাড়ির রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে মোটরসাইকেল দুই হাজার, অন্যান্য গাড়ি তিন থেকে ১০ হাজার টাকা অতিরিক্ত দিতে হয়। এমন করে প্রতিটি সেক্টরে মাসে গড়ে চার-সাড়ে চার হাজার আবেদনে অতিরিক্ত আদায় করা হয় এক থেকে দেড় কোটি টাকা।
একাধিক সূত্র জানায়, ইকুরিয়া বিআরটিএ অফিসের উপপরিচালক সৈয়দ আইনুল হুদা চৌধুরী, সহকারী পরিচালক রুহুল আমিন, জাহাঙ্গীর আলম, আব্দুল্লাহ আল মামুনসহ আট মোটরযান পরিদর্শক, তিন এআরও, আট অফিস সহকারী এবং ১৫ পিয়ন ও আনসার সদস্য ঘুসের টাকার ভাগীদার।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, আওয়ামী চালক লীগের সহসভাপতি আবু বক্কর সিদ্দিকের নেতৃত্বে ২০০৯ সালে এ সিন্ডিকেটের জন্ম। তখন ২০-২৫ জন সিন্ডিকেটের হয়ে কাজ করতেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সিন্ডিকেটে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। আবু বক্কর সিদ্দিককে সঙ্গে রেখে স্থানীয় বিএনপির আরো প্রায় ৩০ জন এতে যুক্ত হন। এদের মধ্যে মালিকানা লাইসেন্স তৈরির সিন্ডিকেটে রয়েছেন—বিপ্লব, হালিম, বিল্লাল, ইয়াকুব ও আমান। এছাড়া ভলিয়ম দেখাশোনার সিন্ডিকেটে রয়েছেন লিটন, শাকিল, শাহাদাত, আলামিন ও ফারুক; পারমিট শাখায় রাজু, ফাইজুল, তুহিন ও সেন্টু; ফিটনেস শাখায় হাসান, নাদিম, কাইয়ুম, শাহীন, নাঈম, সাজু, হেলাল, হীরক ও ইলিয়াস; ফিটনেস ঢাকা জেলা শাখায় মিজান, রনি ও মনির; ভলিয়ম শাখায় নয়ন, আশিক ও আসলাম এবং রেজিস্ট্রেশন শাখায় হাবিব, জালাল, রাসেল, রায়হান, চান মিয়া ও নান্নু।
বিআরটিএর সামনে ৪৫টি অবৈধ দোকানের দায়িত্বে রয়েছেন হাতকাটা জয়, ইকুরিয়ার সুমন, হারিজ রাব্বি, ইয়াসিন, তাঁতী দলের রনি, শ্রমিক দলের রুকু, জামাই সেলিম ওরফে লেংড়া সেলিম, মৎস্যজীবী দলের আমান, ইসমাইল, ইয়ামিন, রানা, সোহাগ, ইমু, রনি, বাকুম উজ্জ্বল, মোকামপাড়ার সিএনজি সেলিম, সাজু, জুয়েল, মৎস্যজীবী দলের বাবুল, নাজিম, স্বেচ্ছাসেবক দলের ওসমান, সোহেল, মুন্না, হিমেল, যুবদলের স্বাধীন, ফারুক, মহসিন, ইয়াসিন, বিল্লাল, চান মিয়া ও ইয়াসিন। এছাড়া বিআরটিএর সিন্ডিকেটের রয়েছেন সবুজ, শিপন, সাব্বির, ইউসুফ, লেংড়া সেলিম, আমজাদ হোসেন, মনির হোসেন, মাসুদ হোসেন, মিজান মিয়া, মান্নানসহ বেশ কয়েকজন। এই দালালচক্র অফিস চত্বরে অবস্থান করে সেবাপ্রত্যাশীদের তাদের মাধ্যমে সেবা নিতে বাধ্য করে।
দালালচক্রের মূল হোতা আবু বক্কর
জানা গেছে, আওয়ামী চালক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি আলী হোসেনের শ্যালক আবু বক্কর সিদ্দিক ২০০১ সালে ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী হাসিনার এপিএস সাইফুজ্জামান শিখরের সুপারিশে কেরানীগঞ্জের বিআরটিএ অফিসে সিল কন্ট্রাক্টর পদে ‘নো ওয়ার্ক নো পে’ শর্তে চাকরি পান। পরে তিনি বিআরটিএর নিচতলার ১১০ নম্বর রুম দখলে নিয়ে অবৈধ সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। ২০২২ সালে সিল কন্ট্রাক্টর পদ বিলুপ্ত হলেও বিআরটিএ অফিস ছাড়েননি আবু বক্কর সিদ্দিক।
শেখ মুজিবের এক সময়ের গাড়িচালকের ছেলে পুলিশ বাহিনীতে ওসি পদে কর্মরত ওমর ফারুক এবং বিজিবিতে কর্মরত মেয়ের জামাই রবিউলের দাপটে হাসিনার আমলে আবু বক্কর বিআরটিএ অফিসে অনিয়মের রামরাজত্ব কায়েম করেন। জুলাই-আগস্ট বিপ্লবে ঢাকার গেন্ডারিয়া থানায় তার বিরুদ্ধে হত্যা মামলা রুজু হয়। কিছুদিন আত্মগোপনে থাকার পর দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানা বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতাকে ম্যানেজ করে তিনি বিআরটিএ অফিসে কর্তৃত্ব ধরে রাখেন। কোনো কর্মকর্তা না হয়েও তিনি বিআরটিএর ১১০ নম্বর রুম দখলে রেখেছেন শুধু দালাল ও সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের জন্য। বিআরটিএর অনেক কর্মকর্তাও তার দাপটে তটস্থ থাকেন।
স্থানীয়রা জানান, বিগত ১৫ বছরে বিআরটিএর সিন্ডিকেটের মাধ্যমে আবু বক্কর অন্তত ২০০ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছেন। কেরানীগঞ্জের বোরহানিরবাগে তার ছয়তলা ভবন, নবরূপা ফরচুন টাওয়ারে আধুনিক ফ্ল্যাট এবং ১২ নম্বর কাজী আলাউদ্দিন রোডে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জে তার একাধিক বাড়ি, ফ্ল্যাট ও বাগানবাড়ি রয়েছে বলে জানা গেছে।
আনীত অভিযোগের বিষয়ে আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, আমি এখন নিজে কোনো কাজ করি না, লোকজন দিয়ে করাই। গেন্ডারিয়া থানায় দায়ের হওয়া হত্যা মামলার বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না বলে দাবি করেন। হাসিনার এপিএস সাইফুজ্জামান শিখরের মাধ্যমে বিআরটিএ অফিসে চাকরি পাওয়ার কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, ২০২২ সালে ওই পদ বিলুপ্ত হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের অনেক এমপি-মন্ত্রী ও আমলার সঙ্গে তার যোগাযোগ থাকার কথাও স্বীকার করেন।
এদিকে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানা বিএনপির তথ্যপ্রযুক্তি ও যোগাযোগ সম্পাদক সেলিম ওরফে ল্যাংড়া সেলিম বলেন, বিআরটিএ আমার এলাকায়, তাই পরিচিত লোকজন থাকবেই। আওয়ামী লীগের সিন্ডিকেট এখনো রয়ে গেছে দাবি করে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ নেতা আবু বক্কর সিদ্দিক বিএনপির লোকদের সঙ্গে মিলে কাজ করছে। অফিসের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীও অবৈধ অর্থ লেনদেনের সঙ্গে জড়িত। তবে তিনি নিজে দালাল সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত নন বলে দাবি করেন।
এ বিষয়ে বিআরটিএ ঢাকা মেট্রো-২ সার্কেলের উপপরিচালক সৈয়দ আইনুল হুদা চৌধুরী বলেন, বিআরটিএর বিরুদ্ধে দালালচক্র ও অনিয়মের অভিযোগ নতুন নয়। তবে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ঘুসের অর্থ ভাগাভাগি করেন—এমন অভিযোগ সত্য নয়।
তিনি জানান, দালালদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। গত দুই সপ্তাহে ১২ জনকে আটক করা হয়েছে। এছাড়া অফিসে প্রবেশের সময় দর্শনার্থীদের নাম ও মোবাইল নম্বর নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
আবু বক্কর সিদ্দিক সম্পর্কে তিনি বলেন, তিনি বর্তমানে বিআরটিএর কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী নন। তার চুক্তিভিত্তিক পদ ২০২২ সালে বিলুপ্ত হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণ হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

