ঢাবির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ

শতাব্দী পেরিয়ে বহু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি জাতির বাতিঘর

মাহির কাইয়ুম, ঢাবি

শতাব্দী পেরিয়ে বহু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি জাতির বাতিঘর

দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ১০৬তম বছরে পদার্পণ করেছে। শতবর্ষ পেরিয়ে আসা প্রতিষ্ঠানটি ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং সবশেষ চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানসহ দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে র‍্যাংকিং, গবেষণা ও শিক্ষার মান, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও প্রশাসনিক দক্ষতায় বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে দেশের সবচেয়ে প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়টি।

সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়ন করা গেলে এখনো দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ গবেষণাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার সক্ষমতা রাখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

বিজ্ঞাপন

১৯২১ সালের ১ জুলাই পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের উচ্চশিক্ষা এবং আর্থসামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি দেশের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বের প্রধান কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের দীর্ঘ ১৭ বছরে শিক্ষকদের মধ্যকার দলীয়করণ, দলীয় পরিচয়ে শিক্ষক নিয়োগ, রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি ও অনিয়ম-অব্যবস্থাপনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ ও মান একেবারে তলানিতে গিয়ে ঠেকে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে গণঅভ্যুত্থানের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন আসে। তবে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার গঠনের পর আবার দলীয় পরিচয় বিবেচনায় উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়। ফলে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান আবাসন সংকট, প্রশাসনিক অদক্ষতা এবং গবেষণাবান্ধব পরিবেশের অভাবের কার্যকর কোনো সমাধান হয়নি।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বক্তব্যে গবেষণায় পিছিয়ে থাকার অন্যতম কারণ হিসেবে বারবার উঠে আসে গবেষণায় বরাদ্দ ঘাটতির কথা। তবে বাস্তবে দেখা যায়, বরাদ্দকৃত অর্থও পুরোপুরি ব্যয় হয় না। বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যানুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে গবেষণা খাতে ২০ কোটি সাত লাখ টাকা বরাদ্দ থাকলেও ব্যয় হয় মাত্র ১২ কোটি ৬১ লাখ ২৪ হাজার টাকা। অর্থাৎ প্রায় ৩৭ শতাংশ অর্থ ব্যয় করা হয়নি।

গত পাঁচ বছরে গবেষণা খাতে মোট ৭০ কোটি ৬৭ লাখ টাকা বরাদ্দের বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ৫৭ কোটি ৩০ লাখ ৬৩ হাজার টাকা। ফলে ১৩ কোটি ৩৬ লাখ ৩৭ হাজার টাকা ব্যয় হয়নি।

এদিকে, গবেষণা কেন্দ্রগুলোর চিত্র আরো উদ্বেগজনক। গত পাঁচ বছরে ৩৮ কোটি ২৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ পেলেও ব্যয় হয়েছে মাত্র ১৫ কোটি ১১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। অর্থাৎ বরাদ্দের ৬০ শতাংশেরও বেশি অর্থ ব্যয় হয়নি।

নেই শিক্ষক মূল্যায়ন প্রক্রিয়া

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিগত পাঁচ বছর ধরে শিক্ষক মূল্যায়ন পদ্ধতি চালুর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও তা এখনো বাস্তবায়ন করা হয়নি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট ২০২২ সালের ৩০ অক্টোবর একটি নীতিমালা অনুমোদন করে। নীতিমালা অনুযায়ী শিক্ষার্থীরা ২২টি সূচকের ভিত্তিতে অনলাইনে শিক্ষকদের পাঠদানের মান মূল্যায়ন করবেন। এতে সময়মতো ক্লাস নেওয়া, পাঠদানের দক্ষতা, কোর্স সম্পন্ন করা, শিক্ষাসামগ্রী সরবরাহ, পরীক্ষা গ্রহণ, মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং শ্রেণিকক্ষের শিক্ষাবান্ধব পরিবেশসহ বিভিন্ন বিষয়ে মতামত দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে অনুমোদনের প্রায় চার বছর পরও এ ব্যবস্থা চালু হয়নি।

সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও নতুন শিক্ষকরা কোনো বাধ্যতামূলক পেডাগজিক্যাল প্রশিক্ষণ ছাড়াই সরাসরি পাঠদান শুরু করেন। ফলে একাডেমিক রাইটিং এবং পাঠদানের কৌশলে তাদের ঘাটতি থেকে যায়।

শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য উপেক্ষিত

একাডেমিক উৎকর্ষের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করাও আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম দায়িত্ব। তবে এক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

রাজনৈতিক আক্রোশ, যৌন হয়রানি, আবাসন সংকট, র‌্যাগিং সংস্কৃতি এবং বিভিন্ন ধরনের অনিরাপত্তা শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপে রাখে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে তাদের শিক্ষা, গবেষণা এবং সামগ্রিক বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে।

শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নির্দেশনা ও পরামর্শদান দপ্তরের উদ্যোগে একটি নির্দেশিকা প্রণয়ন করা হয়েছে। তবে শিক্ষার্থীদের মতে, যেসব সংকট তাদের ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণের বাইরে, যেমন আবাসন সমস্যা, রাজনৈতিক চাপ বা নিরাপত্তাহীনতা—সেগুলো দূর করতে প্রশাসনের দৃশ্যমান উদ্যোগ এখনো পর্যাপ্ত নয়।

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে অগ্রগতি

বিশ্বের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থানের উন্নতি লক্ষ করা গেছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক উচ্চশিক্ষাবিষয়ক সাময়িকী টাইমস হায়ার এডুকেশন প্রকাশিত ইমপ্যাক্ট র‍্যাংকিং-২০২৬-এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গত বছরের ১০০১-১৫০০ ব্যান্ড থেকে উন্নীত হয়ে ৪০১-৬০০ ব্যান্ডে স্থান পেয়েছে।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক কিউএস ইউনিভার্সিটি র‍্যাংকিং-২০২৬-এ বিশ্বের এক হাজার ৫০৪টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় টানা তৃতীয়বারের মতো শীর্ষ ৬০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় স্থান অর্জন করেছে। একই ভাবে কিউএস এশিয়া র‍্যাংকিং-২০২৬-এ এশিয়ার এক হাজার ৫২৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়টি ১৩২তম অবস্থানে রয়েছে। উভয় র‍্যাংকিংয়েই বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছে।

অন্যদিকে, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান এলসেভিয়ার প্রকাশিত বিশ্বের শীর্ষ দুই শতাংশ বিজ্ঞানীর তালিকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৫ শিক্ষক ও গবেষকের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়। এ সংখ্যা দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে সর্বাধিক।

অবকাঠামোগত উন্নয়নে মেগা প্রকল্প

দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত সংকট কাটাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই হাজার ৮৪১ কোটি টাকার একটি মেগা প্রকল্প নতুন আশার সঞ্চার করেছে।

প্রকল্পটির আওতায় বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩১টি বহুতল ভবন নির্মাণ করা হবে। এর মধ্যে ছয়টি ছাত্র হল ও চারটি ছাত্রী হলের পুরোনো ভবন ভেঙে আধুনিক বহুতল ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি প্রশাসনিক ভবনের আধুনিকায়ন, কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি ও ডাকসু ভবনের সংস্কার, অটোমান নকশায় কেন্দ্রীয় মসজিদ নির্মাণ করে সেটিকে সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা এবং অন্যান্য অবকাঠামোগত উন্নয়নও এ প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত।

এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়কে গবেষণাকেন্দ্রিক, উদ্ভাবননির্ভর এবং আন্তর্জাতিক মানের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের লক্ষ্যে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে বর্তমান প্রশাসন।

উপাচার্য অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্বের শীর্ষ ২০০ একাডেমিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে নিয়ে যাওয়াই প্রশাসনের লক্ষ্য।

তিনি জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের ১২৫তম বর্ষকে সামনে রেখে ‘ঢাকা ইউনিভার্সিটি একাডেমিক প্ল্যান (২০২৬-২০৪৬)’ প্রণয়ন করা হয়েছে। এতে অন্তর্ভুক্তিমূলক উদ্ভাবন, গবেষণার উৎকর্ষ, শিক্ষা আধুনিকায়ন, আন্তর্জাতিকীকরণ, নৈতিক নেতৃত্ব, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন